kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

কমেছে নাব্যতা জেগেছে চর

অস্তিত্ব সংকটে গাবখান চ্যানেল

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

২২ মে, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কমেছে নাব্যতা জেগেছে চর

গাবখান চ্যানেলে প্রবেশের প্রথম বাঁকেই জেগে ওঠা চর। ভাটার সময় এই বাঁকে বড় জাহাজ চালকদের বিপাকে পড়তে হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

নাব্যতা ও প্রশস্ততা কমে যাওয়া, প্রতিটি বাঁকের মুখে চর জেগে ওঠা ও অসংখ্য ডুবোচরের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বাংলার সুয়েজ খাল খ্যাত ঝালকাঠির গাবখান চ্যানেল। গত ৩০ বছরে টেকসই খনন (ড্রেজিং) না হওয়া ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চ্যানেলটি দিয়ে বর্তমানে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে দেশি-বিদেশি বড় নৌযানগুলো। এতে প্রতিনিয়ত বিপাকে পড়তে হচ্ছে নৌযানচালকদের। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান সমুদ্রবন্দর মোংলার সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নৌ যোগাযোগ হুমকির মুখে পড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে চ্যানেলটি সংস্কার করা না হলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সূত্র জানায়, ঝালকাঠির সুগন্ধা, বিষখালী ও ধানসিড়ি নদীর মোহনা থেকে পিরোজপুরের সন্ধ্যা নদী পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের গাবখান চ্যানেলটি (কৃত্রিম) ১৮০০ সালের প্রথম দিকে ব্রিটিশ শাসনামলে কাটা হয়। এটি ঝালকাঠি থেকে পিরোজপুরের কচা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। অবিভক্ত ভারতের এ অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজতর করতে চ্যানেলটি খনন করা হয়েছিল। সেই থেকে চ্যানেলটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চ্যানেলটি দিয়ে প্রতিদিন ভারতীয় জাহাজ, যাত্রীবাহী ঢাকা-খুলনার জাহাজ, চট্টগ্রাম থেকে মোংলা, যশোর, খুলনা, নওহাটা ও বেনাপোলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। বাংলাদেশ থেকে নদীপথে ভারতে যাতায়াতের জন্যও এটি ব্যবহূত হয়। এ ছাড়া যাত্রীবাহী লঞ্চ, স্টিমার, রকেটসহ যোগাযোগের ক্ষেত্রে নৌপথনির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এটি। ৫০-৬০টি জাহাজ প্রতিদিন এ পথে চলাচল করে। ২০ মিটার গভীরতা করে চ্যানেলটি তৈরি করা হলেও বর্তমানে দুই তীরে পলি পড়ে গভীরতা কমে যাচ্ছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা গাবখান চ্যানেল ব্যবহার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর হামলা করতে সক্ষম হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও গাবখান চ্যানেলের প্রশস্ততা ছিল ২৫০ মিটারের বেশি। কিন্তু সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় তা ১০০ মিটারে নেমে এসেছে। চ্যানেলটির বাঁকে বাঁকে চর জেগে ওঠায় কোনো কোনো স্থানে প্রশস্ততা আরো কমে গেছে। ভাটার সময় বড় একটি নৌযান চ্যানেলে প্রবেশ করলে অন্য প্রান্ত থেকে নৌচলাচল বন্ধ করে দেয় নৌ ট্রাফিক বিভাগ। এ ছাড়া পলি জমে বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর তৈরি হওয়ায় খনন না করলে চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শুধু জোয়ারের সময় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে বড় নৌযান। এতেও মাঝেমধ্যে বিপাকে পড়তে হয় নৌচালকদের।

চ্যানেলটির প্রবেশমুখে তিনটি নদীর মোহনায় অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ব দিকে সুগন্ধা, দক্ষিণে বিষখালী ও পশ্চিমে ধানসিড়ি নদীর মোহনায় ডুবোচরের কারণে উত্তর-পশ্চিমে প্রবাহিত চ্যানেলটি দিয়ে বড় নৌযানগুলোর চলাচল করতে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

চ্যানেলটির গভীরতা কমে যাওয়ায় ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে নৌ ট্রাফিক কার্যক্রম চালু করে বিআইডাব্লিউটিএ। চ্যানেলের বাঁক সংকেত (সিগন্যাল) যথাযথভাবে মেনে একমুখী যান চলাচলের জন্য ও নৌযানভেদে টোল আদায়ে কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। এই বিধি-নিষেধ যাতে অনুসরণ করা হয়, সে জন্য ঝালকাঠি ও কাউখালী স্টিমারঘাটে নিরাপত্তার স্বার্থে নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থা ও টোল পয়েন্ট চালু করা হয়।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে গাবখান চ্যানেলে খনন করা হয়। তবে তা যেনতেনভাবে করা হয় বলে মন্তব্য করে নৌযানচালকরা। নদীর পলি কেটে তীরে ও নদীতেই ফেলা হয়েছিল। ফলে বড় নৌযান চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানায় চালকরা।

এমভি সোনার বাংলা জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. সাফায়েত হোসেন বলেন, গাবখান চ্যানেলটি জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং না করলে বড় জাহাজগুলোকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে মোংলা বন্দরে পৌঁছাতে হবে। এতে সময় ও খরচ বাড়বে এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

নৌযানচালক বশির উদ্দিন বলেন, গাবখান চ্যানেলের মোহনায় সুগন্ধা, বিষখালী ও ধানসিড়ি তিনটি নদীতেই অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভাটার সময় বড় নৌযানগুলো বাঁক নিয়ে চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারে না।

স্টিমার এমভি মধুমতির মাস্টার ক্যাপ্টেন আবিদ বদরুল আলম বলেন, গাবখান চ্যানেল খননে দৃশ্যমান কোনো কাজ হচ্ছে না। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর (গাবখান সেতু) নিচে উত্তর পাশটি অত্যন্ত জটিল স্থান। পলি পড়ায় ওই স্থান দিয়ে যান চলাচল কষ্টকর। তিনি বলেন, বড় জাহাজ চলাচলে এ চ্যানেলে পাঁচ-ছয় মিটার গভীরতার দরকার থাকলেও তা নেই।

ঝালকাঠিতে বিআইডাব্লিউটিএর কোনো কর্মকর্তা নেই। তাই এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিআইডাব্লিউটিএর ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গাবখান চ্যানেলের নাব্যতা সংকটের বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আমরা ড্রেজিং বিভাগকে জানাব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা