kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

রাগ থেকেই দেশ ছেড়েছিলাম

২৭ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



রাগ থেকেই দেশ ছেড়েছিলাম

ছবি : মীর ফরিদ

‘সাদেক-কামাল’ জুটিটা হকির। এবং হকি বাংলাদেশের তৃতীয় খেলা। জনপ্রিয়তায় এর চেয়ে এগিয়ে থাকা ক্রিকেট-ফুটবলেও এমন কোনো জুটির কথা কারো মনে এভাবে স্থায়ী হয়নি। সেই জুটির সিনিয়র পার্টনার মোহাম্মদ সাদেকের কীর্তি শুধু কিংবদন্তি জুটি তৈরিতেই আটকে নেই। ঢাকার মাঠে গোলের মালা গাঁথা, দুর্দান্ত ড্রিবলিংয়ে ‘ম্যারাডোনা’ খ্যাতি পাওয়া, হকির অনেক কৌশলের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষকে প্রথম পরিচয় করানো মিলিয়ে তাঁর প্রভাবের গণ্ডি হকিরও সীমানা ছাড়ানো যেন। অথচ সেই তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল হকিজনিত বঞ্চনা নিয়ে। ছুটিতে দেশে আসা সাদেকের সঙ্গে নোমান মোহাম্মদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটা সেই রাগ-অভিমান দিয়ে শুরু। কিন্তু রাগ আর অভিমান তো সাদেকের ক্যারিয়ারের ছোট্ট একটা ছায়া মাত্র, বাকিটা সোনালি গল্প। 

 

 

 

প্রশ্ন : দেশ ছেড়ে বিদেশে আছেন অনেক দিন। কেন ছাড়লেন বাংলাদেশ?

মোহাম্মদ সাদেক : রাগ করে।

প্রশ্ন : রাগ! ঘটনাটি একটু যদি বলেন।

সাদেক : জাতীয় দল থেকে আমাকে বাদ দেওয়ার রাগ। ১৯৯৮ সালে এশিয়ান গেমসে দল ভালো করতে পারেনি। এর দায় তো শুধু আমার একার না। কিন্তু পরের বছর জাতীয় দল গঠনের সময় দেখা যায়, আমিই বলির পাঁঠা। দল থেকে দেয় বাদ। রাগ করে তাই বিদেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। দুই-তিনজনের কারণে আমার ওই অবস্থা। তাদের নাম বলতে চাই না। এত বছর পর বললেও-বা কী! আরেকটি ব্যাপার হলো, তখন আমি ঊষায় খেলি। যদি আবাহনী-মোহামেডানে খেলতাম, তাহলে বাদ দেওয়ার সাহস করত না।

প্রশ্ন : তখনো তো আপনি ফর্মে ছিলেন?

সাদেক : সেরা সময়টা হয়তো পেছনে। কিন্তু জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার অবস্থায় যাইনি। তখন এই হকি স্টেডিয়ামে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা হচ্ছিল। ঢাকা জেলার সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। দুই দলের ফাইনাল খেলা নিশ্চিত। আমি তাই দুই দলের মুখোমুখি লিগ পর্বের শেষ ম্যাচের দিন মাঠে আসিনি। আমেরিকান দূতাবাসে যাই ভিসার কাগজপত্র জমা দিতে। ম্যাচটিতে আমার দল ঢাকা জেলা হেরে যায়। কিন্তু ফাইনালে ঠিকই খেলি এবং দলকে করাই চ্যাম্পিয়ন। অনেকে তখন বলেন, ‘আপনি তো ভালো ফর্মে। কেন বিদেশ যাচ্ছেন?’ কিন্তু ওই যে বললাম, জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ায় হকির ওপর থেকে মন উঠে যায়। বলতে পারেন রাগ করে কিংবা অভিমান করে চলেই গেলাম।

প্রশ্ন : ফেরার কথা আর ভাবেননি?

সাদেক : নাহ। বিদেশে গিয়ে ওখানকার জীবনযাত্রার চক্রে পড়ে গেলে অন্য কিছু ভাবা কঠিন। ১৯৯৯ সালে স্ত্রী-সন্তানসহ যাই আমেরিকায়। নিউ ইয়র্কে ছিলাম চার বছর। ২০০৩ সালে যাই কানাডা। নাইন-ইলেভেনপরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকাটা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তাঁর ওপর আমরা ছিলাম অবৈধ হিসেবে। কানাডা চলে যাই তাই। এখন সেখানেই আছি।

প্রশ্ন : দেশে এবার এলেন কত দিন পর?

সাদেক : ২০১০ সালে একবার, এরপর এবার। ১৭ বছরে এই দুবারই এসেছি বাংলাদেশে। এ মাসের ১৩ তারিখ এসেছি, চলে যাব আগামী মাসের ১২ তারিখ। দাঁতে কিছু সমস্যা আছে, সে জন্য ডাক্তার দেখাব। পাশাপাশি মনে হলো, সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও হবে। কারণ যত দূরে থাকি, যে দেশেই থাকি—আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় তো বাংলাদেশের হকির সাদেক।

প্রশ্ন : আপনার প্রবাসজীবন সম্পর্কে আরো জানব। আগে ওই বাংলাদেশের হকি তারকার পরিচয় নিয়ে জানতে চাই। এ দেশের হকির সর্বশেষ সুপার স্টার ‘সাদেক-কামাল জুটি’। এটি ভাবলে কেমন লাগে?

সাদেক : এক হিসেবে ভালো, আমাকে সবাই মনে রেখেছেন বলে। আবার অন্যদিক দিয়ে চিন্তা করলে ব্যাপারটার ফাঁকও রয়েছে। আমি খেলা ছেড়েছি সেই কবে, কামালও স্টিক তুলে রেখেছে। তারপর কেন হকি থেকে কোনো সুপার স্টার বেরোয়নি? আমাদের জুটি কেন শেষ সুপার স্টার হয়ে থাকবে?

প্রশ্ন : রফিকুল ইসলাম কামালের সঙ্গে আপনার জুটি কিংবদন্তুিতুল্য। দুজনের রসায়নটা এত ভালো হয় কিভাবে?

সাদেক : ঠিক জানি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, দুজন দুজনের খেলা বুঝতাম ভালো। আমি জানতাম, কোথায় পাস দিতে হবে। কামাল জানত, তা ধরে কিভাবে গোল করতে হবে। দুজনে মিলে সব প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিতাম। আমার মূল আনন্দ গোল করানোয়। এমন অনেক হয়েছে যে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে কাটিয়ে ফাঁকা পোস্টে বল না ঠেলে আমি কামাল বা অন্য কোনো সতীর্থকে পাস দিয়ে দিয়েছি। ওরা গোল করত।

প্রশ্ন : কেন? মানে হকি-ফুটবলের মতো খেলায় একজন ডিফেন্ডারও তো গোলের সুযোগ পেলে গোলটাই করেন আগে...

সাদেক : আসলে মানুষ যে বলত, ‘সাদেক গোলরক্ষককে ডজ দিয়ে কাটিয়ে নিজে গোল না করে অন্যকে দিয়ে করায়’—এটি শুনতে ভালো লাগত। আমি গোল করলে সেটি বড় ব্যাপার নিঃসন্দেহে। কিন্তু এত দিনে তা হয়তো অনেকে ভুলে যেত। কিন্তু ওই যে প্লে-মেকার হিসেবে অন্যদের দিয়ে গোল করানো, সেটি কেউ ভোলেনি। আর কামালকে পাস দিলে ও সাধারণত মিস করত না।

প্রশ্ন : কামালের সঙ্গে ঘরোয়া হকিতে এক দলে তো আপনি খুব বেশি খেলেননি?

সাদেক : না। ক্লাবে ঊষায় শেষ দুই মৌসুম শুধু। আর ক্যারিয়ার হিসাব করলেও কামাল আমার জুনিয়র। আমি শেষ পাঁচ বছরে ওকে পাই। তখন জাতীয় দলে খেলতে খেলতে জুটি হিসেবে আমাদের নাম ফুটে যায়। সঙ্গে ঊষার শেষ সময়টা। তখন তো খেলতে নামলেই প্রতিপক্ষকে গোলে ভাসিয়ে দিতাম। এ ছাড়া জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ঢাকা জেলার হয়ে আমি ও কামাল খেলেছি নিয়মিত।

প্রশ্ন : ঢাকার মাঠে হকির অনেক কৌশল আপনিই প্রথম শুরু করেন বলে শুনেছি। দু-একটির কথা আপনার মুখ থেকে জানতে চাই।

সাদেক : শাহবাজ আহমেদ, তাহির জামানরা ঢাকার এলে তাঁদের কাছ থেকে ওসব আমি শিখি। এরপর একা একা অনুশীলনে রপ্ত করি তা। যেমন এমনভাবে প্রতিপক্ষের দিকে এগিয়ে যাই যেন ওরা মনে করে বল পেয়ে গেছে। এরপর বলের ওপর দিয়ে স্টিক ঘুরিয়ে তা নিয়ে যাই ডানে বা বাঁয়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেরিয়ে যাই একপাশ দিয়ে। হকিতে বাংলাদেশিদের মধ্যে রিভার্স শট মারাও শুরু করি আমি। এ ছাড়া আরেকটি ব্যাপার ঢাকার মাঠে চালু করি—একদিকে তাকিয়ে অন্যদিকে পাস দেওয়া।

প্রশ্ন : ফুটবলে ব্রাজিলিয়ান রোনালদিনহো যেমনটা করতেন?

সাদেক : ওই রকমই। একবার আমার দলের হারুনকে অমন একটা পাস দিই। তাতে প্রতিপক্ষই নয়, আমার ওই সতীর্থ পর্যন্ত ধোঁকা খেয়ে যায়। আমার কাছে এসে বলে, ‘সাদেক ভাই, আপনি তো অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমাকে যে বল দেবেন, বুঝতে পারিনি।’ ওকে বলি, ‘বুঝতে চেষ্টা করো। সব সময় মনে করবে তোমার কাছে বল আসতে পারে। সেভাবেই প্রস্তুত থাকবে।’ এবার দেশে আসার পরের একটি ঘটনা বলি। মাঠে দেখলাম এক খেলোয়াড় চিত্কার করছে ‘বল দাও, বল দাও’। পরে ওকে আমি বলি, ‘যদি বলের জন্য চিত্কার করো, তাহলে প্রতিপক্ষ তো তোমাকে গার্ড দিয়ে ফেলবে। বরং দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন করতে করতে একটা সম্পর্ক তৈরি করো। যেন ওরা বুঝতে পারে তুমি মাঠের কোথায় থাকবে।’ এরপর ওদের আমি বুড়ো বয়সেই একদিকে তাকিয়ে অন্যদিকে পাস দেওয়ার টেকনিক দেখাই। পাস থেকে একজন বলে ওঠেন, ‘বাঘ যত বুড়োই হোক, একটা পাঞ্জা দেখলেই বোঝা যায় যে সে বাঘ।’

প্রশ্ন : একা একা নাকি অনুশীলন করতেনও খুব?

সাদেক : খুব। পুরনো ঢাকার নবাববাড়ির পুকুর দেখেছেন? ইয়া বড়। সেটি আমি প্রতি দিন চক্কর দিতাম ২০ বার করে। তাতে দম বাড়ে। এখনকার ছেলেরা হকিস্টিকে বল টোকা দিয়ে ওপরে রাখে না! ওরা কতবার তা করে? ২০০বা ৩০০ বার? বিকেএসপির একটি ঘটনা বলি। ১৯৯২ সাল সম্ভবত। জাতীয় দলের ক্যাম্পে সেদিন কী কারণে ছুটি। সবাই বাইরে গেছে ঘুরতে। আমি নিজের ঘরের ক্যাসেট প্লেয়ারে একটি ইংলিশ গানের ক্যাসেট ছাড়ি। পুরোটা টেনে দিয়ে একেবারে প্রথম থেকে। এক পাশের গান শেষ হতে আধঘণ্টা লাগে, পুরো সময় স্টিকের টোকায় টোকায় বল ওপরে রাখি। কতবার জানেন? চার হাজার বার! এখনকার ছেলেদের এটি বললে তো বিশ্বাসই করবে না।

প্রশ্ন : এবার একটু শুরুর কথা জানতে চাই। আপনি তো নবাববাড়ি এলাকার ছেলে। সে সূত্রে ছোটবেলা থেকে হকিই কি প্রথম প্রেম?

সাদেক : তা না। অনেক খেলাই তখন খেলি। ব্যাডমিন্টন খেলি; ফুটবলও খুব। জানেন, আমি কিন্তু তৃতীয় বিভাগে ফুটবল খেলেছি। হকির আগে বরং ওখানেই বিভাগীয় পর্যায়ে খেলা শুরু। লালবাগ স্পোর্টিং দলে খেলি সম্ভবত ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে। কিন্তু ফুটবল আমার ঠিক পছন্দ হয়নি।

প্রশ্ন : কেন? তখন তো বাংলাদেশ ফুটবলের স্বর্ণ সময়?

সাদেক : ভালো ফুটবলারদের তখন পুরো দেশ এক নামে চেনেন সত্যি। কিন্তু আমি তৃতীয় বিভাগে ফুটবল খেলতে গিয়ে দেখি, ওরা বড্ড বেশি মেরে খেলে। যেন ফুটবল না, কুস্তি লড়ছে। সে কারণে ফুটবল ছেড়ে চলে আসি হকিতে।

প্রশ্ন : কিন্তু হকিতে তো মারামারির সুযোগ আরো বেশি। সবার হাতে হকিস্টিকের মতো অস্ত্র...

সাদেক : বাংলাদেশের হকি অঙ্গনের যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখুন তো, সাদেককে কেউ মারামারি করতে দেখেছেন কি না? কেউ বলতে পারবেন না। আমাদের সময় হকিতে অবশ্যই অনেক মারামারি হয়। কিন্তু আমি কখনো তাতে অংশ নিইনি। বরং ঠেকানোর চেষ্টা করি সব সময়। সে কারণেই প্রতিপক্ষের কাছ থেকে একটা আলাদা সম্মান পাই। আমাদের সময়ের মেরিনার্স ভয়ংকর দল। মাঠে প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়া, মারামারি করা ওদের কাছে ডালভাত। কিন্তু আমাকে ওরা কখনো গালি দেয়নি, মারামারিও করেনি। খেলা নিয়ে কোনো গ্যাঞ্জাম বেধে গেলে কী হয়, তা বললাম। খেলার ভেতরকার কথাও শুনুন। হকি মাঠে আমি কখনো লাল কার্ড পাইনি। হলুদ কার্ড কি পেয়েছি? দু-একবার আমাকে তা দেখানো হলেও হতে পারে; মনে নেই। আমি সব সময় আইনের মধ্যে থেকে পরিচ্ছন্ন হকি খেলতে চেয়েছি। আরেকটি ব্যাপার হলো, মারামারির কারণে ফুটবল ছেড়ে হকিতে আসি। তবে এই খেলায় আমি প্রায়ই শিনগার্ড ছাড়া নেমে যেতাম। বিশেষত কোচকে ফাঁকি দিয়ে অনুশীলন করতাম সেভাবে। আমার পায়ের হাড় এখনো তেড়াব্যাঁকা। স্টিকের বাড়ি খেতে খেতে এমন অবস্থা।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের শুরুর কথা বলছিলেন। ফুটবল থেকে হকিতে এলেন কিভাবে?

সাদেক : নবাববাড়ি এলাকায় আমার জন্ম। বাবা আবদুর রাজ্জাকের ব্যবসা কদমতলীতে। মা কাশ্মীরি বেগম গৃহিণী। চার ভাই, তিন বোনের মধ্যে আমি ষষ্ঠ। খুব ছোটবেলায়ই মা-বাবা দুজনই মারা যান। আমি বড় হই বোনের কাছে। আরমানিটোলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। তবে সেখানে যাই কম, ফাঁকি দিয়ে খেলাধুলা করি বেশি।

প্রশ্ন : আরমানিটোলা স্কুলের ছাত্র মানেই তো হকির সঙ্গে বন্ধুত্ব...

সাদেক : ওই স্কুল থেকে বাংলাদেশের কিংবদন্তি সব হকি খেলোয়াড় বেরোন। ওখানে খেলে খেলেই ঝালাই করেন নিজেদের। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা বলা যাবে না। কারণ স্কুলে খুব একটা তো যেতামই না। এমনকি আমি মেট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত দিইনি। আসলে আমার যা হকি খেলা, নবাববাড়িতে। ব্যাডমিন্টনের মারিয়ম আপা তো নবাববাড়ির মেয়ে। তাঁদের বাসার সামনে ‘চামন’ নামের জায়গায় ব্যাডমিন্টন খেলতাম; হকি খেলতাম। দুপুরে খাওয়ার পর বাসার সবার ঘুমানোর নিয়ম। আমি আস্তে আস্তে উঠে মাঠে চলে যেতাম খেলতে। পরে তো এমনও হয় যে বড় ভাই-বোন খাটের সঙ্গে আমাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখত, যেন ঘুম বাদ দিয়ে খেলতে যেতে না পারি। তবু নানা কায়দা করে ঠিক চলে যেতাম। এর মধ্যে লালবাগে ফুটবল খেলা শুরু। কিন্তু ওই যে বললাম, ফুটবলে গিয়ে খেলাটি ভালো লাগেনি। বাবু ভাই নামে পাড়ার এক বড় ভাই তখন হকি খেলেন ওয়ারীতে। তিনিই আমাকে বলেন, হকি খেললে ভালো করতে পারবে। একটু আগে জিজ্ঞেস করছিলেন না, একা একা অনুশীলন করার কথা। আমার ঘরের সামনে ছোট্ট একটু জায়গা ছিল। সেখানে রাত ১০টা থেকে শুরু করে ১২টা-১টা পর্যন্ত দেয়ালে স্টিক দিয়ে বল মেরে মেরে অনুশীলন করতাম। তাতে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হয়ে যায় দারুণ।

প্রশ্ন : বিভাগীয় পর্যায়ে হকি শুরু কোন ক্লাব দিয়ে?

সাদেক : দ্বিতীয় বিভাগের বাংলাদেশ স্পোর্টিং। ওখানে দুই বছর খেলার পর ১৯৮৭ সালে নাম লেখাই প্রথম বিভাগের দল ‘ব্যাচেলার্স’-এ। এটি মূলত আমাদের মহল্লার ছেলেদের নিয়ে গড়া দল। সেখানে খেলার প্রস্তাব পেয়ে তো ভীষণ খুশি।

প্রশ্ন : পারিশ্রমিক পেতেন কেমন?

সাদেক : পারিশ্রমিক আবার কী! মহল্লার বড় ভাইদের সঙ্গে খেলতে পারছি প্রথম বিভাগে, এই ঢের! টাকাপয়সা পাওয়ার কথা তখন ভাবিওনি। কর্মকর্তা গোছের বড় ভাইরা অনুশীলন কিংবা ম্যাচের দিন ২০-২৫ টাকা করে হাতখরচ দিতেন, ব্যস!

প্রশ্ন : প্রথম পারিশ্রমিক কোন ক্লাবে গিয়ে?

সাদেক : আবাহনীতে। ‘ব্যাচেলার্স’-এ একবছর খেলার পর প্রস্তাব আসে। চীনাম্যান নামে একজন ছিলেন, তিনি আমাকে নিয়ে যান সাদেক ভাইয়ের কাছে। মানে ‘বড় সাদেক ভাই’। ১৯৮৮ সালে যাই আবাহনীতে। টাকা পাই এক লাখের কাছাকাছি।

প্রশ্ন : বড় ক্লাবে খেলা, তার ওপর এমন পারিশ্রমিক—বাড়তি চাপ ছিল না?

সাদেক : হকি মাঠে আমি কখনো চাপ অনুভব করিনি। নিজের মতো খেলেছি, চেষ্টা করেছি সর্বোচ্চটা দিয়ে। আর আবাহনী কিন্তু সেবার খুব ভালো দল না। কাঞ্চন, তিশা, জুম্মন, পুশকিন, ফজল মাহমুদরা থাকলেও ঠিক শিরোপা জেতার মতো না। তবে সবাই মিলে চেষ্টা করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করাই। দুঃখের ব্যাপার হলো, এরপর আবাহনীতে আরো একবছর খেলি; মোহামেডান-অ্যাজাক্স-ঊষার মতো দুর্দান্ত দলেও অনেক বছর। কিন্তু ওই যে প্রথমবার আবাহনীতে লিগ চ্যাম্পিয়ন হই, এরপর আর কোনো দলে এই সাফল্য পাইনি। সব সময় সন্তুষ্ট থাকতে হয় রানার্সআপ, তৃতীয় হয়ে। একটু-আধটু ভুলের জন্য শিরোপা জিততে পারিনি।

প্রশ্ন : অন্য কোনো প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হননি?

সাদেক : জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ঢাকা জেলার হয়ে খেলি বরাবর। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হই বেশ কয়েকবার। ঘরোয়া হকিতে তখন আরো বেশ কিছু প্রতিযোগিতা হতো। সেখানেও শিরোপা জিতি। অফিস লিগে সাফল্য পাই সোনালী ব্যাংকে খেলে। কেবল লিগেই প্রথমবারের পর আর কখনো চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি।

প্রশ্ন : সর্বোচ্চ গোলদাতা? সেরা খেলোয়াড়?

সাদেক : অমন পুরস্কার অনেক আছে। কিন্তু অনেক আগের কথা তো। বছর কিংবা প্রতিযোগিতা ধরে এখন আর তা মনে নেই।

প্রশ্ন : সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পান কোন ক্লাবে, তা মনে আছে?

সাদেক : আবাহনীতে দুই বছর খেলার পর যাই অ্যাজাক্সে। সেখানে পাই দেড় লাখ টাকার মতো। দুই মৌসুম খেলে নাম লেখাই মোহামেডানে। ওখানে দুই লাখ। পরে ঊষায় গিয়ে আড়াই লাখ টাকা। এটিই আমার সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক।

প্রশ্ন : জাতীয় দলে খেলেন কত বছর?

সাদেক : ১৯৮৭ সালে জুনিয়র এশিয়া কাপে প্রথমবার। আর পূর্ণ জাতীয় দলে ১৯৮৯ এশিয়া কাপ থেকে। পরে ১৯৯৪ সালের এশিয়ান গেমস খেলি। তখন তো সাফ গেমসে হকি খেলা হতো না। ১৯৯৫ সালের মাদ্রাজ গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেবার খেলি বাংলাদেশ দলে। ১৯৯৮ সালে ওই যে বললাম আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হলো, তখন পর্যন্ত একটানা খেলে গেছি।

প্রশ্ন : আপনাদের সময়ে ঢাকার মাঠ মাতান শাহবাজ আহমেদ, তাহির জামান, কামার ইব্রাহিম, ধনরাজ পিল্লাইদের মতো খেলোয়াড়। তাঁদের মধ্যে সেরা কে?

সাদেক : শাহবাজ। ওর স্টিকের যে কারুকাজ, তা অন্য কারো মধ্যে আর কখনো দেখা যাবে না। আমার দেখা সেরা হকি খেলোয়াড় শাহবাজ। তাহির জামানও খুব ভালো। তবে কামার ইব্রাহিম ঠিক ওদের মানের না। পরে শুনেছি, ক্লাবে মুখোমুখি হলে ওরা নাকি সতীর্থদের বলে দিত, ‘সাদেককে ঠেকাও, তাহলে ম্যাচ জিততে সমস্যা হবে না।’

প্রশ্ন : বিদেশিদের কথা বললেন। বাংলাদেশের সতীর্থদের মধ্যে সেরা কে?

সাদেক : শাহবাজের মতো একজনের কথা এ ক্ষেত্রে বলতে পারব না। হারুন, মামুন, কামাল, পিরু, তিসা, লুলু সবাই দুর্দান্ত খেলোয়াড়।

প্রশ্ন : সেরা কোচ?

সাদেক : আমাদের সময়ে বিদেশি কোচ তো ছিল না। দেশিদের মধ্যে এহতেশাম ভাই, প্রতাপদা, সোনা ভাইদের পেয়েছি। তাঁদের মধ্যে আমার কাছে সেরা এহতেশাম ভাই। তবে তাঁর একটা দুর্ভাগ্য আছে। ভাগ্যটা কখনো পক্ষে থাকত না। সে কারণে অনেক সাফল্যের কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত তা পাননি। তবু আমার কাছে এহতেশাম ভাইই সেরা কোচ।

প্রশ্ন : সেরা ম্যাচ? কিছুক্ষণ আগে হকি মাঠে একজন আপনাকে পটুয়াখালীর এক ম্যাচের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন?

সাদেক : হ্যাঁ, সেই খেলা খুব স্মরণীয়। বিশেষত গোলটির জন্য। জাতীয় যুব চ্যাম্পিয়নশিপে ঢাকা বোর্ডের হয়ে খেলছিলাম পটুয়াখালীতে। প্রতিপক্ষ বিকেএসপি। ওদের দুর্দান্ত দল—মামুন, খুরশিদ, আলমগীর, তুষারের মতো সব খেলোয়াড়। এই বিকেএসপির বিপক্ষে একটি গোল করি নিজেদের বক্সের ভেতর থেকে গিয়ে। স্টিকে বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, একের পর এক খেলোয়াড় আসছে—এমন ছয়-সাতজনকে কাটিয়ে করি গোল। পটুয়াখালীর মাঠে আমার নাম হয়ে যায় ‘ম্যারাডোনা’। মাত্র কিছু দিন আগে ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। সেখানে আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনার দুর্দান্ত গোলের সঙ্গে মিলিয়ে আমার সেই নাম।

প্রশ্ন : আর কোনো ম্যাচ? ক্লাব কিংবা জাতীয় দলে?

সাদেক : ক্লাবে তো অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ আছে। সেগুলোর কথা আর নাই-বা বলি। জাতীয় দলের এক খেলার কথা বরং বেশি মনে পড়ছে। ১৯৯৫ মাদ্রাজ সাফ গেমসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি। খেলার আগে শাহবাজ, তাহির ভাইদের বলছিলাম, ‘আমাদের বেশি গোল দিয়েন না।’ তাঁরা উল্টো তাচ্ছিল্যভরে জবাব দেন, ‘তোমরা তাহলে সাত গোল খেয়েছো ধরে নিয়ে খেলা শুরু করো।’ এসে তা সবাইকে বলি। খুব উজ্জীবিত হয়ে মাঠে নামি আমরা। খেলাটিতে ২-৩ গোলে হারি, তবে তা হারার কথা না। আমি একটি ফিল্ড গোল দিই। অন্য গোলটি মুসার। তবে তাতেও আমাকে ফাউল করায় বাংলাদেশ পেনাল্টি স্ট্রোক পায়; সেখান থেকে মুসার গোল। আরো একটি পেনাল্টি স্ট্রোক নিশ্চিতভাবে আমাদের পাওয়ার কথা। কিন্তু রেফারি পেনাল্টি কর্নার দিয়ে দেয়। ম্যাচ হেরে গেলেও পাকিস্তানের মতো হকির পরাশক্তির বিপক্ষে অমন খেলায় তা আমার জীবনের স্মরণীয় ম্যাচ।

প্রশ্ন : রাগ কিংবা অভিমান করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান ১৯৯৯ সালে। হকিস্টিক তুলে রাখা তখনই?

সাদেক : না না। বিদেশে গিয়েও হকি খেলি সাত বছর। তবে তা তো আর পেশা না। সারা সপ্তাহ কাজ করে ছুটির দিনে খেলা হয়। আমি খেলি নিউ ইয়র্কের ‘রয়’ ক্লাবে। এটি ওই রাজ্যের হকি দল। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে যেমন হকি খেললে ক্লাব পয়সা দেয়, ওখানে আমাদের পয়সা দিয়ে চাঁদা তুলে খেলতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে খেলার সময়ের একটি ঘটনা বলি। রিজওয়ান নামে পাকিস্তানি এক খেলোয়াড় ছিল দলে। ও শুরুতে আমাকে তাচ্ছিল্য করে বলত, ‘তোমাদের বাংলাদেশে আবার  হকি খেলা হয় নাকি?’ পরে আমি এমন ভালো খেলি যে ওকে বসিয়ে আমাকে মূল দলে খেলানো হয় নিয়মিত। যুক্তরাষ্ট্রে চার বছর থাকার পর নাইন-ইলেভেনপরবর্তী সময়ে কানাডা চলে যাই। সেখানেও ‘ব্রাম্পটন’ ক্লাবে হকি খেলি তিন বছর। শৌখিন খেলা।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় জীবন ধারণের জন্য কী ধরনের কাজ করতেন?

সাদেক : নিউ ইয়র্কে আমার ভায়রার রেস্টুরেস্ট ছিল। ওর সঙ্গে মিলে কাজ করি। কানাডায় যাওয়ার পর তিন বন্ধু মিলে রেস্টুরেন্ট খুলি। কিন্তু বছরদেড়েক আগে বন্ধ করে দিই তা। কারণ আমাদের রেস্টুরেন্টে অ্যালকোহল বিক্রি করতাম না, আবার সেটি ছাড়া ওখানে এই ব্যবসা চালানো অসম্ভব। এখন তা বন্ধ করে দিলেও ওই লাইনে রয়েছি। এক রেস্টুরেন্টেই চাকরি করছি আবার।

প্রশ্ন : শেষদিকে একটু পরিবারের কথা জানতে চাই। বিয়ে করেন কবে?

সাদেক : ১৯৯৪ সালে। স্ত্রীর নাম রাফিকা সাদেক। আমাদের তিন সন্তান। বড় ছেলে মো. রাফির জন্ম বাংলাদেশে। ও এখন কানাডার এক আইটি ফার্মে চাকরি করছে। মেয়ে আয়েশার জন্ম আমেরিকায়। ওর বয়স ১৬ বছর, পড়াশোনা করছে। ছোট মেয়ে আরিজের জন্ম কানাডায়। ওর বয়স ১০ বছর, সে-ও পড়ালেখা করছে।

প্রশ্ন : সন্তানরা কি জানে, তাঁদের বাবা বাংলাদেশের বিখ্যাত হকি খেলোয়াড়?

সাদেক : জানে। কিন্তু এসব নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। বিদেশে বেড়ে উঠেছে তো, ওদের চিন্তাধারা অন্য রকম। ছেলে রাফি আমেরিকান ফুটবল খেলত; পরে আইস হকি। কিন্তু আইস হকি খেলতে গিয়ে ২০১০ সালে ওর হাত ভেঙে যায়। এরপর আর খেলাধুলায় নেই।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ থেকে দূর আছেন সত্যি। কিন্তু এখানকার হকির খোঁজখবর রাখেন নিশ্চয়ই। তা কতটা হতাশ করে?

সাদেক : হতাশার অনেক জায়গা তো রয়েছেই। আমাদের ছেলেরা কিন্তু খুব প্রতিভাবান। তা প্রকাশ করার জায়গাটা শুধু লাগবে। বাংলাদেশে যেমন হকির একটিই টার্ফ। অথচ আমেরিকা-কানাডায় এমন টার্ফ অসংখ্য। এ ছাড়া এখানে এখনো হকি স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইট বসেনি। এটিও খুব দুঃখজনক। মাঝে ক্লাব কর্মকর্তাদের কি সব ঝামেলায় কয়েক বছর হকি লিগ হয়নি। ইন্টারনেটে এসব খবর পেলে মন খারাপ হয়। আমাদের ছেলেদের যদি সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ওরা হকিতে দারুণ কিছু করে দেখাতে পারে। এবারও তো ঢাকায় এসে দেখলাম, দারুণ প্রতিভাবান সব ছেলে রয়েছে হকিতে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। সব মিলিয়ে জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

সাদেক : জীবনটা খারাপ কাটেনি। বিদেশে থাকায় কষ্ট আছে অনেক। তবে ছেলে-মেয়েগুলো মানুষ হচ্ছে বলে আনন্দও আছে। হকির সাদেক হিসেবে ওখানে সাধারণ মানুষ খুব একটা চেনেন না। দেশে এলে দেখুন, কত মানুষ চিনছে। এটি খুব বড় তৃপ্তির জায়গা। যে হকিই খেলেছি, খেলা ছাড়ার এই ১৬-১৭ বছর পরও লোকে আমাকে চেনেন। আমাকে মনে রেখেছেন। আরেকটি ব্যাপারেও আমার তৃপ্তি আছে। হকিতে কারো সঙ্গে আমার কখনো ঝগড়া লাগেনি; কারো সঙ্গে বেয়াদবি করিনি। এতেও আমার অনেক আনন্দ।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা