kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

দেশ যদি আমার জন্য কষ্ট না পায় আমি পাব কেন?

১৩ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ২২ মিনিটে



দেশ যদি আমার জন্য কষ্ট না পায় আমি পাব কেন?

ছবি : মীর ফরিদ

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ইতিহাস যে কারো কারো পকেটবন্দি হয়ে গেছে এ নিয়ে সন্দেহ নেই কোনো। অন্ধকার সময়ের ধুলো ঝেড়ে সেই হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলো আলোতে আসছে এখন, আর তাই জানা যাচ্ছে এই দলটির মূল প্রতিষ্ঠাতার নাম সাইদুর রহমান প্যাটেল। আরো জানা যাচ্ছে, জাকারিয়া পিন্টুর বাইরে আরো একজন অধিনায়ক ছিলেন দলটির, তিনটি ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া এই ফুটবলারটির নাম শেখ মোহাম্মদ আইনুল হক। সেটা অনেকে লুকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু ষাট-সত্তুর দশকের লাখো মানুষের মন থেকে তো আর তাঁকে মুছে ফেলা যাবে না। কিংবদন্তি এই ডিফেন্ডার অবশ্য জীবনের ম্যাচটা খুব ভালো খেলতে পারেননি। খেলা ছাড়ার পর ভুগেছেন অর্থকষ্টে, এখন আবার চেপে ধরেছে ক্যান্সার। সেই লড়িয়ের সঙ্গে যখন বসলেন নোমান মোহাম্মদ তখন ফুটবল-জীবন-অর্জন-বঞ্চনা-বেদনা সব যেন মিলে গেল এক মোহনায়
 

প্রশ্ন : ঢাকার মাঠের অনেক দাপুটে স্ট্রাইকার ভয় পেতেন ডাকাবুকো ডিফেন্ডার আইনুলকে। সমর্থকরা ভালোবেসে আপনার আদুরে নাম দেয় ‘ডিআইটি’। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কয়েকটি ম্যাচে অধিনায়কও ছিলেন। এমন অনেক কিছু দিয়ে সাক্ষাত্কারের প্রথম প্রশ্নটি হতে পারত। কিন্তু আপনাকে দেখার পর অন্য সব কিছু গৌণ হয়ে গেছে। প্রথমে শুধুই জানতে ইচ্ছা করছে আপনি কেমন আছেন?

শেখ মোহাম্মদ আইনুল হক : (অনেকক্ষণ চুপ থেকে, চোখ ভরা জল নিয়ে) কেমন আছি, তা মনে হয় কিছু কিছু জানেন। আমার তো ফুসফুসের ক্যান্সার।

প্রশ্ন : জানি। কত দিন আগে, কিভাবে ধরা পড়ে এই রোগ?

আইনুল : এই এক-দেড় বছর আগে। মেঘনা ঘাটে চাকরি করি তখন। রাতে শোয়ার পর শুধু কাশি আসে। কাশির চোটে ঘুমাতে পারি না, এমন অবস্থা। ছুটি নিয়ে ঢাকা আসি। শিকদার মেডিক্যালে যাওয়ার পর নানা পরীক্ষা করা হয়। এরপর মডার্ন, পপুলার, আনোয়ারা, ইবনে সিনা এমন নানা জায়গায় আরো অনেক পরীক্ষা। পরে ডাক্তার রকিবুদ্দিন সব রিপোর্ট দেখে বলেন, ‘আপনার তো ফুসফুসের ক্যান্সার।’ বুঝতেই পারছেন, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ডাক্তার বললেন, কেমো দেওয়া লাগবে। প্রতি কেমোতে ৪০-৪৫ হাজার টাকা করে খরচ। আমার অসুস্থতার খবর শুনে সালাউদ্দিন, অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, তান্না ভাইরা কিছু আর্থিক সাহায্য করেন। তা দিয়ে শুরু হয় কেমো।

প্রশ্ন : কতটি কেমো দিয়েছেন এখন পর্যন্ত?

আইনুল : ১২টি। খুব কষ্ট করে, এর-ওর কাছ থেকে চেয়েচিন্তে চিকিৎসার টাকা জোগাতে হয়েছে। আর কেমো দেওয়া লাগবে না। তবে ডাক্তার প্রতি দিন একটি ক্যাপসুল খেতে দিয়েছেন, যার দাম সাড়ে ৫০০ টাকা। এই ক্যান্সার ধরা পড়ার পর চাকরিটাও ছেড়ে দিতে হয়েছে।

প্রশ্ন : কী চাকরি করতেন?

আইনুল : বসুন্ধরা গ্রুপে সিকিউরিটি অফিসারের। আমার অধীনে কিছু সিকিউরিটি গার্ড থাকত। তারা কিভাবে কাজ করবে, কাজ ঠিকভাবে করছে কি না—এসব দেখভাল করতাম। ছোটখাটো চাকরি। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর সাদেক ভাইকে বললাম। তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান সাহেবের বড় ভাই। সাদেক ভাই বললেন, ‘অনেক বছর তো চাকরি করলেন। এখন যখন অসুস্থ, কী আর করা! বিশ্রাম নেন।’ চাকরি ছাড়ার পর সার্ভিস বেনিফিটের কিছু টাকা পেয়েছি। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেব নিজ থেকে দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। আমি খুশি। আসলে এই সিকিউরিটির চাকরিটা পেয়েছিলাম বলে বেঁচে গেছি। নইলে আরো অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হতো।

প্রশ্ন : ঢাকার মাঠের এককালের দাপুটে ফুটবলার আইনুল ফুটবল ছাড়ার পর এমন চাকরি করেছেন!

আইনুল : আরো অনেক কিছু করেছি। খেলা ছাড়ার পর বন্ধুবান্ধব মিলে বিদেশে পাঠিয়ে দিল। পয়সাকড়ি লাগেনি, বিমানভাড়া দিয়ে চলে গেছি। ইরাকে ছিলাম একবছর। এরপর লিবিয়ায় দুই বছর। ওখানে কাজের ঠিক-ঠিকানা নেই। শ্রমিকের কাজ করেছি। যখন যা পেতাম। তবে টাকা কামিয়ে রাখতে পারিনি, খরচ হয়ে যেত। এরপর দেশে ফিরে ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে সাদেক ভাইকে খুঁজে বের করি। তাঁর অফিস ধানমণ্ডি ঈদগাহ মসজিদের কাছে। আমাকে অনেক ইজ্জত করলেন। তাঁকে বললাম, ‘সমস্যায় পড়ে গেছি। চাকরি নেই, বেকার। কিছু একটা যদি করে দেন।’ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই বসুন্ধরার মালিক আহমেদ আকবর সোবহান সাহেবকে ফোন করলেন সাদেক ভাই, ‘মোহামেডানের ফুটবলার আইনুল আমার কাছে এসেছে। কী করা যায়?’ তিনি ফোনে বললেন, ‘মেঘনা ঘাটে বসুন্ধরার পেপার মিলে পাঠিয়ে দিন।’ ওখানে আমার চাকরি হয়ে যায় ফায়ার অফিসার হিসেবে। আমি খুব ধন্যবাদ দিই এই দুই ভাইকে। ওই চাকরি না পেলে কী যে হতো!

প্রশ্ন : এরপর একটানা চাকরি করেছেন বসুন্ধরা গ্রুপে?

আইনুল : না, মাঝে চট্টগ্রামে কোকো-কোলো কম্পানিতে, মোনেম খানের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি সিকিউরিটি বিভাগে। পরে আবার বসুন্ধরায় ঢুকি ১৯৯৬ সালে সম্ভবত। প্রায় ২০ বছর চাকরি করেছি। মংলায় সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে অনেক দিন ছিলাম। পরে চলে আসি মেঘনাঘাটের পেপার মিলে।

প্রশ্ন : বেতন পেতেন কত?

আইনুল : শেষে ২৫ হাজার টাকা।

প্রশ্ন : শুরুতে?

আইনুল : ২৪০০ টাকা বেতন, ৪০০ টাকা খাওয়া। মোট ২৮০০।

প্রশ্ন : ওখানে আপনাকে কেউ চিনতেন না? মানে ফুটবলার আইনুল হিসেবে?

আইনুল : মেঘনা সিমেন্ট কারখানায় ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর নানা খেলাধুলা হতো। সেখানে ফুটবল খেললাম একবার, আমাদের দল চ্যাম্পিয়ন। পরের বছর আর খেলিনি। ভালো লাগে না। তখন বসুন্ধরার মাইনুল স্যার মাইকে বলেছেন, ‘আমাদের ভেতর এমন একজন খেলোয়াড় আছেন, যাকে কেউ চেনেন না। কিন্তু তাঁর খেলা আমি ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে দেখেছি। ওই আইনুল এখন আমাদের এখানে চাকরি করেন।’ মাঝখানে আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। আমাদের সময়ের ফুটবলার বাসু, বাদলরা ওখানকার কাস্টমস বিভাগে চাকরি করে। ওরা আমাকে মাঝেমধ্যে নিয়ে যেত। ঘুরিয়ে দেখাত কাস্টমস অফিস, বন্দর। বাসায় নিয়ে যেত; খাওয়াত। আর অন্যদের বলত, ‘ওঁকে চেনেন? মোহামেডানের কী এক ফুটবলার যে ছিলেন এই আইনুল ভাই!’ ওখানে আমি কী চাকরি করতাম, তা বাসার লোকদের বলত না। লুকিয়ে রাখত। আসলে ভাই, চাকরি তো করি পেটের দায়ে। কর্ম করে খেতে হবে, সে জন্য। এখন কেউ যদি চেনে, তাহলে আর কী করা! শুধু সাদেক ভাইকে আর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেবকে একবার বলেছিলাম, ‘আমাকে ঢাকায় কোনো চাকরি দিয়েন না।’ কেন জানেন? (চোখের জল মুছতে মুছতে) তাহলে হয়তো বসুন্ধরা সিটিতে আমার ডিউটি পড়বে। ওখানে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসে। কেউ কেউ আমাকে চিনে ফেলতে পারে। সেটি লজ্জার ব্যাপার হবে না!

প্রশ্ন : মোহামেডান ক্লাব থেকে কিছু করেনি?

আইনুল : ক্লাবের সব তো ধান্ধাবাজ। অসুস্থ হওয়ার পর লোকমান ভাই অনেক দিন ধরে বলেছেন, আমাকে সাহায্য করবেন। কী সাহায্য করেছেন? ফুটবল ফেডারেশন নির্বাচনে সালাউদ্দিনের বিপক্ষে নির্বাচন করা পোটন ভাইকে ক্লাবে একদিন ডেকে নিয়ে যান লোকমান ভাই। আমাকেও ডাকেন। তাঁর কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে আমার হাতে তুলে দেন। এই হচ্ছে আমার প্রতি মোহামেডান ক্লাবের অবদান!

প্রশ্ন : সরকার থেকেও আপনার কোনো খবর নেয়নি?

আইনুল : আর খবর! আমি নাকি বিএনপির লোক! কিভাবে এটি হয়েছে, শুনুন। আমি ক্যান্সার আক্রান্ত এক অসুস্থ ফুটবলার। যে কেউই তো আমাকে দেখতে আসতে পারেন, নাকি? তেমনি গোলরক্ষক আমিনুল বাসায় আসে একদিন। ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পর দিন আমিনুল আবার আসে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে। তিনি বিএনপির পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা অনুদান দিয়ে যান। এতেই নাকি আমি বিএনপি হয়ে গেলাম!

প্রশ্ন : এ জন্যই সরকারের পক্ষ থেকে আপনার আর খবর নেওয়া হয়নি!

আইনুল : হ্যাঁ। আমার মেয়েজামাই অ্যাপোলো হাসপাতালে ছোটোখাটো চাকরি করে। আমাদের এলাকার এমপি ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে ওর পরিচয় আছে। ও একদিন এমপি সাহেবকে বলে, ‘আমার শ্বশুরের ক্যান্সার। তিনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। তাঁকে একদিন দেখতে যাবেন?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘আমাদের দেখতে যাওয়ার দরকার কী! ফখরুল সাহেব দেখতে গেছেন, খালেদা জিয়া অনুদান দিয়েছেন। আপনার শ্বশুর তো বিএনপির লোক।’ চিন্তা করেন অবস্থা! এই দেশের জন্যই কি আমরা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল করেছি?

প্রশ্ন : নামকরা এক ফুটবলার খেলা ছাড়ার পর এমন দুঃখের জীবনে এসে পড়লেন। কষ্ট হয় না?

আইনুল : নাহ্, কষ্টের কী আছে! আমার কথা কেউ যখন মনে রাখেনি, কেন খালি খালি কষ্ট পাব! মোহামেডানের হয়ে কত কত ম্যাচ খেলেছি! জিতেছি। কই, ওই ক্লাব কি আমাকে মনে রেখেছে? স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলে প্রবাসী সরকারের হাতে তুলে দিয়েছি লাখ লাখ টাকা। আর ওই দলের তিনটি ম্যাচের অধিনায়ক এই আমার এখন অর্থের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা হয় না। তাতে বাংলাদেশের মানুষ যদি কষ্ট না পায়, আমি কষ্ট পাব কেন?

প্রশ্ন : রাগ হয় না? কেন মোহামেডানের হয়ে খেলেছি? কেন হাজার-হাজার, লাখ-লাখ সমর্থককে আনন্দ দিয়েছি? কেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে এত কিছু করেছি?

আইনুল : রাগ তো হয়ই। আবার ভাবি, রাগ করে কী হবে! আমার রাগের কী মূল্য? ক্যান্সার হওয়ার পর কত টাকা যে খরচ হচ্ছে! ডাক্তারের কাছে গেলেই ৫০-৬০ হাজার টাকা। খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। তা-ও নিজের বাড়িতে থাকি বলে রক্ষা। ওখান থেকে কিছু ভাড়া পাই। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য হিসেবে মাসে ভাতা পাই তিন হাজার টাকা। এসব দিয়ে চিকিৎসার পাশাপাশি সংসারও চালাতে হয়। সংসারে সাতজন লোক। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজন, মেয়ে-মেয়ের জামাই আর ওদের তিন বাচ্চা। আসলেই ভাবিনি যে এত কষ্টে জীবন যাবে।

প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের লাল রঙের ট্র্যাকসুট পরে আছেন আপনি। এটি নিশ্চয়ই আপনার জীবনের সবচেয়ে গর্বের জায়গা?

আইনুল : আপনি সাক্ষাত্কার নিতে আসবেন শুনে এই ট্র্যাকসুট পরেছি। ওই দলে খেলা অবশ্যই গর্বের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের আজ পুরো দেশের মাথায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের ভেতরকার কিছু লোকের কারণেই এখন এ নিয়ে নানা কথা হয়। নানা রকম প্রচারণা চলে। দেখে-শুনে খারাপ তো লাগেই। সবচেয়ে খারাপ লাগে ইতিহাস বিকৃত হতে দেখলে। সাইদুর রহমান প্যাটেল যে ওই দলটির প্রতিষ্ঠাতা, এটি স্বীকার না করলে তো ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।

প্রশ্ন : ওই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের তিনটি ম্যাচে আপনি ছিলেন অধিনায়ক। কিন্তু ইতিহাসের আলোচনায় তা সেভাবে উঠে আসে না। কষ্ট লাগে না?

আইনুল : ওই যে বললাম, প্যাটেল ভাইয়ের অবদানই স্বীকার করে না। আহা, কী অসাধারণ মানুষ তিনি! অনেক বছর বিদেশে থেকে দেশে এসে আমাকে ঠিক খুঁজে বের করেন। অনেক গল্পটল্প করার পর আমার হাতে তুলে দেন আড়াই লাখ টাকা। আমি হতভম্ব! কারণ নিজের ভাইকেও তো কেউ এখন ৫০০ টাকা দেয় না। আমার আপন বড় ভাই পাশের বাড়িতে থাকেন। এই আড়াই কাঠা জায়গা একসঙ্গে আমার টাকায় কেনা। ভাই প্রতিষ্ঠিত, তাঁর ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কেউ আমার খোঁজ নেয় না। অথচ প্যাটেল ভাই আমাকে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে দিলেন! কেন? কারণ আমি এককালের নামি ফুটবলার ছিলাম, এখন সিকিউরিটির চাকরি করি—এটি শুনে তাঁর খারাপ লেগেছে। তখন কিন্তু আমার ক্যান্সারও ধরা পড়েনি। এ কারণেই গ্রামের ওই প্রবাদ সত্যি মনে হয়—আপনের চেয়ে পর ভালো, পরের চেয়ে জংলা ভালো। প্যাটেল ভাই হাতে টাকা দেওয়ার পর কেঁদে উঠে আমি বলি, ‘আপনি আমার এত বড় উপকার করলেন! এই টাকা কিভাবে শোধ করব?’ প্যাটেল ভাই বললেন, ‘এই টাকা কি ফেরত পাওয়ার জন্য দিয়েছি নাকি? রেখে দেন।’ অথচ এই মানুষটাকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রাপ্য স্বীকৃতিটা অনেকে দিতে চান না।

প্রশ্ন : ওই দলে আপনার অধিনায়কত্ব নিয়ে...

আইনুল : হ্যাঁ, কথায় কথায় অন্য দিকে চলে গিয়েছিলাম। আসলে একটি ম্যাচে অধিনায়ক হলেও তো অধিনায়ক। কিন্তু এর স্বীকৃতি নেই কোথাও। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল থেকে প্যাটেল ভাইকে চলে যেতে হয়। পরে নানা ঝামেলা করার কারণে পিন্টু ভাই, প্রতাপদাদের কয়েকটি ম্যাচে দলে নেননি কর্মকর্তারা। তাঁদের ছাড়াই আমরা তিন ম্যাচ খেলি। বর্ধমান, সীমান ও বেনারশের সেই তিন খেলায় আমি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক। এখন সবাই অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর কথা বলে, সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরার কথাও। কিন্তু আমার কথা বলে না। পিন্টু ভাইও কখনো বলেন না। এই যে আমি অসুস্থ, কোনো দিন দেখতেও আসেননি। একদিন তো সবাই মরে যাব। পিন্টু ভাই তাই আমাকে দেখতে এলেই-বা কী, না এলেই-বা কী!

প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে যোগ দেন কিভাবে, একটু যদি বলেন?

আইনুল : মুক্তিযুদ্ধের আগে ঢাকেশ্বরী কটন মিলে চাকরি করি। চাকরি বলতে ওদের বিভাগীয় খেলায় গিয়ে খেলে আসি আর কী! ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে ওদের হয়ে কক্সবাজার খেলতে যাওয়ার কথা। আগের রাতে সব খেলোয়াড় গিয়ে উঠি আদমজীর পাশের ওই মিলে। এর মধ্যে তো শুরু হয়ে যায় গোলমাল। মিলের পানির ট্যাঙ্কির ওপর উঠে দেখি, পুরো ঢাকায় আগুন জ্বলছে। আর বুম বুম, দ্রুম দ্রুম শব্দ। সঙ্গের এক ফুটবলার সীতাংশুদা পর দিন আমাকে বলেন, ‘দেশের অবস্থা খারাপ; চলো আমার কুমিল্লার বাড়ি যাই।’ গেলাম। ১০-১২ দিন থাকার পর শুনি আবার বোমার আওয়াজ। পাকিস্তানি আর্মি চলে এসেছে কাছে। সীতাংশুদা ও আমি পর দিন চলে যাই আগরতলা। তাঁর এক দাদা থাকেন, সেখানে গিয়ে উঠি। ওখানে ডিসি কালেক্টরি দলে শুরু করি লিগ খেলা। এর মধ্যে শুনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল হবে। কলকাতা থেকে প্রতাপদাসহ কয়েকজন আসেন আমাদের নিতে। সালাউদ্দিন-নওশের-এনায়েতসহ অনেকে তখন চলে যায়। আমি কিছু দিন পর ডিসি দলকে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে রওনা দিই কলকাতা। যাওয়ার আগে ক্লাব থেকে পাওয়া দেড় হাজার টাকার মতো ছিল হাতে। ১০ কি ২০ টাকা হাতখরচের জন্য রেখে বাকি টাকা দিয়ে যাই সীতাংশুদার স্ত্রীর হাতে। সীতাংশুদা, বৌদি একেবারে কেঁদে দিয়েছিলেন। যাই হোক, আমি কলকাতা গিয়ে যোগ দিই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে।

প্রশ্ন : এবার ছোটবেলার কথা জানতে চাই। পরিবারের কথা, কিভাবে ফুটবলার হলেন, সে কথা...

আইনুল : আমার জন্ম ১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারি ফরিদপুরে। এখন সেটি গোপালগঞ্জে পড়ে গেছে, মোকসেদপুর থানা। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির বেশ কাছেই। আমার বাপ-চাচারা মাছ ধরে শেখের বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাবাকে খাইয়েছেনও। আমার বাবা এসএম সবুর আলী ছিলেন কৃষক। মা মাজু বিবি। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে আমি তিন নম্বর। আমার ছয়-সাত বছর বয়সে মা-বাবা মারা গেলেন। দুই বোনও মারা গেছে ছোট থাকতে। ফরিদপুরে এক চাচা থাকতেন, দুই ভাই সেখানে চলে যাই। ওখানে স্কুলে ভর্তি হয়ে শুরু ফুটবল খেলা। এর মধ্যে খেলোয়াড় হিসেবে বড় ভাইয়ের হঠাৎ ওয়াপদায় চাকরি হয়ে যায়। কিছু দিন পর তিনি চলে যান ঢাকায় কৃষি ভবনে। একটা মাত্র ভাই, সে-ও ঢাকা চলে গেল, আমার আর পড়ালেখা ভালো লাগে না।

প্রশ্ন : ফুটবলের মূলধারায় আসেন কিভাবে?

আইনুল : ফরিদপুর পুলিশ দল একবার অনুশীলন ম্যাচ খেলে আমাদের স্কুলের সঙ্গে। তাতে আমরা জিতে যাই ২-১ গোলে। ম্যাচের পর এসপি সাহেবকে গিয়ে বলি, ‘স্যার আমি পুলিশে চাকরি করতে চাই।’ আমার খেলা তিনি একটু আগে দেখেছেন, পছন্দও হয়তো হয়েছে। তিনি এক হাবিলদারকে বলেন, ‘এই ছেলেকে ময়মনসিংহ খেলতে নিয়ে যাও।’ ব্যস, পুলিশে ঢুকে যাই। আর পড়ালেখা করিনি, ম্যাট্রিক পরীক্ষাও দিইনি। সারদায় ট্রেনিং শেষে পুলিশ দলে ফুটবল খেলা শুরু। রাজশাহীতে পোস্টিং ছিল কিন্তু ফুটবলার হিসেবে ভালো ছিলাম বলে আইজি সাহেবের কথায় ঢাকা চলে আসি।

প্রশ্ন : ডিফেন্ডার কি আপনি ওই ছোটবেলা থেকেই?

আইনুল : হ্যাঁ। হয় স্টপার, নয় লেফট ব্যাক।

প্রশ্ন : ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ (ইপিপি) তখন ঢাকার প্রথম বিভাগের দল। সেখানে খেলা শুরু কবে?

আইনুল : ১৯৬৩ সালে। চার বছর খেলার পর ১৯৬৭ সালে চলে যাই ফায়ার সার্ভিসে।

প্রশ্ন : কত টাকায়, মনে আছে?

আইনুল : পুলিশে বেতন পেতাম মাসে দুই-আড়াই হাজার টাকা। আর ফায়ার সার্ভিসে যাই ছয় হাজার টাকায়। সঙ্গে প্রচুর খেপ খেলি। ওখান থেকেও টাকা আসে।

প্রশ্ন : মোহামডোনে নাম লেখান কিভাবে?

আইনুল : খেলা দেখে আমাকে পছন্দ করেন মোহামেডানের গজনবী ভাই। তিনি নিজের গাড়ি পাঠিয়ে দেন সদরঘাটে ফায়ার সার্ভিসের হেডকোয়ার্টারে। গজনবী ভাই ডেকেছেন, না গিয়ে উপায় আছে! যাওয়ার পর বলেন, ‘অ্যাই আইনুল, আগামী বছর মোহামেডানে খেলবি।’ আমি বলি, ‘ভাই, মোহামেডানে এক ম্যাচ খারাপ খেললেই তো বসিয়ে দেবে। আর খেলাবে না। আমার ক্যারিয়ার তাহলে শেষ।’ তিনি বলেন, ‘না, তোকে নিয়মিত খেলাব।’ ১৯৬৮ সালে সাত হাজার টাকায় চলে যাই মোহামেডানে। ১৯৭৬ পর্যন্ত ওই ক্লাবেই। দুই-তিন-চার-পাঁচ হাজার টাকা করে দিত। মেসে খাওয়াত। ব্যস! ক্লাব প্রেসিডেন্ট মইনুল সাহেব পিঠ চাপড়ে কাজ সেরেছেন। আমরা আসলে খেলে তেমন টাকা পাইনি। পরে ফুটবলে টাকা এসেছে।

প্রশ্ন : আগা খান গোল্ডকাপে খেলেছেন?

আইনুল : ইন্দোনেশিয়ার এক দলের বিপক্ষে খেলেছি। কোন টুর্নামেন্ট মনে নেই।

প্রশ্ন : আরসিটি টুর্নামেন্টে?

আইনুল : হ্যাঁ খেলেছি। 

প্রশ্ন : ঢাকার মাঠে আপনার একটি নাম ছিল—ডিআইটি...

আইনুল : হ্যাঁ, ঢাকাইয়ারা আমাকে ডিআইটি বলত। আমি তো অনেক লম্বা। ঢাকার মাঠে যেমনই খেলেছি, আমার মাথার ওপর দিয়ে কেউ কখনো বল নিতে পারেনি। ডিআইটি বিল্ডিংয়ের নাম অনুসারে তাই ডাকত সমর্থকরা। তোরাব আলী চলে যাওয়ার পর ঢাকার মাঠে আইনুলই ‘ডিআইটি’।

প্রশ্ন : ডিফেন্ডার হিসেবে আপনার শক্তির জায়গা কী?

আইনুল : হয় বল রাখতে হবে কিংবা খেলোয়াড়—এই ছিল আমার খেলার ধরন। ডজ দিয়ে ফেলে বল নিয়ে চলে যাবে, তা হবে না। ঢাকার মাঠের এক নামকরা স্ট্রাইকার ব্রাদার্সের মহসিন। সে ওই সময়ে এক সাক্ষাত্কারে বলে, ‘আইনুল ভাইয়ের সামনে যেতে আমি ভয় পাই। হয় খেলোয়াড় নয় বল—তিনি একটিকে রেখে দেবেনই।’ পরে মহসিনকে একদিন সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘মহসিন, তুমি এ কথা কিভাবে বললে? আমি তোমাকে কোনো দিন মেরেছি?’ ও বলে, ‘না ভাই। কিন্তু আপনাকে দেখলেই আমার ভয় লাগে।’

প্রশ্ন : কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে এমন সাক্ষাত্কার পর্বে একই কথা বলেছেন ঢাকার মাঠের ওই সময়ের আরেক তুখোড় স্ট্রাইকার নওশেরুজ্জামানও।

আইনুল : তাই নাকি?

প্রশ্ন : হ্যাঁ। ঠিক এই কথা—ঢাকার মাঠে একজন ডিফেন্ডারকেই আমার ভয় লাগত; আইনুল ভাই।

আইনুল : ওই যে বল নয়তো খেলোয়াড় রাখতে হবে—সে কারণেই হয়তো ভয় পেত।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় এনায়েতও নাকি আপনার বিপক্ষে খেলতে ভয় পেতেন?

আইনুল : আসলে ওই সময় মোহামেডানের বিপক্ষে গোল দেওয়া কঠিন ছিল। আমি, পিন্টু ভাই, জহির ভাই, মঈন—ডিফেন্সটা খুব শক্তিশালী। এনায়েতের কথা বলছেন তো? হ্যাঁ, ভয় পেতে পারে। কারণ আমি একটু ‘মারু’ টাইপের ছিলাম।

প্রশ্ন : ওই সময়ের মোহামেডানের খেলোয়াড়দের মধ্যে ‘বরিশাল গ্রুপ’ ও ‘কুমিল্লা গ্রুপ’-এর কথা পুরনো দিনের সাংবাদিক-সমর্থকরা এখনো বলেন। এই গ্রুপিংয়ের ব্যাপার কতটা সত্যি?

আইনুল : মিথ্যা বলার উপায় নেই। তবে এগুলো সিনিয়র ফুটবলারদের ব্যাপার। গজনবী ভাই বরিশালের, আশরাফ ভাই আবার কুমিল্লার। আমাদের ক্লাব প্রেসিডেন্ট অবশ্য দুজনকেই বেশ আদর-যত্ন করতেন। আমি কোনো গ্রুপিংয়ে ছিলাম না। কিন্তু আমার বাড়ি কুমিল্লা বলে জানত সবাই। যদিও আমার বাড়ি ফরিদপুর।

প্রশ্ন : ওই সময়ে অনেক মাকরানি ফুটবলার খেলতেন ঢাকায়। তাদের মধ্যে আপনার চোখে সেরা কে?

আইনুল : আক্রমণভাগে আলী নেওয়াজ আর রক্ষণভাগে কালা গফুর। দুজনই এশিয়া মানের। কিন্তু আলী নেওয়াজ এমন ডজ মারত যে কালা গফুর পর্যন্ত শুয়ে পড়ত। স্যাৎ স্যাৎ করে বেরিয়ে যেত লম্বা স্টেপ দিয়ে, ওকে আটকানোর কোনো উপায় নেই। আমাদের মেজর হাফিজ ভাইও অমনভাবে খেলতেন। বল কাটিয়ে যে লম্বা স্টেপ দিতেন, তা ধরার কায়দা ডিফেন্ডারদের ছিল না।

প্রশ্ন : আলী নেওয়াজের বিপক্ষে আপনার ওই ‘বল নয়তো ফুটবলার’ তত্ত্ব খাটাননি?

আইনুল : আমার কাজই তো বল নয়তো খেলোয়াড় ধরে রাখা। কিন্তু সব সময় কি আর অমন করা যায়! তবে ইপিডিআইসিতে খেলার সময় মোহামেডানের এই আমার বিপক্ষে আলী নেওয়াজও খুব আরামে থাকত না।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে সেরা কে?

আইনুল : আক্রমণে আমি সালাউদ্দিনের কথাই বলব। খুব স্টাইলিশ ছিল। হাফিজ ভাই ভালো অ্যাথলেট আর এনায়েত একেবারে অন্য রকম। কিন্তু সব মিলিয়ে সালাউদ্দিন এগিয়ে।

প্রশ্ন : ডিফেন্ডার হিসেবে?

আইনুল : মহসিন-নওশের-এনায়েতের মতো ফুটবলার আমার সামনে আসতে ভয় পেত। আমাদের সময়ে আমি তাই কম ছিলাম না। আর পরবর্তী সময়ে মুন্নাকে সেরা মনে হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনার সেরা ম্যাচ?

আইনুল : আমার কথা তো আমি সেরা বললে হবে না। অন্যরা বলবে। তবে ইপিডিআইসিতে মাকরানিরা খেলত তো। ওদের বিপক্ষে খেলার মজাই আলাদা। ১৯৭০  সালে ইপিডিআইসির বিপক্ষে ম্যাচের পর আমার প্রশংসা করে পেপারে লেখা হয়। ছবিটবিও ওঠে। ওই খেলাটির কথাই এখন মনে পড়ছে।

প্রশ্ন : ১৯৭৫ সালে ব্রাদার্সের বিপক্ষে ম্যাচের ১৫ সেকেন্ড বাকি থাকতে আপনার হেড থেকে তোতার শটের গোলে মোহামেডান জেতে, ওই ম্যাচটি?

আইনুল : হ্যাঁ, মনে আছে। কুষ্টিয়ার ছেলে তোতা। আমার হেডেই গোল হয়ে যায়, ও শেষ মুহূর্তে পা লাগায়। আসলে আমার গোল, কিন্তু নাম হয়ে গেল তোতার। মনে আছে ম্যাচটি। ব্রাদার্স তো ওই বছর তুখোড় দল। মহসিন-বাবলুরা আবাহনীকে হারিয়ে দিয়েছে। ওই দলের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলটির কথা অনেক দিন পর মনে করিয়ে দিলেন।

প্রশ্ন : ১৯৭৪ সালের লিগে মোহামেডান হয় নবম। শেষ ম্যাচে দিলকুশার কাছে আপনারা হেরে যান ১-৫ গোলে...

আইনুল : ওইটা তো ‘ধরাধরি’র ম্যাচ।

প্রশ্ন : হ্যাঁ, সেটিই জানতে চাইছি। মোহামেডানের তখন সুপার লিগে ওঠার সম্ভাবনা শেষ। শেষ ম্যাচে হেরে গেলে সুপার লিগে উঠতে পারবে না ওই সময়ের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ান্ডারার্স ক্লাবও। সে জন্য নাকি ইচ্ছা করে আপনারা হেরে যান?

আইনুল : ওই বছর মোহামেডান খুব খারাপ করে। দিলকুশার কাছে হারের পর সমর্থকরা ক্লাবে আসে ক্লাব জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য...

প্রশ্ন : তাই কি? যতটুকু জানা যায়, সমর্থকদেরই নাকি চাপ ছিল হেরে যাওয়ার জন্য? এমনও তো শোনা যায়, বিরতির সময় কয়েক গোলে পিছিয়ে থাকা মোহামেডানের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু অফিসিয়ালদের কাছে শুনে আসেন, কত গোলে দল হারলে গোলপার্থক্যে ওয়ান্ডারার্সকে টপকে যাবে দিলকুশা?

আইনুল : নাহ্্, আমার অত স্মরণে নেই। শুধু মনে আছে, ওটি ছিল ধরাধরির ম্যাচ। আর হারের পর মোহামেডানের কর্মকর্তারা তো পলাতক হয়ে যায়। সমর্থকদের আমরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঠাণ্ডা করি।

প্রশ্ন : আচ্ছা, একটা কথা শুনেছি যে অনুশীলনে কিংবা খেলার বাইরের সময়টায় আপনার মুখে নাকি সব সময় পান থাকত। সত্যি?

আইনুল : না তো। ও হ্যাঁ, আদা থাকত মুখে। সেটিই বোধ হয় আপনি শুনেছেন পান।

প্রশ্ন : শেষ খেলেন কবে?

আইনুল : মোহামেডানে শেষ খেলি ১৯৭৬ সালে। এরপর পিডাব্লিউডিতে একবছর। শেষ মৌসুমেও মনে হয় ছয়-সাত হাজার টাকা পেয়েছি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় দলে খেলেছেন আর?

আইনুল : নাহ, আমার মূল খেলা তো স্বাধীনতার আগে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পর জাতীয় দলে আর খেলা হয়নি।

প্রশ্ন : ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটু যদি বলেন। বিয়ে করেন কবে?

আইনুল : ১৯৭২ সালে। স্ত্রীর নাম মমতাজ বেগম। আমাদের একটি মেয়ে আইরিন সুলতানা ডলি। মেয়ের ঘরে তিন নাতি-নাতনি।

প্রশ্ন : ফুটবল ছাড়ার পরের কষ্টের জীবন নিয়ে সাক্ষাত্কারের শুরুতে অনেক কিছু বলেছেন। তবু শেষ প্রশ্নে জানতে চাই, জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার আনন্দ কতটা? আফসোস কতটা?

আইনুল : খেলার জীবন পুরোটা আনন্দের; পরের জীবন পুুরোটা আফসোসের। খেলার জীবনে ফুর্তিতে দিন কাটিয়েছি। আর পরের জীবনে এখন তো পরিবার নিয়ে চলাই কঠিন। সামনে কিভাবে দিন কাটবে, এটিই সবচেয়ে বড় চিন্তা। তবে এর মধ্যেও অনেকে আমার খোঁজ নেন। এই যেমন আপনারা সাক্ষাত্কার নিতে এলেন। এতে ভালো লাগে। মনে হয়, ফুটবলার আইনুলকে এখনো কেউ কেউ মনে রেখেছে। আমার ক্যান্সারের কথা শুনে সাহায্য করেন অনেকে। চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের মালিক তরফদার রুহুল আমিন সাহেব পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে গেছেন। এমন লোকদের সাহায্যেই বেঁচে আছি এখনো।

আমি ফুটবল কেমন খেলেছি, জানি না। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার বা এমন কোনো স্বীকৃতির যোগ্য আমাকে কেউ মনে করেনি। এখন একটা ব্যাপার দেখে যেতে পারলে ভালো লাগবে। আমাদের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে যদি কোনো স্বীকৃতি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়। প্যাটেল ভাই, তান্না ভাইরা সে জন্য অনেক দৌড়াদৌড়ি করছেন। দেখা যাক, কী হয়!

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা