kalerkantho

চুরি যাওয়া রিজার্ভের দেড় কোটি ডলার ফেরত

ম্যানিলায় এফিডেভিট বাংলাদেশ ব্যাংকের

আবুল কাশেম   

২৬ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ম্যানিলায় এফিডেভিট বাংলাদেশ ব্যাংকের

চুরি যাওয়া রিজার্ভের এক কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার ডলার ফেরত আনতে ম্যানিলার আদালতে এফিডেভিট জমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চুরির মোট আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ফিলিপিনো-চায়নিজ ব্যবসায়ী কিম অং এ অর্থ জমা দেন। বাংলাদেশকে ওই অর্থ ফিরিয়ে দিতে ফিলিপাইনের আইন মন্ত্রণালয় আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে আদালতে আবেদন করবে। এর ভিত্তিতে ইতিবাচক রায় হলে টাকা ফিরে পাবে বাংলাদেশ।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের চারটি অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। ফিলিপাইনের আদালতের রায়ের ভিত্তিতে এক কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার ডলার ফেরত পাওয়ার আশা করলেও বাকি ছয় কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ফিরে পাওয়ার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসিসহ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বৈঠক করলেও চুরি যাওয়া পুরো টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি দেশ দুটির কোনো কর্তৃপক্ষ। তবে এ বিষয়ে সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে।

সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি তার আগামী বৈঠকে উত্থাপনের জন্য রিজার্ভ চুরি, তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কয়েকটি লিখিত প্রশ্ন করে জবাব চেয়েছে। এ ছাড়া এই চুরির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক কিংবা নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ও সুইফট কর্তৃপক্ষের দায় কতটা, সে সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছে কমিটি। গত ২২ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রশ্নের যে জবাব দিয়েছে, তাতে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা এবং নিউ ইয়র্ক ফেড ও সুইফটের ব্যর্থতার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক জোয়ারদার ইসরাইল হোসেন স্বাক্ষরিত সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির আগামী বৈঠকের জন্য পাঠানো কার্যপত্রে দেড় কোটি ডলার ফেরত পাওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘ফিলিপিনো-চায়নিজ ব্যবসায়ী কিম অং তাঁর নিকট রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের খোয়া যাওয়া অর্থ মোট ১৫.২৫ মিলিয়ন (এক কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার) ডলার এএমএলসি বরাবরে নগদে ফেরত দেন। পরবর্তীতে উক্ত অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত প্রদানের জন্য এএমএলসি ও কিম অং কর্তৃক আদালতে একটি জয়েন্ট মোশন দাখিল করা হয় এবং আদালত তা ১ জুলাই ২০১৬ তারিখ উক্ত অর্থের বিষয়ে পার্শিয়াল ফোরফেইচার অর্ডার জারি করে। এর ফলে ১৫.২৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত প্রদান প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপ অর্জিত হয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক জোয়ারদার ইসরাইল হোসেন বলেছেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় সমুদয় অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক হতে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের মাধ্যমে ৪ মে ফিলিপাইনের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস বরাবরে মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) রিকুয়েস্ট প্রেরণ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ফিলিপাইনের স্থানীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংককে এফিডেভিটের মাধ্যমে আদালতে এ অর্থ ফেরত প্রদানের জন্য আবেদন করতে হবে এবং বাংলাদেশ কর্তৃক প্রেরিত এমএলএ রিকুয়েস্টের আওতায় ফিলিপাইনের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে আদালতে অর্থ ফেরতের আবেদন করবে, যা ৩০ আগস্টের মধ্যে করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইতোমধ্যে এফিডেভিট প্রদান করা হয়েছে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিলাদি সরবরাহ করা হয়েছে। আশা করা যায়, আদালতের চূড়ান্ত আদেশ প্রাপ্তি সাপেক্ষে উক্ত অর্থ খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে ফেরত আসবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত ১৫-১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, ফেড ও সুইফটের দ্বিতীয় ত্রিপক্ষীয় সভা হয়েছে। সেখানে রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে ফেড ও সুইফট সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি ও ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ১-৫ আগস্ট আজমালুল হোসেন কিউসিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল ফিলিপাইন সফর করে। সেখানে তাঁরা ফিলিপিনো সিনেটের প্রেসিডেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের সেক্রেটারি (আইনমন্ত্রী), চিফ স্টেট কাউন্সেল, সলিসিটর জেনারেল, ক্যাসিনো সেক্টরের রেগুলেটরের চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডেন্ট, ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও স্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব সভায় খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারে দেশটির প্রতিশ্রুতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

এ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশের কেউ জড়িত থাকলে দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমন একটি প্রশ্ন ছিল সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির। সরাসরি এর উত্তর না দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘সামগ্রিক বিষয়টি বর্তমানে সিআইডি কর্তৃক তদন্তাধীন রয়েছে। এ ছাড়া সরকার কর্তৃক ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্ট মাননীয় অর্থমন্ত্রী বরাবর দাখিল করেছে।’

কমিটি জানতে চেয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিউ ইয়র্ক ফেড, সুইফট ও রিজাল ব্যাংকের মধ্যে কার, কতটুকু সম্পৃক্ততা ও দায়-দায়িত্ব আছে।

রিজাল ব্যাংকের সম্পৃক্ততা বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, গত ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাক অফিস অব দি ডিলিং রুমের কর্মকর্তারা দাপ্তরিক কাজ শেষে রাত ৮টা ৩ মিনিটে অফিস ত্যাগ করেন। রাত আনুমানিক ৮টা ৩৫ মিনিটে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট পাসওয়ার্ড হ্যাক করে ১৯২ কোটি ডলারের মোট ৭০টি ভুয়া পরিশোধ বার্তা ফেডে পাঠায়। এর মধ্যে ৩৫টি বার্তা ভুল ফরমেটের কারণে বাতিল হয়ে যায়। সন্দেহ হওয়ার কারণে আরো ৩০টি বার্তা সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চিত করতে বলা হয় এবং ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের পাঁচটি পরিশোধ বার্তা কার্যকর হয়ে যায়। এর মধ্যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক পরিশোধ করে। ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজাল বরাবর সুইফট মেসেজের মাধ্যমে ‘স্টপ পেমেন্ট’ মেসেজ পাঠানোর পরেও রিজাল অর্থ ছাড় করে। এ বিষয়ে দায়িত্বে অবহেলা ও মানি লন্ডারিংয়ে সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়ায় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি রিজাল ব্যাংককে দুই কোটি ১০ লাখ ডলার জরিমানা করেছে। 

রিজার্ভ চুরির সময়কার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ব্যাক অফিসের কর্মকর্তারা অফিসে এসে সুইফটে লগ ইন করে স্বয়ংক্রিয় প্রিন্টার দ্বারা মেসেজ প্রিন্ট করতে ব্যর্থ হন। তাঁরা এটিকে প্রিন্টারসংশ্লিষ্ট সাধারণ সমস্যা মনে করেন এবং শনিবার ছুটির দিনে তা সমাধান করা যাবে ভেবে অফিস ত্যাগ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি অফিসে এসে কর্মকর্তারা আবারও প্রিন্টার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হয়ে অন্য একটি প্রিন্টার সুইফটে সংযোগ দিয়ে মেসেজ প্রিন্ট করার চেষ্টা করেন। এতেও ব্যর্থ হয়ে তাঁরা বিকল্প উপায়ে প্রতিটি মেসেজ ম্যানুয়ালি প্রিন্ট করেন এবং মেসেজগুলো বাছাই করতে গিয়ে ফেডকে পাঠানো ৩০টি মেসেজ সম্পর্কে তিনটি সুইফট মেসেজ পান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগের দিন ফেডের পাঠানো বার্তাগুলো পর্যালোচনা করে দেখতে পান, ওই বার্তাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো হয়নি। প্রকৃতপক্ষে হ্যাকাররা বার্তা সম্পর্কিত সব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভার থেকে মুছে ফেলেছিল এবং প্রিন্টার রিনেইম করেছিল, যার জন্য সুইফট মেসেজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রিন্ট দেওয়া সম্ভব হয়নি। তখন এ শাখার কর্মকর্তারা সুইফট হ্যাকিং হয়ে থাকতে পারে মর্মে আশঙ্কা করেন এবং বিষয়টি বিভাগের মহাব্যবস্থাপককে জানান। মহাব্যবস্থাপক বিষয়টি ডেপুটি গভর্নরকে জানান। শাখার কর্মকর্তারা ফেডে ই-মেইল ও ফ্যাক্স করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট হ্যাকিংয়ের আশঙ্কার কথা জানান এবং সব পরিশোধ বার্তা বাতিল করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু সেদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় ফেডের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’

মন্তব্য