kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

রিয়ালের ৪০

রাহেনুর ইসলাম   

২০ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রিয়ালের ৪০

প্রতিপক্ষ এক। সময়টাও একই, ৯৩ মিনিট। রেফারি তাকাচ্ছিলেন ঘড়ির দিকে। বাঁশি বাজাবেন কিছুক্ষণের মধ্যে। বাজালেনও, তবে খেলা শেষের নয় গোলের! দুটি আলাদা টুর্নামেন্টে ৯৩ মিনিটে গোল করে দুবার সেভিয়ার সঙ্গে হার এড়িয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। প্রথমটা গত বছরের ১৬ আগস্ট উয়েফা সুপার কাপে। শেষটা গত ১২ জানুয়ারি কোপা দেল রের শেষ ১৬-র দ্বিতীয় রাউন্ডে। ৩-৩ গোলে ড্রর পর রিয়াল পৌঁছে গেছে নতুন উচ্চতায়। নিজেদের অপরাজেয় অহংটা টেনে নিয়েছে ৪০ ম্যাচে। রাফায়েল বেনিতেজের ছোঁয়ায় ধূসর প্রাণহীন হয়ে পড়া রিয়াল ফের নক্ষত্রপুঞ্জের মতোই ঝলমলিয়ে উঠেছে জিনেদিন জিদানের হাতে। থামতে হয়েছে অবশ্য সেভিয়ার মাঠেই। উয়েফা সুপার কাপ আর কোপ দেল রেতে উের গেলেও লা লিগায় গত ১৫ জানুয়ারি সেভিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরেছে জিদানের দল। ফুটবল ইতিহাসে টানা ৪০ ম্যাচ অপরাজিত থাকাই সর্বোচ্চ নয়। ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ মৌসুমে সেল্টিক অপরাজিত ছিল টানা ৬২ ম্যাচ। টানা সবচেয়ে বেশি ম্যাচ না হারার রেকর্ড এটাই।

জিদানের কোচ হিসেবে বর্ষপূর্তির দিনটা তাঁর শিষ্যরা উদ্যাপন করে সেভিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে। তাতে কোপা দেল রের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত ছিল একরকম। জিদান তাই দ্বিতীয় লেগে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোসহ বিশ্রাম দেন প্রথম একাদশের অনেককে। দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে খেলতে নেমে হারতেই বসেছিল রিয়াল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার ৮ মিনিট আগেও রিয়াল পিছিয়ে ৩-১ ব্যবধানে। ৮৩তম মিনিটে সের্হিয়ো রামোসের পেনাল্টি গোলের পর ইনজুরির সময়ের শেষ মুহূর্তে ৯৩তম মিনিটে করিম বেনজিমার লক্ষ্যভেদ। তাতে ম্যাচটি শুধু ৩-৩ সমতায় শেষ হয়নি ‘লস ব্লাঙ্কো’দের পৌঁছে দিয়েছে নতুন উচ্চতায়। নিজেদের অপরাজেয় অহংটা টেনে নিয়েছে ৪০ ম্যাচে। স্প্যানিশ ক্লাবগুলোর মধ্যে গত মৌসুমের বার্সেলোনা সর্বোচ্চ ৩৯ ম্যাচে না হারার রেকর্ড গড়েছিল। আগের ম্যাচে গ্রেনাদাকে হারিয়ে সে সিংহাসনে ভাগ বসায় রিয়াল, সেভিয়ার সঙ্গে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে হার এড়িয়ে রেকর্ডটি করে নেয় শুধুই নিজেদের।

২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে সবশেষ ভলসবুর্গের কাছে হেরেছিল রিয়াল। এরপর হারেনি টানা ৪০ ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগ, উয়েফা সুপার কাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ, কোপা দেল রে, স্প্যানিশ লা লিগা—ভিন্ন পাঁচটি প্রতিযোগিতার ৪০ ম্যাচের মধ্যে জয় ৩১টিতে, ড্র বাকি ৯ ম্যাচে। এই সময়ে রিয়ালের ২২ খেলোয়াড় মিলে করেছেন ১১৫ গোল, বিপরীতে তাদের জালে বল জড়িয়েছে মাত্র ৩৯ বার। সবচেয়ে বেশি ২৬ গোল অনুমিতভাবেই রোনালদোর। ‘বিবিসি’ত্রয়ীর অন্য দুজন বেনজিমা ১৪ আর গ্যারেথ বেলের গোল ১১টি । হার এড়াতে ঘাম ঝরাতে হয়েছে বেশ কটি ম্যাচে। ৪০ ম্যাচের ১২তমটি উয়েফা সুপার কাপ আর সবশেষটি কোপা দেল রের শেষ ষোলোর দ্বিতীয় লেগের কথা বলা হয়েছে আগেই। এই যাত্রার ১৬তম ম্যাচটি ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে পর্তুগালের স্পোর্তিং লিসবনের বিপক্ষে। এই ক্লাবের জল-হাওয়াতেই বেড়ে ওঠা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর। শৈশবের ক্লাবের বিপক্ষে খেলা আবেগী রোনালদোর জাদুতেই ১৪ সেপ্টেম্বর রক্ষা পেয়েছিল রিয়াল। ৮৮ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর জিদানের দল সমতা ফেরায় ৮৯ মিনিটে রোনালদোর ফ্রি কিকে। ৯৪ মিনিটে আলভারো মোরাতোর লক্ষ্যভেদে ২-১ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে তারা। ৩৪তম ম্যাচে লা লিগায় হারের কিনারাতেই ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সার মাঠে। ৮৯ মিনিট পর্যন্ত রিয়াল পিছিয়ে ১-০ গোলে। সেই ম্যাচটা ১-১ সমতায় শেষ হয় সের্হিয়ো রামোসের শেষবেলার হেডারে। ম্যাচ শেষে রামোস জানিয়েছিলেন, ‘রিয়ালের ডিএনএতেই আছে লড়াই করে যাওয়ার বীজ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের আশা ছাড়ি না আমরা।’ এভাবে লড়াই করেই ইতিহাসের পাতাটা নতুন করে লিখিয়েছে জিদানের দল। এর আগে রিয়ালের টানা অপরাজিত থাকার রেকর্ড ছিল ৩৪ ম্যাচ। ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে লিও বেনহ্যাকারের দল জিতেছিল ২৫ ম্যাচ আর ড্র করে বাকি ৯ ম্যাচে। এমন কীর্তিতে নিশ্চিত করে সেই মৌসুমের লা লিগা। ৩৪তম ম্যাচে ইউরোপিয়ান কাপ সেমিফাইনালের প্রথম লেগে (চ্যাম্পিয়নস লিগ) ১-১ গোলে ড্র করেছিল এসি মিলানের সঙ্গে। ৩৫তম ম্যাচে সেল্তা ভিগোর কাছে হেরে যায় ২-০ গোলে। তাতে আত্মবিশ্বাসে এতটাই ধাক্কা লেগেছিল যে ইউরোপিয়ান কাপ সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে মিলানের কাছে হেরে বসে ৫-০ গোলে!

স্প্যানিশ দলগুলোর মধ্যে এর আগে সর্বোচ্চ ৩৯ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ছিল বার্সেলোনার। ২০১৫ সালের অক্টোবরে সেভিয়ার কাছে ১-২ গোলে হেরেছিল বার্সা। এরপর লুইস এনরিকের দল ছয় মাস অপরাজিত ছিল ৩৯ ম্যাচে। জিতেছিল ৩২ আর ড্র ৭ ম্যাচ। ৩৯ ম্যাচে গোল ছিল ১২২টি। তাতে তারা লা লিগার শীর্ষে ছিল দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলের চেয়ে ৬ পয়েন্টে এগিয়ে। পৌঁছে চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনাল আর কোপ দেল রের ফাইনালে। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ঝলকে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল ১-২ গোলে হেরে অপরাজিত থাকার গাড়িটা থামে বার্সার।

রিয়াল মাদ্রিদের মতো ৪০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ছিল ইংল্যান্ডের নটিংহাম ফরেস্টেরও। ১৯৭৮ সালের মে থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপরাজিত ছিল ৪০ ম্যাচ। সেবার লিভারপুলকে হারিয়ে তারা জেতে লিগ কাপ। প্রথমবার স্বাদ পায় ইংলিশ লিগ শিরোপারও। ৯ ডিসেম্বর অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের কাছে শেষ পর্যন্ত হারে ২-০ গোলে। হাতছাড়া হয় সেই মৌসুমের লিগ শিরোপা। তবে ইতিহাস গড়ে নটিংহাম ফরেস্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইউরোপিয়ান কাপে। ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে এসি মিলান ৪২ ম্যাচ আর ২০১১-১২ মৌসুমে জুভেন্টাস অপরাজিত ছিল টানা ৪৩ ম্যাচ। সব মিলিয়ে ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত টানা সবচেয়ে বেশি ৬২ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড স্কটিশ জায়ান্ট সেল্টিকের। উইলি মেলাইয়ের দল সব ম্যাচই খেলেছিল লিগে। সে সময় এখনকার মতো গোছানো ছিল না সব কিছু। তাই সেল্টিককে একই দিনে খেলতে হয়েছে দুটি ম্যাচও! ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড বেলজিয়ামের দল ইউনিয়ন এসজির। রিয়াল এত দূর যেতে পারেনি। থেমেছে ৪০ ম্যাচেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা