kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

কেশবপুর ও মণিরামপুরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা

পথে কাটছে জীবন

বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র বন্ধের আশঙ্কা

ফখরে আলম ও নূরুল ইসলাম খান, যশোর   

২৬ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পথে কাটছে জীবন

জলাবদ্ধতায় গলে গেছে কাঁচা বসতবাড়ি। তাই মানবেতর জীবন কাটছে রাস্তায়। ছবিটি গতকাল যশোর মণিরামপুরের সুজাতপুর এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

যশোরের কেশবপুরে হরিহর নদের পানি উপচে বিস্তৃর্ণ এলাকায় ভয়াবহ জলাবব্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে তারা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে কাঁচা ঘরবাড়ি, ভেসে গেছে মাছের ঘের, নষ্ট হয়েছে ফসলি জমি। এতে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। 

এদিকে কেশবপুরের আলতাপোল বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত  বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এক ফুট পানির নিচে রয়েছে বলে জানা গেছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের আওতায় প্রায় ৪২ হাজার গ্রাহক রয়েছে। বন্যার পানি বাড়তে থাকলে এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।

কেশবপুর পল্লী বিদ্যুতের সহকারী মহাব্যবস্থাপক সিদ্দিপুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আলতাপোল এ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটি বর্তমানে এক ফুট পানির নিচে রয়েছে। এই অবস্থা থেকে আরো এক ফুট পানি বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কেশবপুর পৌর এলাকার ভবানীপুর, ভোগতী নরেন্দ্রপুর, মধ্যকুল, হাবাসপোল, আলতাপোল, বাজিতপুর, সাবদিয়াসহ ১১টি ইউনিয়নে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পানিতে মিশে গেছে। কেশবপুরে ৬০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলার  ২৫৮ বর্গকিলোমিটারের ভেতর ১৬১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জলাবদ্ধতা রয়েছে।

গতকাল দুর্গত এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যশোরের ভবদহে অতি বর্ষণে জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে

সেখানকার বাসিন্দারা। যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের চিনেটোলা থেকে কেশবপুর পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে এখন আশ্রয়হীন। অনেক মানুষ পাকা রাস্তা ও উঁচু বেড়িবাঁধের ওপর ঘর তুলে বাস করছে। বন্ধ হয়ে গেছে যানবাহন চলাচল। 

মণিরামপুর উপজেলার চিনেটোলায় যশোর-সাতক্ষীরা রাস্তার ওপর কয়েক শ পরিবার গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এই সড়কের ওপর বসে ছোট ছোট মাছ কুটছিলেন গৃহবধূ সাইদা বেগম। স্বামী মফিজুর রহমান আর দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন।

রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া গৃহবধূ সাইদা বেগম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাছ ছাড়া আমাদের খাওয়ার কিছু নেই। না খেয়েই আছি। একটি সংগঠন আমাদের ১০ কেজি চাল দিয়েছে। এ ছাড়া কোনো ত্রাণ পাইনি। আমরা ত্রাণ চাই না। দ্রুত পানি সরানোর ব্যবস্থা চাই।’ বিউটি বেগমের বাড়ি আমিনপুর গ্রামে। বাড়িতে গলা সমান পানি। এ জন্য তিনি বাড়িঘর ছেড়ে চিনেটোলায় জামাই মিজানুর রহমানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন জামাইয়ের বাড়িও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তায় তিনি আশ্রয় নিয়েছেন।

বিউটি বেগম বলেন, ‘ছেলে পানির ভয়ে এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে গেছে। আমার জীবনে এত পানি দেখিনি। পানিতে আমাদের সব ফসল তলিয়ে গেছে। আমরা বাঁচতে চাই।’

ভবদহের নওয়াপাড়া-কালিবাড়ি সড়কের সুজাতপুর ঘুরে দেখা যায়, শত শত মানুষ রাস্তার ওপর এসে আশ্রয় নিয়েছে। পলিথিন, বাঁশ দিয়ে মাথাগোঁজার ঠাঁই নির্মাণ করছে। এখানে আশ্রয় নেওয়া সুজাতপুর গ্রামের গৃহবধূ নয়ন বলেন, ‘১০ দিন ধরে হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল নিয়ে রাস্তার ওপর আছি। খাবার পানি আর টয়লেটের খুব কষ্ট।’

হাটগাছা গ্রামের প্রবীণ বিজয় কৃষ্ণ বৈরাগী বলেন, ‘স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছি। সাপের খুব উপদ্রব। চর্মরোগও ছড়িয়ে পড়েছে। কবে পানি সরবে, কবে বাড়ি যাব তা ভগবানই জানে!’

কেশবপুর পৌরসভার ভবানীপুর এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বন্যার পানি কমলেও বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। হরিহর নদের উপচেপড়া পানিতে বসতঘর, ফসল সবই নষ্ট হয়েছে। বাধ্য হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু সড়ক, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় ঠাঁই নিয়েছে হাজারো মানুষ।

ভবানীপুর এলাকার খোজাখালী খালের পাড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়া ফিরোজা খাতুন বলেন, ‘পানিতে আমি নিঃস্ব। আমার পক্ষে ঘর তৈরি করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’

এ ব্যাপারে কেশবপুর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম মোড়ল বলেন, ‘পৌর এলাকার সাড়ে ছয় হাজার পরিবারের ভেতর ছয় হাজার পরিবার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ভবানীপুর, ভোগতী নরেন্দ্রপুর, হাবাসপোল, মধ্যকুল, আলতাপোল, বাজিতপুর ও সাবদিয়া এলাকায় এক হাজার ১৫০টি কাঁচা বসতঘর সম্পূর্ণ ভেঙে পানিতে মিশেছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে তিন হাজার বাড়িঘরের।’

কেশবপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বিপুল কুমার মালাকার বলেন, ‘জলাবদ্ধতায় কেশবপুর পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মানুষের ভেঙে পড়া বসতঘরের তালিকা তৈরিসহ টাকায় ক্ষতির পরিমাণ তৈরির কাজ চলছে।’ 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ রায়হান কবির জানান, কেশবপুরে ৬০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে সব রকমের সহায়তা করা হবে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এইচ এম আমির হোসেন বলেন, পানিবন্দি মানুষকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

মন্তব্য