kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

স্ত্রীর লাশ কাঁধে ১০ কিমি...

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৬ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্ত্রীর লাশ কাঁধে ১০ কিমি...

ভারতের ওড়িশা রাজ্যের এক হাসপাতালে অসুস্থ স্ত্রীর মৃত্যুর পর অর্থাভাবে অ্যাম্বুল্যান্স বা অন্য কোনো যান না পেয়ে ৬০ কিলোমিটার দূরের বাড়ির দিকে স্ত্রীর লাশ কাঁধে নিয়ে হাঁটা শুরু করেন দানা মাঝি। পাশে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছে মেয়ে। ছবি : সংগৃহীত

স্ত্রী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সরকারি হাসপাতালে। সেখান থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে তাঁর গ্রামের বাড়ি। হাতে টাকা নেই বলে লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো গাড়ি দিতে রাজি হয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাই পাশে ১২ বছর বয়সী মেয়ে আর কাঁধে চাদর মোড়ানো স্ত্রীর লাশ নিয়ে হেঁটেই বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন হতদরিদ্র দানা মাঝি।

এভাবে ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর একটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক দেখতে পান, চাদরে মোড়া লাশ কাঁধে নিয়ে এক ব্যক্তি হেঁটে যাচ্ছেন, পাশে একটি বাচ্চা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছে। দ্রুত তাদের কাছে এগিয়ে গেলেন ওই সাংবাদিক। পরে পুরো ঘটনা জানতে পেরে লাশ বাড়িতে নিতে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করে দেন তিনি। ভারতের ওড়িশা রাজ্যে গত বুধবার এ ঘটনা ঘটে। তবে দেশটির গণমাধ্যমে গতকাল বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশ পায়। ভারতের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্রতম জেলাগুলোর অন্যতম ওড়িশার কালাহান্ডির বাসিন্দা দানা মাঝি।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, দানা মাঝির স্ত্রী ৪২ বছর বয়সী আমং দীর্ঘদিন ধরে যক্ষ্মা রোগে ভুগছিলেন। কালাহান্ডির ভবানীপাটনা শহরের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল তাঁর। মঙ্গলবার রাতে সেখানেই মারা যান তিনি। দিন আনা দিন খাওয়া দানা মাঝির জীবনে যেটুকু সম্বল ছিল তা স্ত্রীর চিকিৎসা করাতেই খরচ হয়ে গেছে। স্ত্রী যে মারা যাবেন তা অবশ্য আগেই টের পেয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, স্ত্রীকে বাঁচাতে গেলে আরো উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। যার ব্যয়ভার তাঁর পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। ফলে ঠিকঠাক চিকিৎসা না পেয়ে চোখের সামনেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন স্ত্রী। স্ত্রী যখন চূড়ান্ত যক্ষ্মা যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন, দানা মাঝিও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। গরিব হওয়ার যন্ত্রণায়। মনে মনে হয়তো নিজেকে আশ্বস্ত করেছিলেন এটা ভেবে যে মারা গেলে এই গরিব হওয়ার যন্ত্রণা থেকে অন্তত মুক্তি পাবেন স্ত্রী। কিন্তু মারা যাওয়ার পরও এই যন্ত্রণা যে পিছু ছাড়ার নয়!

স্ত্রীর মৃত্যুর পর লাশ বাড়ি নিয়ে আসার তোড়জোড় শুরু করেন দানা। কিন্তু লাশ হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতে গেলে তো গাড়ি লাগবে। আর গাড়ি ভাড়া করতে গেলে তো বেশ কিছু টাকা লাগবে। কোথায় পাবেন সেই টাকা! সরকারি প্রকল্প ‘মহাপ্রয়াণ’ অনুযায়ী গরিবদের জন্য বিনা মূল্যে যে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা রয়েছে, তাও ভাগ্যে জোটেনি দানার। ফলে বিহ্বল দানা আর তাঁর মেয়ে গাড়ির ব্যবস্থা করার জন্য ডাক্তারদের হাতে-পায়ে ধরতে শুরু করেন। হাসপাতালের কর্মীদের কাছ থেকেও সাহায্য ভিক্ষা চান। কিন্তু তাঁদের চোখের জল আসলে ‘পাষাণ’ হৃদয় ভেদ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষমেশ বুধবার ভোরে লাশ কাপড়ে জড়িয়ে কাঁধে চাপিয়েই রওনা দিতে হয় দানাকে। বাবার পায়ে পা মিলিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই ১০ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে পার করে ফেলে তাঁর ১২ বছরের মেয়েও। হাসপাতাল থেকে এই ১০ কিলোমিটার রাস্তা পর্যন্ত সবাই শুধু দাঁড়িয়ে দেখল। কেউ কেউ আবার দূরে দাঁড়িয়ে করুণাও দেখাল। কিন্তু সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলো না কেউই। এরপর অবশ্য এক সাংবাদিকের চেষ্টায় বাকি রাস্তার জন্য একটা অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা হয়েছিল। ফলে বাকি ৫০ কিলোমিটার আর স্ত্রীকে কাঁধে বয়ে হাঁটতে হয়নি দানাকে।

বিবিসি বাংলা জানায়, দানা বলেন, ‘হাসপাতালে সবাইকে অনুরোধ করেছিলাম স্ত্রীর লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি ব্যবস্থা করে দিতে। কেউ সাহায্য করেনি। উপায় না দেখে কাঁধে স্ত্রীর লাশ নিয়ে মেয়েকে সঙ্গে করে হেঁটেই গ্রামে ফিরছিলাম।’

এনডিটিভি জানায়, ওই টিভি সাংবাদিক দানা মাঝির কাছে পুরো ঘটনা শুনে ফোন করে স্থানীয় জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানান। জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে সেখানে আসে অ্যাম্বুল্যান্স। সেই অ্যাম্বুল্যান্সে করেই স্ত্রীর লাশ আর ছোট মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ফেরেন দানা। পরে প্রশাসনের সহায়তায় বুধবার সন্ধ্যায় হয় লাশের শেষকৃত্যও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা