kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

বাংলাদেশ নিয়ে কেন বাড়তি উদ্বেগ?

ভূরাজনৈতিক স্বার্থে চাপে রাখার কৌশল মনে করেন বিশ্লেষকরা

মেহেদী হাসান   

২৬ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রবাদ বৈশ্বিক সমস্যা হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ দেখাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। বিশেষ করে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে ভ্রমণ সতর্কতা বা পরামর্শ জারি, সফর বাতিল থেকে শুরু করে ক্রিকেট দল না পাঠানোর ঘটনাও ঘটছে। সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রবাদের বৈশ্বিক সমস্যার শিকার বাংলাদেশ একা নয়—ঢাকার পক্ষ থেকে এ কথা জোর দিয়ে বলা হলেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকছেই।

দেশি-বিদেশি কয়েকজন কূটনীতিকের মতে, গুলশানে ১৭ বিদেশিকে হত্যা করার আগেও আলাদাভাবে এক জাপানি ও এক ইতালীয়কে হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নামে বিবৃতি দিয়ে দায় স্বীকার এবং আইএসের বিভিন্ন প্রকাশনায় বাংলাদেশ ঘিরে তাদের নানা পরিকল্পনার তথ্য প্রচার পাওয়া—এসব বিষয়কে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আইএসের মতবাদ ও কর্মকাণ্ডে উদ্দীপ্ত হয়ে কোনো কোনো বাংলাদেশির বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পশ্চিমা নাগরিকের মধ্যপ্রাচ্যে কথিত জিহাদে যোগ দেওয়ার তথ্যও পশ্চিমা দেশগুলোর নজর এড়ায়নি। এসব কারণেই বাংলাদেশ নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ দেখাচ্ছে ওই সব দেশ।

তবে বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর অতি সতর্কতার পেছনে তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে এ দেশকে চাপে রাখার কৌশলও রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ছাড়াও অনেক দেশে জঙ্গি হামলা হলেও সেগুলো এত গুরুত্ব পায়নি সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, বৈশ্বিক সমস্যা হলেও বাংলাদেশের মতো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের যে লক্ষণ দেখা গেছে তা নজিরবিহীন। বিশেষ করে গত ১ জুলাই গুলশানে জঙ্গি হামলায় বিদেশি হত্যার ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর আগে এক বছরে বাংলাদেশে সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই দুজন বিদেশি নিহত হয়েছেন সন্ত্রাসী হামলায়। এসব হামলায় দায় স্বীকার করে যেসব বিবৃতি পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রচার পেয়েছে সেখানেও প্রকারান্তরে অমুসলিম বিদেশিদের প্রতি হুমকি ছিল। পশ্চিমা অনেক দেশের দূতাবাসই বাংলাদেশের এমন চিত্রের সঙ্গে পরিচিত নয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রগতিশীল ও উদার সমাজের জন্য বাংলাদেশকে আদর্শ দেশ হিসেবে তুলে ধরা হতো। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ওই ভাবমূর্তিতে কিছুটা হলেও আঁচ লেগেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের বিভিন্ন প্রকাশনায় বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি এবং দেশটিকে তাদের কবজায় নেওয়ার পরিকল্পনার তথ্য প্রচার পেয়েছে। এসব বিষয়কেও খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আইএসে উদ্দীপ্ত হয়ে কোনো কোনো বাংলাদেশির বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পশ্চিমাদের মধ্যপ্রাচ্যে কথিত জিহাদে যোগ দেওয়ার তথ্যও পশ্চিমা দেশগুলোর নজর এড়ায়নি। বরং সিঙ্গাপুরের মতো দেশে বসে বাংলাদেশে জিহাদের পরিকল্পনা করে ধরা পড়ার তথ্যও প্রচার পেয়েছে।

ঢাকায় একটি পশ্চিমা দেশের দূতাবাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা তাঁদের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য সব দেশের ব্যাপারেই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এসব পরামর্শের মাধ্যমে যতটা সম্ভব ঝুঁকির তথ্য তুলে ধরা হয়, যাতে কোনো কারণে তাঁদের কোনো নাগরিক আক্রান্ত হলে ‘আগে থেকে সাবধান করা হয়নি’—এমন অভিযোগ তুলতে না পারে। কারণ আগে থেকে সাবধান না করার অভিযোগ করে ক্ষতিগ্রস্ত বা আক্রান্ত ব্যক্তিরা উন্নত বেশ কিছু দেশে ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার চাইতে পারে।

ওই কর্মকর্তা জানান, পশ্চিমা দেশগুলোর ভ্রমণ সতর্কতা জারির বিষয়টি বাংলাদেশে যেভাবে প্রচার পায় তেমনটি অন্য কোথাও দেখা যায় না। নানা কারণে অনেক দেশ সফরের বিষয়েই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সতর্কতা বা ভ্রমণ পরামর্শ দেওয়া হয়। এ নিয়ে বাংলাদেশের মতো অন্য দেশগুলোকে এত উদ্বিগ্ন দেখা যায় না।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ গত বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইস্যুতে পশ্চিমা কিছু দেশের অতিমাত্রায় উদ্বেগ দেখানোর উদ্দেশ্য হলো ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের স্বার্থে চাপে ফেলে এ দেশকে তাদের পক্ষে বা স্বার্থে ব্যবহার করা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসের যে মাত্রা তা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বের তুলনায় অনেক হালকা। যে গুলশান হামলাকে পুঁজি করে পশ্চিমারা উদ্বেগ দেখাচ্ছে সেই হামলাকারীদের বেশির ভাগই উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের দীক্ষা পেয়েছে বিদেশে। আর এর ভুক্তভোগী হয়েছে বাংলাদেশ।

আবদুর রশিদ মনে করেন, সন্ত্রাস-উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে অবস্থান নিয়েছে তা স্বচ্ছ ও যৌক্তিক। অন্যদিকে পশ্চিমা কিছু দেশ বাংলাদেশকে সহযোগিতায় আগ্রহ দেখালেও সেখানে স্বচ্ছতা নেই। কারণ তারা এ দেশের ভূখণ্ডে সন্ত্রাস দমনে আগ্রহ দেখালেও তাদের দেশে উগ্রবাদী-জঙ্গিবাদী আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠা ঠেকাতে আগ্রহ দেখায় না।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এ দেশে যাদের সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের অনেকেরই বিদেশি যোগসূত্র রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানকালেই তাদের মস্তিষ্কে উগ্রবাদী চেতনা ঢুকেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা