kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

একটি ‘ধর্ষণ’ অভিযোগ

উপজেলা চেয়ারম্যান জেলে, গৃহবধূ বিতাড়িত, দুই পক্ষেরই অস্বীকার

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একটি ‘ধর্ষণ’ অভিযোগ

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় চার সন্তানের জননী এক নারী উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর বিতাড়িত হয়েছেন শ্বশুরবাড়ি থেকে। অসহায় গৃহবধূ আশ্রয় নিয়েছেন দরিদ্র বাবার বাড়িতে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ধর্ষণের ঘটনাটি সাজানো। তাঁর বাবার বাড়ির লোকজনেরও দাবি, তাদের মেয়ের সরলতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরোধী পক্ষ মহিলাকে চিকিৎসা ও থানা থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে চাপের মুখে ধর্ষণের মামলা করিয়েছে। অবশ্য থানার ওসিসহ দুই এলাকাবাসী বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা সত্য। নারী নির্যাতন মামলায় বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ দুলাল এখন জেলহাজতে রয়েছেন।

বাগগুয়া গ্রামের চার সন্তানের জননীর দায়ের মামলায় বলা হয়, চেয়ারম্যান গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিজ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে এই গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন। গৃহবধূ থানায় মামলা করলে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে গত ৫ নভেম্বর নিম্ন আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিন প্রার্থনা করেন হারুনুর রশিদ। আবেদন নাকচ করে আদালত তাঁকে জেলহাজতে পাঠান। ৬ নভেম্বর হারুনুর রশিদকে ডিএনএ টেস্টের জন্য জেল থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেল সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ।

গত বুধবার দুপুরে ওই নারীর খোঁজে প্রথমে এই প্রতিবেদক গৃহবধূর স্বামীর বাড়ি উপজেলার বাগগুয়া গ্রামে পৌঁছে জানতে পারেন খবর শুনে শ্বশুরবাড়ির লোকজন ওই নারীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। পরে প্রতিবেদক সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে একই উপজেলার দুলভারচর গ্রামে গিয়ে গৃহবধূকে তাঁর বাবার বাড়িতে পান। গৃহবধূ এ সময় বলেন, তিনি অসুস্থ।

গৃহবধূ কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর বড় বোন ব্র্যাকের একজন স্বাস্থ্যকর্মী এবং তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের পরিচিত। এই পরিচয়ের সূত্রে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে একটি সেলাই মেশিন দেওয়ার অনুরোধ করলে তাঁকে কাগজপত্র নিয়ে যেতে বলা হয়। ঘটনার দিন গৃহবধূ তাঁর বড় বোনের সঙ্গে চেয়ারম্যান কার্যালয়ে যান। বড় বোন তাঁকে পৌঁছে দিয়ে নিজ কাজে বেরিয়ে পড়েন। গৃহবধূ এই প্রতিনিধিকে বলেন, তিনি ছবি ও ভোটার আইডি কার্ড চেয়ারম্যানকে দিয়ে উপজেলা পরিষদ থেকে বের হয় প্রায় দুই শ গজ দূরে আসার পর ১৫-২০ জন লোক তাঁকে ঘিরে ধরে। এরপর ওই লোকজন গৃহবধূকে চাপ দিয়ে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করান।

সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই দিন রাতে গৃহবধূকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে এলে তিনি ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে অস্বীকৃতি জানান এবং লিখিত আবেদন দিয়ে বলেন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।

তবে সুনামগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি ও চেয়ারম্যানের আইনজীবী নান্টু রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, গৃহবধূ মামলা করেছিলেন ঠিক। পরের দিনই তিনি আমলি আদালতে লিখিত আবেদন দিয়ে বলেছেন, ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি; জোরপূর্বক কিছু লোক তাঁর স্বাক্ষর নিয়ে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছে।

এদিকে বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসি এ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘এলাকাবাসী চেয়ারম্যান সাহেবের খাসকক্ষ থেকে ওই নারীকে আমার ওখানে নিয়ে আসে। সেদিন গৃহবধূ সবার সামনে ঘটনা স্বীকার করে মামলা দায়ের করেন। আমরা চেয়ারম্যানের খাসকক্ষ থেকে নানা আলামত ও নারীর কাপড় জব্দ করে ডিএনএ টেস্টের জন্য পাঠিয়েছি। ঘটনাটি সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু এখন গৃহবধূ লোভে পড়ে অস্বীকার করছেন।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে মুক্তিখলা মল্লিখপুর গ্রামের মো. আবুল হায়াত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ও আরো একজন জরুরি কাজে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যাই। দোতলায় যেতে চাইলে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল চালক ও বৃদ্ধ দাড়োয়ান চেয়ারম্যান রেস্টে আছেন বলে দোতলায় যেতে বারণ করেন। কিন্তু জরুরি দরকার ছিল বলে আমরা বাধা ডিঙিয়ে ওপরে উঠে যাই। এরই মধ্যে চেয়ারম্যান কার্যালয় থেকে বের হন এবং আমরা দেখি ভেতর থেকে একজন নারী দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমাদের দিকে না তাকিয়ে চেয়ারম্যান দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করায় আমাদের সন্দেহ হয়। এভাবে মানুষজনও জড়ো হয়ে কক্ষ থেকে মহিলাকে বের করেন এবং গৃহবধূ সবার সামনে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। এখন উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সুবিধা পেয়ে তিনি অস্বীকার করছেন।’

জানা যায়, ঘটনার দিন রাতে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য পুলিশ গৃহবধূকে তাঁর স্বামীর সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হলে ওই নারী ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করেন। তিনি পরীক্ষা করাবেন না বলে লিখিতভাবে জানান এবং তাঁর সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি বলে আবেদনে জানান। পরে আদালতেও তিনি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন।

চেয়ারম্যানের ভাই আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমার ভাই নির্দোষ। তাঁকে ফাঁসানোর জন্য প্রথমে মহিলাকে জোরপূর্বক রাজি করানো হয়েছিল। পরে মহিলা আদালতে লিখিত দিয়ে বলেছেন ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

গৃহবধূর বড় বোন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বোন সহজ-সরল। বেশি মানুষের মধ্যে পড়ে সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। যে কারণে সে ভয়ে ঘটনার কথা স্বীকার করেছে। বাড়ি আসার পর আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলেও সে ঘটনা অস্বীকার করে জানিয়েছে, ভয় পেয়ে সে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।’ গৃহবধূর বাবা বলেন, ‘আমার মেয়ে, বউসহ সবাই তাকে আড়ালে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছে তার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে কি না। সে সবাইকে না করেছে। আমরা এ ঘটনার প্রকৃত বিচার চাই।’ চেয়ারম্যানকে নির্দোষ দাবি করে তিনি তাঁর মুক্তি দাবি করেন।

মন্তব্য