kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

নিয়ম মানে না কেউ

ডোবে লঞ্চ ভাঙে স্বপ্ন

পটুয়াখালী

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

২২ মে, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারায়ণগঞ্জের তরুণ জয়নাল আবেদিন। ২০১০ সালে চাকরির সুবাদে ঢাকায় তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার মো. মহিউদ্দিনের। তখন দুজনের বয়স ২২ থেকে ২৩ বছর। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে জয়নাল সৌদি আরবে যাওয়ার ভিসা পান। বন্ধু বিদেশ চলে যাবেন, তাই গলাচিপায় গ্রামের বাড়িতে বন্ধুকে মায়ের হাতের রান্না খাওয়াতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসেন মহিউদ্দিন। ওখানে দুই দিন বেড়ান জয়নাল। কথা ছিল কয়েক মাস পর তিনি মহিউদ্দিনকেও বিদেশে নেবেন।

৩ মে জয়নাল গলাচিপা থেকে এমভি শাথিল-১ লঞ্চযোগে পটুয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দেন। পটুয়াখালী পৌঁছে ঢাকার লঞ্চ ধরবেন তিনি; কিন্তু পথে গলাচিপার রামনাবাদ নদীতে শাথিল-১ লঞ্চটি কালবৈশাখীর কবলে পড়ে ডুবে যায়। একদিন পর জয়নালের লাশ পাওয়া যায় নদীতে। এরপর বন্ধু মহিউদ্দিন আর জয়নালের পরিবারের শুধুই আহাজারি। নিয়ম-নীতি না মানায় লঞ্চ দুর্ঘটনায় ভেঙে যায় জয়নাল-মহিউদ্দিনের সব স্বপ্ন।

ওই দুর্ঘটনায় নিহত আরো ১৫ জনের পরিবরেরও স্বপ্ন ভাঙে। অথচ ২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি এমভি শাথিল-১ লঞ্চটি দুর্ঘটনায় পড়ে লোহালিয়া নদীতে ডুবে গিয়েছিল। পরে লঞ্চটির রুট পারমিট বাতিল করে নৌ অধিদপ্তর; কিন্তু কাগজ-কলমে ‘শাথিল-১’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘শাতিল’ লিখে ৪৫ দিনের অনুমতি নিয়ে পটুয়াখালী-গলাচিপা-রাঙ্গাবালী রুটে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল আবার চলাচল শুরু করে। এর ২০ দিনের মাথায় ওই দুর্ঘটনায় পড়ে লঞ্চটি। পরে বিআইডাব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে লঞ্চের মালিক, চালক ও মাস্টারকে আসামি করে মামলা করা হয়। তখন গলাচিপা থানা ও মেরিন কোর্টে তিনটি মামলা হলেও বর্তমানে মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া ওই দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গলাচিপার ওই পথে বর্ষা মৌসুমে সি-ট্রাক বা বড় লঞ্চ চলাচলের সুপারিশ করলেও তা মানা হয় না।

দায়িত্বে অবহেলা : অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর অধীনে প্রণীত বিধি অনুযায়ী নৌযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ এবং মাস্টার ও ড্রাইভারের সনদ যাচাই এবং যাত্রীসংখ্যা গণনার পর লঞ্চঘাট ছাড়ার অনুমতি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ দায়িত্ব বিআইডাব্লিউটিএর বন্দর এবং নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের; কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ সময়ই নৌবন্দর কর্মকর্তা ও ট্রাফিক ইন্স্পেক্টররা এ দায়িত্ব পালন করেন না।

নিয়ম মানে না কেউ : বিআইডাব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, নৌদুর্ঘটনা থেকে রেহাই পেতে ২০০০ সালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বৈরি আবহাওয়ার মৌসুমে অভ্যন্তরীণ রুটে ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৬৫ ফুটের কম দৈর্ঘ্যের সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়, কিন্তু সে নিয়ম কেউ মানছে না। ফলে রাঙ্গাবালীর কোড়ালিয়া থেকে গলাচিপার পানপট্টি, রাঙ্গাবালী থেকে ভোলার লালমোহন, গলাচিপা থেকে চরমোন্তাজ, গলাচিপা থেকে মৌডুবী, উলানিয়া থেকে চরমোন্তাজ, গলাচিপা থেকে নিজকাটা, বাউফলের কালাইয়া থেকে চরমোন্তাজ, চরবিশ্বাস, চরকাজল রুটসহ অভ্যন্তরীণ প্রায় ১৫০ রুটে উল্লিখিত সময়ে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীবাহী নৌযানগুলোকে উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। আর তখনই ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি। অথচ তখন ছোট লঞ্চ বা ট্রলার বন্ধ করে সি-ট্রাক বা বড় লঞ্চ চললে এড়ানো যায় দুর্ঘটনা। সরকারের ওই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন চায় যাত্রীরা।

লঞ্চগুলোতে যত অনিয়ম : সরেজমিন দেখা যায়, সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে (মার্চ থেকে অক্টোবর) উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন পথে যেসব যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল করে সেসবের অধিকাংশের ফিটনেস নেই। রয়েছে যান্ত্রিক ত্রুটি। রুট পারমিট নেই অনেক নৌযানের। এ ছাড়া নদীপথে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি নৌযানে লাইফবয়া, ফায়ার বাকেট, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, বালুভর্তি বাক্স, সার্চলাইট ও হস্তচালিত পানির পাম্পের ব্যবস্থা রাখার বিধান থাকলেও অনেক নৌযানে তা নেই। ফলে নৌদুর্ঘটনাগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যায় বহুগুণ। যাত্রীদের দাবি, প্রশাসনের কড়া নজরদারি থাকলে নিয়ম মেনে চলত নৌযানগুলো। তাতে দুর্ঘটনা অনেকটা রোধ করা যেত।

পটুয়াখালী অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরের সহকারী পরিচালক খাজা সাদিকুর রহমান বলেন, ‘(মার্চ-অক্টোবর) শুধু ২ নম্বর সতর্কসংকেত দেওয়া হলেই ৬৫ ফুট দৈর্ঘ্যের লঞ্চ বা যাত্রীবাহী যেকোনো নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া লঞ্চ চলাচলে কোনো অনিয়ম নেই।’

মন্তব্য