kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

বিদেশি অর্থে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা হুজির

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৬ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিদেশি অর্থে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা হুজির

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পর পর্যায়ক্রমে মুফতি হান্নানসহ শীর্ষ পর্যায়ের বেশির ভাগ তাত্ত্বিক নেতা গ্রেপ্তার হলেও বিদেশি অর্থে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে আবার মাথা তোলার চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম বাংলাদেশ (হুজি-বি)। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হুজি-বির ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মওলানা নাজিম উদ্দিনকে হেফাজতে নিয়ে (রিমান্ড) জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন গোয়েন্দারা। তাঁরা জানতে পেরেছেন, হুজি-বিকে নতুন করে সক্রিয় করে তুলতে দুবাইসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। গত এক বছরে হুন্ডির মাধ্যমে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়েছে হুজি-বি। হুজি-বির মূল দলের পাশাপাশি তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর কাছেও বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ এসেছে।

নাজিম উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা বলছেন, গত কয়েক মাসে দুবাই থেকে দুই দফায় ছয় লাখ টাকা পেয়েছেন নাজিম উদ্দিন। সেই অর্থ দেশের উত্তরাঞ্চলের ৫১টি পরিবারকে দিয়েছেন তিনি। মাঠপর্যায়ে হুজি-বির সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এ টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই ৫১ পরিবারকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম।

দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই হুজি-বিকে বিদেশ থেকে অর্থ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, দেশের বাইরে থেকে বর্তমানে হুজি-বিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন মুফতি শহিদুল নামের এক ব্যক্তি। রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুফতি শফিকুর রহমান নামের আরেক নেতাও বর্তমানে হুজিকে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। তিনিই দুবাই থেকে হুজি-বিকে অর্থ পাঠিয়ে সহযোগিতা করছেন। এ ছাড়া আরো কয়েকজন হুজি-বিকে সংগঠিত করতে বিদেশ থেকে অর্থ পাঠাচ্ছেন। বিশেষ করে হুজি-বির বর্তমান সামরিক কমান্ডার শহীদুলের ছেলে মোহাম্মদ তালহার কাছে বেশি অর্থ আসছে। মূলত তালহার নেতৃত্বেই দেশে অবস্থানকারী আঞ্চলিক নেতারা মাঠপর্যায়ে হুজি-বিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। আর বিদেশে আত্মগোপনে থেকে তালহার বাবা মুফতি শহিদুল ইসলাম হুজি-বিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

র‌্যাব ও ডিবির গোয়েন্দা সূত্র মতে, ২০০৫ সালের অক্টোবরে হুজি-বি নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। এরপর ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হুজি-বি নানা কৌশলে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। এর মধ্যে হুজি-বি একবার সংবাদ সম্মেলনের চেষ্টা চালিয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতেও আসার চেষ্টা করে। সে সময় তিন ভাগে বিভক্ত হওয়া হুজি-বির একাংশের নেতৃত্বে ছিলেন মুফতি হান্নান। আরেক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন মুফতি আবদুর রউফ। অন্য অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুস সালাম, মুফতি শফিকুল ইসলাম, শেখ ফরিদ, আবদুল হাই ও হাফেজ ইয়াহিয়া। তাঁরা বর্তমানে কারাগারে। তাদের মধ্যে আব্দুস সালামকে জিজ্ঞাসাবাদে হুজি-বির তিন ধারায় বিভক্ত হওয়ার তথ্য জানতে পেরে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার ঘটনায় পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পক্ষ নেওয়া দেশি-বিদেশি অপশক্তি ইন্ধন দিচ্ছে। তাদের মাধ্যমেই হুজি-বিসহ অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারীদের হামলার টার্গেটে কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা), দূতাবাস, বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ভিআইপিরা রয়েছেন। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ ব্যাপারে সরকারকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। তবে জোটবদ্ধ হয়ে জঙ্গি সংগঠনগুলো যাতে কোনোভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখছেন গায়েন্দারা। দেশব্যাপী গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সারা দেশে ব্যাপক অভিযানের ফলে নতুন নামে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো তৎপর হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

হুজি-বির ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মওলানা নাজিম উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, দুবাইসহ বেশ কয়েকটি দেশে হুজির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। সেসব দেশের নেতাদের সঙ্গে মিলে সেখানকার কিছু গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে আর্থিক সহযোগিতা করছে। তাদের সঙ্গে দেশে সরকারবিরোধী শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাত রয়েছে। যেহেতু হুজি-বির শীর্ষ নেতারা জেলে, তাই মাঠপর্যায়ে অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গেও হুজি-বির যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমানে হুজি-বি তার পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে চলমান সামাজিক প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে দলকে সংগঠিত করছে। তাই জেএমবি, আনসারুল্লাহর মতো তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দলে টানার উদ্যোগ নিয়েছে। 

নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ আনাস ও সাইদুজ্জামান। তাঁদেরও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। ডিবি সূত্র জানায়, নাজিম উদ্দিন রাজধানীর মিরপুরের আকবর কমপ্লেক্সের একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সহযোগী সাইদুজ্জামান কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি সম্পন্ন করেছেন। তিনি নাজিমের মাধ্যমে হুজির দাওয়াতি কার্যক্রমে অংশ নিতেন। আর আনাস মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় হুজি-বির শীর্ষ নেতাসহ বেশির ভাগ নেতা-কর্মী বর্তমানে জেলে রয়েছে। যেসব নেতাকর্মী কারাগারে রয়েছে বা পলাতক জীবন যাপন করছে, তাদের প্রত্যেকের পরিবার ও সংসারের ভরণপোষণ দেওয়া হচ্ছে সংগঠন থেকে। নাজিম উদ্দিনের মাধ্যমে হুজি-বি নেতা-কর্মীদের বাসায় মাসে চার থেকে ১২ হাজার করে টাকা দেওয়া হচ্ছিল। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন অন্য নেতাদের মাধ্যমে সেই টাকা দেওয়া হচ্ছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, বিদেশে যারা যুদ্ধরত আছে বা নিহত হয়েছে তাদের পরিবারসহ ইতিমধ্যে ফাঁসিসহ বিভিন্ন দণ্ড পাওয়া জঙ্গিদের ৫১ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে হুজি-বি। গ্রেপ্তার সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, এসব পরিবারের বেশির ভাগ উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র। আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রমাণ পেয়ে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, বর্তমানে তরুণদের টার্গেট করছেন সব জঙ্গি সংগঠনের নেতারা। নানা দুঃখ, কষ্ট, দুর্বলতা আছে—এমন তরুণদের সঙ্গে ধর্মবিষয়ক কথাবার্তা বলে একপর্যায়ে জঙ্গিবাদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। 

ডিবির তথ্য মতে, গত ২৩ জুলাই পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার একটি প্রকাশনা অফিস থেকে হুজি-বির সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে বেশ কিছু নথি জব্দ করা হয়েছে। ওই অফিস থেকে একটি তালিকা জব্দ করে জানা গেছে, দুই বছর ধরে দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ আসছে। ডিবি সূত্র জানায়, নাজিম উদ্দিনসহ গ্রেপ্তার তিনজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাবাজারের প্রকাশনাটি হুজি-বির ঢাকা মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে সগির বিন এমদাদের। অভিযানে সেখান থেকে পাঁচ হাজার জিহাদি বই জব্দ করা হয়েছে।  

র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় হুজি-বির সদস্য রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে হুজি-বি মূল সংগঠন থেকে বের হয়ে ‘আল আনসার’ নামে নতুন জঙ্গি সংগঠন গঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছে। চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসার দুই শিক্ষার্থী আল আনসারের নেতা বলে জানা গেছে। সম্প্রতি রাজধানীর হাজারীবাগের ‘আল জমিয়াতুল উলুম মাদ্রাসা’র  দক্ষিণ পাশের একটি বাড়ি থেকে আল আনসারের প্রধান সমন্বয়কারী হাফেজ মোহা. রাশিদুল আলমসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক জিহাদি বই ও প্রশিক্ষণসামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। 

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, রাশিদুল আলমসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, হুজি-বি ফের সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে চট্টগ্রামের দুই মাদ্রাসা ছাত্রের মাধ্যমে। এর বাইরেও তাদের আরো অনেক নেতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে মূল দলের সদস্যরা নতুন নামে নতুন দল গঠন করে সংগঠতি হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এদের সব নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কোনোভাবে দেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না।

রাশিদুলসহ অন্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব-২-এর পরিচালক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, হুজি-বির সদস্যরা পুরনো সংগঠন থেকে বের হয়ে আল আনসার নামের একটি নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আটক ব্যক্তিদের সবাই পূর্ববর্তী হুজি-বির সক্রিয় সদস্য। ক্রমাগত অভিযানে হুজি-বির সদস্যরা গ্রেপ্তার হওয়ায় অন্যরা আল আনসার নামের নতুন সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করে। 

প্রসঙ্গত, হুজি বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে কার্যক্রম শুরু করে। সে সময় থেকে আফগান ফেরত মুজাহিদরা মিলে হুজির নামে সংগঠনের ব্যানারে তৎপর হতে শুরু করে। আজ জেএমবি, আনসারুল্লাহসহ নানা জঙ্গি সংগঠনের মাধ্যমে দেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারের যে চেষ্টা চলছে তার নেপথ্যেও হুজি অন্যতম। ১৯৯৯ সালে কবি শামসুর রাহমানকে হত্যাচেষ্টা, ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা, ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বোমা হামলা এবং ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালায় হুজি। ২০০৫ সালে সংগঠনটি নিষিদ্ধ করা হয়।

মন্তব্য