kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

এমন বিদায়

মাজহারুল ইসলাম

২৭ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এমন বিদায়

একজন র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষে, আরেকজন দ্বিতীয় স্থানে। গত বছরের চারটি গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাঁদের নাম। প্রথমজন বছরের প্রথম দুটি গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে হেরে গেলেও তৃতীয়টিতে ঠিকই উড়িয়েছেন বিজয় কেতন। আর দ্বিতীয়জন তো প্রথম দুটিতেই করেছেন শিরোপা উৎসব। পৌঁছে ছিলেন বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্লামেরও ফাইনালে। সেই অ্যান্ডি মারে ও নোভাক জোকোভিচকে ছাড়াই হবে নতুন বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনাল। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে এবার কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই যে বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে টেনিসের বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ের এক ও দুই নম্বর খেলোয়াড়ের!

রূপকথার সময় কাটছিল নোভাক জোকোভিচের। সর্বশেষ ২৪টি গ্র্যান্ড স্লামের ১১টিতেই শিরোপা জিতেছেন সার্বিয়ান তারকা। ২০১৫ সালে বছরের চারটি মেজরের তিনটিতেই তিনি উঁচিয়ে ধরেছিলেন ট্রফি। শেষদিকে হতাশায় আচ্ছন্ন হওয়ার আগে গত বছরটাও কেটেছে রূপকথার মতো। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে টানা ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের পর অতৃপ্তি ঘুচান ফ্রেঞ্চ ওপেনেরও। রোলাঁ গাঁরোর লাল দুর্গ জয় করে টেনিস ইতিহাসের মাত্র অষ্টম খেলোয়াড় হিসেবে পূরণ করেন স্বপ্নের ক্যারিয়ার স্লাম। হান্ড্রেড মিলিয়ন প্রাইজমানির জাদুকরী সংখ্যা ছোঁয়া প্রথম খেলোয়াড়ও কিন্তু এই সার্বিয়ান। যে কীর্তিটা তিনি গড়েছেন গত পঞ্জিকাবর্ষেই!

সেই পালে হঠাৎ করেই যেন উল্টা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। উইম্বলডনে বিদায় নেন তৃতীয় রাউন্ডে; এরপর স্তানিসলাস ওয়ারিঙ্কার কাছে হেরে যান গত বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালটা। আর রিও অলিম্পিকে আর্জেন্টাইন হুয়ান মার্তিন দেল পোত্রোর বিপক্ষে প্রথম রাউন্ডে হেরে বিদায় নেন চোখের জলে। উল্টা এ যাত্রায় বছর শেষের টুর্নামেন্ট এটিপি ট্যুর ফাইনালসের ফাইনালে হেরে গেলে শীর্ষে থেকে নতুন বছর শুরুর সম্ভাবনারও ঘটে  করুণ মৃত্য! সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়ে নিজের সোনালি সময় যেন পেছনে ফেলে আসারই ইঙ্গিত দিলেন  জোকোভিচও।

২০১৭ সালের শুরুটা হয়েছিল অবশ্য আশা জাগানিয়া। বছরে নিজের প্রথম টুর্নামেন্টেই করেছেন শিরোপা উদযাপন। দোহার ফাইনালে আবার হারিয়েছিলেন যাঁর কাছে গতবছর র্যাংকিংয়ের সাম্রাজ্য হারিয়েছিলেন, সেই অ্যান্ডি মারেকে। মেলবোর্ন পার্কের প্রিয় কোর্টে সোনালি সেই সাফল্য একদম অনুবাদ করতে পারেননি সাবেক এই নাম্বার ওয়ান। বরং ডুবেছেন ক্যারিয়ারে প্রথমবার র্যাংকিংয়ের ১০০-র ওপরে থাকা কোনো প্রতিযোগীর বিপক্ষে হারের লজ্জায়। ডুবেছেন ২০০৭ সালের পর প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বিদায়ের হতাশায়।

সপ্তম শিরোপা জয়ের ইতিহাস গড়ার মিশনে এসে দ্বিতীয় রাউন্ডেই কি না বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে ‘জোকারে’র। হেরে যান র্যাংকিংয়ে ১১৭তম স্থানে থাকা উজবেকিস্তানের অখ্যাত এক খেলোয়াড় ডেনিস ইস্টোমিনের কাছে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে যাঁর সেরা সাফল্য চমক দেখিয়ে এ বছরই চতুর্থ রাউন্ডে জায়গা করে নেওয়া। সেই ইস্টোমিনের কাছে হেরে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন বিলীন হওয়ার পাশাপাশি সহসা  র্যাংকিংয়ের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটে সার্বিয়ান তারকার।

জোকোভিচের বিদায়ে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ে বাজির দরে বাজিকরদের আরো ফেভারিট হয়ে উঠেছিলেন হয়তো ‘নাম্বার ওয়ান’ স্যার অ্যান্ডি মারে। সেই তিনিও তড়িঘড়ি ধরেছেন বাড়ি ফেরার বিমান। যাঁর গত বছরের শেষ ভাগটা কেটেছে রীতিমতো সাফল্যের ভেলায় ভেসে। বছরের প্রথম দুটি গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠে খালি হাতে ফিরতে হলেও সবুজের গালিচা উইম্বলডনে জেতেন ক্যারিয়ারে তৃতীয় গ্র্যান্ড স্লাম। এরপর ইউএস ওপেনে আবার ব্যর্থ তিনি। অলিম্পিকে যদিও গড়েছেন নতুন ইতিহাস। ব্রাজিলের আসরে গড়েন প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে পুরুষদের টেনিসে দুটি সোনা জয়ের কীর্তি। এরপর এটিপি ট্যুর ফাইনালস জিতে বছরটা শেষ করেন জোকোভিচকে হটিয়ে র্যাংকিংয়ের সিংহাসনে বসে।

টেনিসের দুর্দান্ত সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন স্যার উপাধিও। কিন্তু স্যার হওয়ার পর প্রথম আসরেই হতাশ করলেন মারে। বরাবরের মতো আরো একবার মুখথুবড়ে পড়লেন মেলবোর্ন পার্কে। এর আগে পাঁচ-পাঁচবার ফাইনালে ওঠে একবারও পারেননি তিনি শিরোপা উৎসব করতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে। প্রতিবার তাঁকে হতাশায় ডুবিয়েছেন জোকোভিচ। সেই জোকোভিচ এবার দ্বিতীয় রাউন্ডেই ফিরে যান বাড়িতে। তবুও অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের হাহাকার ঘুচাতে পারলেন না মারে! স্কটিশ তারকা নিজেও যে শিকার হয়েছেন বড় অঘটনের!

মারে অবশ্য এগিয়ে গিয়েছিলেন আরো দুটি ধাপ। ব্রিটিশ তারকার বিদায়ঘণ্টা বেজেছে চতুর্থ রাউন্ড থেকে। ২০০৯ সালের পর বছরের প্রথম মেজরে যা তাঁর সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স। আকাশে উড়তে থাকা মারেকে ধপাস করে মাটিতে নামিয়ে এনেছেন র্যাংকিংয়ে ৫০-এ থাকা অখ্যাত এক জার্মান খেলোয়াড়—মিশা ভিজারেভ। গ্র্যান্ড স্লামে যিনি এর আগে দ্বিতীয় রাউন্ডের গণ্ডিই পেরোতে পারেননি কখনো। রূপকথার নতুন গল্প লিখে এবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেন ভিজারেভ। স্বপ্নের যে পথচলায় তিনি হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করেছেন মারেকে। শেষ আটেই অবশ্য তাঁর স্বপ্নের দৌড় থামিয়ে দিয়েছেন ১৭ বারের গ্র্যান্ড স্লাম জয়ী রজার ফেদেরার।  

জোকোভিচ-মারের অমন বিদায়ে তবু প্রশ্নটা আবার নতুন করে উঠছে টেনিস বিশ্বে। ‘বিগ ফোরে’র সাম্রাজ্যের কি তাহলে আক্ষরিক অর্থে সূর্য অস্তমিত হতে যাচ্ছে? রাফায়েল নাদাল ও রজার ফেদেরার অবশ্য এ রিপোর্ট লেখার সময়ও স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের। তবে সাম্প্রতিক অতীতটা কিন্তু কথা বলছে না তাদের হয়ে একদমই। ‘ফেডএক্স’ সর্বশেষ গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন সেই ২০১২ সালের উইম্বলডনে। সেরা ছন্দে নেই নাদালও। গত দুই বছরে গ্র্যান্ড স্লাম জিততে পারেননি এই স্প্যানিয়ার্ডও। সর্বশেষ জেতেন ২০১৪ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেনে। এরপর থেকে ইনজুরি আর ফর্মহীনতার সঙ্গে বসবাস তাঁর।

১২ বারের গ্র্যান্ড স্লাম জয়ী জোকোভিচও যেন হঠাৎ করেই হয়ে পড়েছেন নিজের ছায়া। নতুনদের পাওয়ার টেনিসের জবাব দেওয়ার ভাষাটা যেন হারিয়ে ফেলেছেন এই সার্বিয়ানও। নইলে কোথাকার এক ইস্টোমিন তাঁর বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেয় রড লেভার অ্যারেনার প্রিয় কোর্টে! এ নিয়ে তিনি টানা তিন গ্র্যান্ড স্লামে ফিরলেন একরাশ হতাশা সঙ্গী করে। ‘বিগ ফোরে’র আরেক তারকা মারে তো আবার কখনই দুর্দান্ত ধারাবাহিক ছিলেন না। বিশেষ করে ফাইনালে উঠে শিরোপা জিততে না পারার আফসোসে তাঁকে পুড়তে হয়েছে বারবার। এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেই তো পুড়েছেন পাঁচ-পাঁচবার। সেই আক্ষেপ কিন্তু পারলেন না তিনি এবারও মুছতে। ‘বিগ ফোরে’র শেষটাই তাই দেখতে পাচ্ছেন টেনিস বোদ্ধারা! প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একদিন অবশ্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয় সবাইকে। এ নিয়মের বাইরে নন তো ফেদেরার-নাদাল-জোকোভিচ-মারেও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা