kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

নির্বাচিত কলাম

পৃথিবীটাই বদলে দিয়েছিল আলী

১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পৃথিবীটাই বদলে দিয়েছিল আলী

মোহাম্মদ আলী এককথায় সর্বকালের সেরা। শুধু ক্রীড়াঙ্গন নয়, রাজনীতিবিদ, সিনেমার তারকা বা আর যিনিই হোন—আমার কাছে আলীই সেরা। লিজ টেলর ও রিচার্ড বার্টন অনেক বড় দুটি নাম। তবে আলীর মতো নয়। তার মতো কাউকে আগে দেখা যায়নি, হয়তো যাবেও না আর। আলী বিশেষ কিছু। ও এমন একটা কিছু, যার দেখা জীবনে হয়তো একবারই পাওয়া যায়। বক্সিং কখনোই নির্ধারণ করতে পারবে না ওর মাহাত্ম্য।

আমাকে নিয়ে আলী বলত ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন! কথাটা ভুল নয়। রিংয়ে আমি তো ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মতো দৈত্যই ছিলাম। একবার আলী আমাকে নিয়ে বলেছিল, ‘জর্জ ফোরম্যান সত্যিকারের বক্সার নয়, ও সব সময় প্রতিপক্ষকে খুন করতে চায়।’ আমি অবাক হই আলী এটা বুঝল কিভাবে? আসলেই আমি রিংয়ে বক্সিং করতে নামতাম না, চেষ্টা করতাম প্রতিপক্ষকে মেরে ফেলতে। মোহাম্মদ আলী সত্যিটাই বলেছে।

আমার দেখা সেরা ঐশ্বরিক প্রতিভা আলী। আকর্ষণ, জাদু, সৌন্দর্য সবই ছিল ওর। আলী এতটাই হ্যান্ডসাম ছিল যে ওকে ঘৃণা করতে পারেন আপনি! ৭৬ ম্যাচে ৬৮ জয়ের ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর ধর্মপ্রচারে নেমেছিলাম। ছেঁটে ফেলেছিলাম মাথার চুল আর গোঁফ। রাস্তায় দেখতাম অনেক মানুষ পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, কিন্তু গুরুত্ব দিচ্ছে না। একদিন বলতে লাগলাম, আমি বক্সার ফোরম্যান। রিংয়ে হেরেছি আলীর কাছে, লড়েছি জো ফ্রেজিয়ারের সঙ্গে। সেদিন দেখলাম সবাই মনোযোগ দিয়ে তাকাচ্ছে আমার দিকে। সেদিনই প্রথমবার মনে হলো আলীর সঙ্গে বক্সিংয়ের মর্যাদা পাচ্ছি।

সে কি সর্বকালের সেরা বক্সার? মোটেও না। কারণ বক্সিংয়ের মতো একটা ক্ষুদ্র খেলার গণ্ডিতে ওকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না আমি। শুধু সেরা বক্সার বললে মানুষ জানবে না ও পৃথিবীটাই বদলে দিয়েছিল। সাদা-কালোর যে বৈষম্য, প্রবল আপত্তি জানিয়েছিল সেটা নিয়ে। যুদ্ধ করতে যায়নি নীরিহ ভিয়েতনামিদের সঙ্গে। যে বক্সিং এত সুনাম এনে দিয়েছে, তার লাইসেন্স কেড়ে নিয়েও দমানো যায়নি ওকে। আলীর এই দৃঢ়তায় বদলে যায় পৃথিবীটা। ওর জেতা শিরোপাগুলো দিয়ে দিন জো লুইস বা আর যাঁরা বক্সার আছে তাঁদের। অবশ্যই আলী সেরা বক্সার। তবে আরো অনেক ভালো বক্সারই তো আছে। আলীর শ্রেষ্ঠত্ব বক্সিং রিংয়ে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপার নয়। অনেক বড় এর ব্যাপ্তি।

মনে আছে যখন আমি বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপা জিতি, তখন ‘চ্যাম্পিয়ন’ শব্দটা শুনতে ভালো লাগত না; বরং আমার মতো আরো অনেকে শুনতে চাইত ‘এই ছেলেটা আলীকে হারিয়েছে’। সব সময় আলীকে হারাতে চাইতাম আমরা। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, কেউ হারাতে পারেনি ওকে। তাহলে আলী যে ম্যাচগুলো হেরেছে এর পরিসংখ্যান কি ভুল? তাও না। আসলে আলীর হারা ম্যাচের পরও কেউ বলতে চাইত না, আলী হেরেছে বা প্রতিপক্ষ ওকে হারিয়েছে। বরং এর পরও সবাই ওর অটোগ্রাফ নিতে চাইত আর চেষ্টা করত জড়িয়ে ধরার। তাহলে আলী হারল কিভাবে?

 ইউরোপ, আফ্রিকা, সৌদি আরব যেখানেই গেছে সবাই জড়িয়ে ধরতে চেয়েছে ওকে। সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পেরেছিল ও। সবাই বুঝতে পারত এই লোকটা ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিচ্ছে। সৌন্দর্য, মস্তিষ্ক, ভাবনার আলাদা মানে দাঁড় করাচ্ছে।

খেলোয়াড়ি জীবনের শত্রুতা ধুয়ে-মুছে যায় আশির দশকে। তরুণ থেকে পুরুষ হওয়ার পর ভালো বন্ধু হয়েছিলাম দুজন। ১৯৭৪ সালে বক্সিংয়ে অনেক বড় তারকা আমি। তখন জায়ারের সেই ‘রাম্বল ইন দ্য জঙ্গল’ ম্যাচের কথাই ধরুন। আমি সব সময় প্রতিপক্ষকে অনেক জোরে মারতাম। সবচেয়ে জোরে ঘুষিটা মেরেছিলাম হয়তো সেই ম্যাচে আলীকেই। কিন্তু ও রিংয়ে পড়ে গেল না। মনে হলো এমন একজনের সঙ্গে লড়ছি, যে নিজে চাইলেও পড়ে যাবে না। কেননা হাজারো মানুষ ভালোবাসা দিয়ে টেনে ধরে আছে ওকে। যখন মানুষ আপনার ওপর বিশ্বাস রাখে আর প্রার্থনা করে, তখন লুটিয়ে পড়তে পারেন না কোনোভাবে। মানুষ যা বিশ্বাস করে, আপনি লড়েন সেটার জন্যই। মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে শিখেছিলাম এটাই। আলী সর্বকালের সেরা আমেরিকান। আমাদের দেশে ওর নামে একটা দিবস থাকা উচিত।

দুইবারের বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন

 

মন্তব্য