kalerkantho

জোকার রাজ

রাহেনুর ইসলাম   

১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জোকার রাজ

মানুষ প্রথম চাঁদে পা রাখে ১৯৬৯ সালে। একই বছর চারটি গ্র্যান্ড স্লামের সবই জিতেছিলেন রড লেভার। এরপর কেটে গেছে ৪৭ বছর। লেভারের মাইলফলকে পা রাখতে পারেননি কেউ। ‘অ্যাপোলো ১১’-তে চেপে নিল আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদে পা রাখার পর এখন তো সেখানে বাস করা যায় কি না, সেই গবেষণাও চলছে। অথচ পিট সাম্প্রাস, রজার ফেদেরার, রাফায়েল নাদালের মতো কিংবদন্তিদের পেয়েও অতৃপ্তিটা মেটেনি টেনিসে। এবারের ফ্রেঞ্চ ওপেনে সেই হাহাকারই দূর করলেন নোভাক জোকোভিচ। টানা চার গ্র্যান্ড স্লাম জিতে নাম লেখালেন ইতিহাসের পাতায়।

প্রেমের শহর প্যারিসে তিনি উদ্যাপন করেছেন রোলাঁ গারোঁয় হূদয়চিহ্ন এঁকে। তবে উইম্বলডনে ঘাস খাওয়া বা অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে গ্ল্যাডিয়েটরের মতো বুকে চাপর মারার মতো উদ্দামতা দেখালেন না প্যারিসে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো পরিণত তিনি। তাই উঠছে প্রশ্নটা—শারীরিক ও মানসিকভাবে দুরন্ত ফিট জোকোভিচ থামবেন কোথায়? ২৯ বছর বয়সে হয়ে গেছে ১২টি গ্র্যান্ড স্লাম। সামনে শুধু রাফায়েল নাদাল (১৪), পিট সাম্প্রাস (১৪) ও রজার ফেদেরার (১৭)। এই ছন্দে খেলতে পারলে ফেদেরারের ১৭ গ্র্যান্ড স্লামের চূড়ায় পা রাখতেও বেশি সময় নেওয়ার কথা নয় এই সার্বিয়ানের।

কেননা কোনো সার্ফেসেই তাঁর দুর্বলতা নেই। অল কোর্ট খেলোয়াড় বলতে যা বোঝায় জোকোভিচ তা-ই। রোলাঁ গারোঁর ধীরগতির কোর্টেই যিনি ভয়ংকর গতিতে খেলেন, ঘাস বা হার্ড কোর্টে তাঁর গতি, শক্তি আর বৃদ্ধিমত্তার সঙ্গে পেরে ওঠা কতটা কঠিন, হাড়ে হাড়ে বোঝেন প্রতিপক্ষরা। এবার প্রথম রোলাঁ গারোঁর দুর্গ জয় করলেও এর আগে তিনবার পৌঁছেছিলেন ফাইনালে। দুইবার রাফায়েল নাদাল আর একবার হারতে হয়েছে স্তানিসলাস ওয়ারিঙ্কার কাছে। এবারের ফাইনালে অ্যান্ডি মারের কাছেও আত্মসমর্পণ করেছিলেন প্রথম সেটে। তবে এরপর এমনভাবে খেলায় ফিরলেন যে মনে হতে পারে প্রথম সেটটা খেলাই হয়নি! এমন সব ড্রপ ভলি রিটার্ন করেছেন, যেগুলো অনায়াসে উইনার হতে পারত মারের। তা-ই হয়ে গেছে দ্বিতীয় বর্ষীয়ান হিসেবে ক্যারিয়ার স্লামের কীর্তি। যে আটজনের চারটিই গ্র্যান্ড স্লাম আছে, তাঁদের অন্যতম আন্দ্রে আগাসি। তিনি কীর্তিটা করেছিলেন সবচেয়ে বেশি বয়স ২৯ বছর ৩৮ দিনে। জোকোভিচের কম লেগেছে ২২ দিন।

টেনিসে ২৯ বছর বয়সটা কম নয় মোটেও। বিয়ন বোর্গ তো অবসরই নেন ২৫ বছরে! তবে ২৯-এও জোকোভিচের সেরা ছন্দে থাকার কারণ বরিস বেকার আর অসাধারণ কোচিং স্টাফদের সঠিক তত্ত্বাবধান। তাঁরা যেমন ব্যায়াম, খাওয়াদাওয়ার রুটিন, মেন্যু ঠিক করে দেন, তেমনি সাহায্য করেন চোট এড়িয়ে খেলার কৌশল নির্ধারণেও। শরীরনির্ভর টেনিসে চোটে জর্জরিত ৩০ বছর বয়সী রাফায়েল নাদাল যেখানে ক্যারিয়ারের শেষ দেখছেন, সেখানে জোকোভিচ আছেন সেরা ছন্দে। তাইতো মাত্র তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে জিতলেন টানা চারটি গ্র্যান্ড স্লাম। তাঁর আগে ডন বাজ ১৯৩৮ সালে আর রড লেভার কীর্তিটা গড়েছিলেন দুইবার—১৯৬২ ও ১৯৬৯ সালে। তবে সার্বিয়ানের কীর্তিটা এক বছরে নয়। গত বছর জিতেছিলেন উইম্বলডন ও ইউএস ওপেন। আর এবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের পর ফ্রেঞ্চ ওপেন। এক বছরে চার গ্র্যান্ড স্লাম জেতার যে ‘ক্যালেন্ডার স্লাম’, জোকোভিচ সেটা না করায় লেভারের চেয়ে তাঁকে পিছিয়ে রাখতে পারেন অনেকে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ‘জোকার’ একটা দিক দিয়ে ম্লান করেছেন লেভারকেও। ষাটের দশকে টেনিস হতো মাত্র দুটি সার্ফেসে। একটা ঘাস আরেকটা মাটিতে। এখন ঘাস-মাটির পাশাপাশি গ্র্যান্ড স্লাম হচ্ছে হার্ড কোর্টেও। আর তিনটি সার্ফেসই জয় করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ভালোভাবে বুঝিয়েছেন ‘জোকার’। তাই তাঁর ভক্তরা স্বপ্ন দেখছেন স্টেফি গ্রাফের একটি রেকর্ডে জোকোভিচের ভাগ বসানোর। ১৯৮৮ সালে একমাত্র টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে চারটি গ্র্যান্ড স্লাম ও অলিম্পিক সোনা জিতেছিলেন এই জার্মান কিংবদন্তি। টানা চারটি গ্র্যান্ড স্লাম জেতা জোকোভিচেরও সুযোগ থাকছে রিও অলিম্পিকে সোনা জিতে ‘গোল্ডেন স্লাম’ পূর্ণ করার। পারবেন তো তিনি?

টেনিসে এখন চলছে ‘বিগ ফোর’ যুগ। এই বিগ ফোরের কেউ কিন্তু টানা চার গ্র্যান্ড স্লাম জিততে পারেননি। ফেদেরার এক মৌসুমে তিন-তিনবার জিতেছেন তিনটি করে গ্র্যান্ড স্লাম। কিন্তু তিনবারই ব্যর্থ ফ্রেঞ্চ ওপেন জিততে। যে বছর ফ্রেঞ্চ ওপেন আর উইম্বলডন জিতেছিলেন, সেই বছর হেরে যান অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও ইউএস ওপেন। পারেননি নাদালও। কাছাকাছি গেলেও টানা চার গ্র্যান্ড স্লাম জয়টা দূরের বাতিঘরই রয়ে গেছে। আর মারে তো চারটি গ্র্যান্ড স্লামই জেতেননি এখনো। জোকোভিচের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। ২০২ সপ্তাহ র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা জোকোভিচের দাপটে টানা চার বছর কোনো গ্র্যান্ড স্লাম জেতা হয়নি ফেদেরারের। নাদালও ব্যর্থ গত দুই বছর। তাই টেনিসের ‘বিগ ফোর’ ভেঙে বলা যায় ‘বিগ ওয়ান’। চলছে এখন জোকোভিচ-রাজ।

মন্তব্য