kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

সিংহাসন হারিয়ে দিগ্‌ভ্রান্ত পাকিস্তান

১৩ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সিংহাসন হারিয়ে দিগ্‌ভ্রান্ত পাকিস্তান

সাঈদ আনোয়ার, আমির সোহেল, ইনজামামউল হক, মোহাম্মদ ইউসুফ, ইউনিস খান, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার—পাকিস্তানি ক্রিকেটের কিংবদন্তি একেকজন। এমন মহাতারকাদের নিয়েও ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে টানা পাঁচ টেস্ট হেরেছিল পাকিস্তান। অস্ট্রেলিয়ায় তিনটি আর নিজেদের দেশে শ্রীলঙ্কার কাছে দুটি। নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে সেই একবারই টানা পাঁচ টেস্ট হারার লজ্জা পেয়েছিল পাকিস্তান। রেকর্ডটা ভাঙল মিসবাহ উল হকের দল। অস্ট্রেলিয়ায় হোয়াইটওয়াশ হওয়া দলটি হেরেছে টানা ছয় ম্যাচ। যেকোনো দলের খারাপ সময় আসতেই পারে। তবে গত বছরও র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা কারো এভাবে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়াটা বিরল। গত আগস্টে শীর্ষে ওঠা দলটা পাঁচ মাসের ব্যবধানে নেমে গেছে পাঁচে!

আজহার আলী, বাবর আজম, আসাদ শফিকদের মতো তরুণদের নিয়ে দলটা গড়েপিটে তুলেছিলেন মিসবাহ উল হক। গতবছর ইংল্যান্ড সফরের আগে সেই দল হারেনি টানা পাঁচ টেস্ট সিরিজ। এই পাঁচ সিরিজে আরব আমিরাতে ২-০তে হোয়াইটওয়াশ করেছিল অস্ট্রেলিয়াকে, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজ ড্র (১-১), বাংলাদেশের মাটিতে ১-০-এ জয়, শ্রীলঙ্কার মাটিতে ২-১-এ জয় আর আরব আমিরাতে ইংল্যান্ডকে হারায় ২-০তে। ইংল্যান্ডের কঠিন সফরে আসল পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল মিসবাহদের। এ জন্য অ্যাবোটাবাদে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে বিশেষ অনুশীলনও করে পাকিস্তান। লর্ডস টেস্টে সেঞ্চুরির পর মিসবাহ উল হক ১০টা বুকডন দিয়ে জানান বিশেষ কৃতজ্ঞতা। ম্যাচটা ৭৫ রানে জিতে বুকডন দেয় পুরো দল। চার টেস্টের সিরিজটি পাকিস্তান শেষ করে ২-২ সমতায়। আর সাফল্যের মই বেয়ে তরতর করে উঠে যায় র্যাংকিংয়ের শীর্ষে।

এরপর অতি আত্মবিশ্বাসেই পোঁতা পতনের বীজ। নিজেদের ছায়া হয়ে পড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই টেস্ট জিতে সিরিজ নিশ্চিতের পর শারজায় হেরে যায় পাকিস্তান। পতনের শুরুটা সেখান থেকেই। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নিয়ে নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে ভরাডুবি মিসবাহ উল হকের দল। ক্রাইস্টচার্চে ৮ উইকেট আর হ্যামিল্টনে হারতে হয় ৮ উইকেটে। সেটা ছিল ৩০ বছর পর নিউজিল্যান্ডের কাছে পাকিস্তানের প্রথম সিরিজ হার। তাসের ঘরের মতো ধসে হ্যামিল্টনে শেষ সেশনে তারা হারিয়েছে ৯ উইকেট। শেষ ৪ উইকেট আবার মাত্র ১ রানের ব্যবধানে! এরপর আজহার আলীর সরল স্বীকারোক্তি, ‘দুবাইয়ে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছিলাম। এরপর নিজের আত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে। সেটা গড়াগড়ি খেল নিউজিল্যান্ডে এসে। এমন উইকেটে এর আগে জীবনে খেলিনি।’ সব ধরনের উইকেটে মানিয়ে নিতে না পারলে আর কিসের নাম্বার ওয়ান? তাই আগস্টে শীর্ষে থাকা পাকিস্তান তিন মাস পর নেমে যায় র্যাংকিংয়ের চারে। দুঃস্বপ্নের অস্ট্রেলিয়া সফরে হোয়াইটওয়াশ হয়ে চার থেকে নেমে গেছে পাঁচে।

ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা ছিলই, তবে সবচেয়ে বিবর্ণ ছিলেন বোলাররা। ইয়াসির শাহর কথাই ধরুন। দলের অন্যতম সেরা বোলার এই লেগ স্পিনার। অস্ট্রেলিয়া সফরে আসার আগে পাকিস্তানি কোচ মিকি আর্থার স্বপ্নই দেখছিলেন তাঁকে ঘিরে, ‘শেন ওয়ার্ন অবসর নিয়েছেন অনেক দিন। নিজেদের দেশে এবার নতুন ওয়ার্নের ঝলক দেখবে তারা।’ সেই ‘নতুন ওয়ার্নকে’ ক্রিকেট শিখিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তিন টেস্টের সিরিজে ইয়াসির রান দিয়েছেন ৬৭২! তিন ম্যাচের সিরিজে এত বেশি রান দেওয়ার রেকর্ড নেই আর কারো। আরো একটা দিক দিয়ে তিনি ‘মুক্তি’ দিয়েছেন বাংলাদেশের শাহাদাত হোসেনকে। সিডনি টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪ ওভারে তাঁর খরচ ১২৪ রান। ওভার পিছু খরচ ৮.৮৫ রান! কোনো ইনিংসে অন্তত ১০ ওভার করা বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে খরুচে এটা। ২০০৫ সালে লর্ডস টেস্টে বাংলাদেশের শাহাদাত হোসেন ১২ ওভারে ১০১ রান দিয়েছিলেন ওভারপিছু ৮.৪১ রেটে। অথচ এই ইয়াসির শাহ ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন সাঈদ আজমলের অভাব। পাকিস্তানি বোলারদের মধ্যে দ্রুততম ৫০ টেস্ট উইকেট নেওয়ার কীর্তিও ইয়াসিরের। তাঁর মতো পারফর্মার ম্লান থাকলে প্রভাব পড়ে অন্যদের ওপর। সেটা পড়েছেও এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে। কোনো টেস্টেই নিতে পারেনি অস্ট্রেলিয়ার ২০ উইকেট। তিন টেস্টে স্টিভেন স্মিথের দল ব্যাট করেছে পাঁচ ইনিংস, আর ইনিংস ঘোষণা করেছে চারবার। পাকিস্তানি বোলারদের মিলিত গড় ৬০.৫৪, যা তাদের বোলিং ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ১৯৬২ সালের ইংল্যান্ড সফরে বোলারদের ৬৩.৮৩ গড়টা এখনো সর্বোচ্চ। পাকিস্তানি বোলাররা ব্যর্থ হলেও অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের বোলিং গড় ৩১.৯২। অর্থাৎ সমীহ জাগানিয়া বলই করেছেন তাঁরা।

৩ টেস্টের সিরিজে ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের গড় ছিল ৫৯.৬০। তাদের মোট সেঞ্চুরি সাতটি। বিপরীতে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের গড় ২৯.০১ আর সেঞ্চুরি তিনটি। একেবারেই সাদামাটা ছিলেন দলের মিডলঅর্ডারের স্তম্ভ মিসবাহ উল হক। তিন টেস্টে তাঁর ছয় ইনিংস ৪, ৫, ১১, ০, ১৮ ও ৩৮। সব মিলিয়ে রান করেছেন ৭৬ গড় ১২.৬৬। কোনো সিরিজে অন্তত পাঁচ ইনিংস খেলা অধিনায়করা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর চেয়ে কম গড়ে রান করেননি আর। এর আগে ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে ৬ ইনিংসে কিউই অধিনায়ক জেফ ক্রো ৭৮ করেছিলেন ১৩.০০ গড়ে।  ব্যর্থতার  দায়টা নিয়ে সিরিজের মাঝপথেই সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন মিসবাহ, ‘এই দলটা আমার হাতে গড়া। এর অর্থ এই নয় যে দলে জায়গাটা চিরস্থায়ী। পারফর্ম করতে না পারলে সরে দাঁড়ানোই ভালো।’ শেষ পর্যন্ত মত বদলে অবসর নেননি মিসবাহ। তবে তাঁকে দেখে তরুণদের অনুপ্রাণিত হওয়ার কিছু দেখছেন না অস্ট্রেলিয়ান সাবেক অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল, ‘মিসবাহর সেই ছন্দ নেই। অস্ট্রেলিয়ায় ব্যর্থ একেবারে। দেখুন ও উইকেটে থিতু হয়ে দুবার আউট হয়েছে স্পিনারদের সুইপ খেলতে গিয়ে। এভাবে উইকেট না হারালে অন্তত দুটি ম্যাচ ড্র করতে পারত পাকিস্তান। এমন অভিজ্ঞ একজন এ ধরনের ব্যাটিং করলে তাঁর কাছ থেকে কী শিখবে তরুণরা!’ তবে পাকিস্তানি কিংবদন্তি জাভেদ মিঁয়াদাদ বিকল্প দেখছেন না মিসবাহর, ‘সমস্যাটা হচ্ছে মিসবাহর বিকল্প ব্যাটসম্যান নেই পাকিস্তানের। এটাই বলছে আমাদের ক্রিকেট কাঠামো কতটা দূর্বল। দুনিয়ার সবখানেই পুরনো খেলোয়াড়দের বিদায়ের পর নতুনদের জায়গা নেওয়ার একটা কাঠামো আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এখানে গড়ে ওঠেনি সেটা।’

এ জন্যই ছয় মাস না যেতে পাকিস্তান দিকভ্রান্ত একটা দল। আগস্টে যে দলটা ছিল টেস্টের শীর্ষে তারাই এখন পাঁচ নম্বরে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে পরের সিরিজে খারাপ খেললে নিচে নামবে আরো!

 

মন্তব্য