kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

আমার চেয়ে ভাল স্কোরার কেউ ছিল না

সালাউদ্দিন-এনায়েত এই দ্বৈরথের ভিড়ে হারিয়ে যান তিনি। তবু যাঁরা বাংলাদেশের শুরুর সময়ের ফুটবল অনুসরণ করতেন তাঁরা জানেন গোল করার ক্ষমতায় ক্ষেত্রবিশেষে এঁদের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন এ কে এম নওশেরুজ্জামান। দুই পায়ে শট, হেড করা মিলিয়ে স্কোরিংয়ের দিক থেকে সত্যিকারের অলরাউন্ডার তিনি। অলরাউন্ডার তিনি আরেক ক্ষেত্রে, ফুটবলের সঙ্গে ক্রিকেটও খেলেছেন দাপটের সঙ্গে। এই কীর্তিমান ওল্টালেন স্মৃতির ডায়েরি, সঙ্গে থাকলেন নোমান মোহাম্মদ

১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ২০ মিনিটে



আমার চেয়ে ভাল স্কোরার কেউ ছিল না

ছবি : মীর ফরিদ

প্রশ্ন : মোহামেডানে এসে প্রথম মৌসুমেই আবাহনীর বিপক্ষে জিতলেন ৪-০ গোলে। সেখানে গোল রয়েছে আপনারও। ১৯৭৫ সালের সেই ম্যাচের স্মৃতিচারণ দিয়ে সাক্ষাৎকারটি শুরু করতে চাই।

এ কে এম নওশেরুজ্জামান : ওই স্মৃতি ভোলার মতো না। ছোটবেলা থেকে আমি মোহামেডানের সমর্থক। আমাদের প্রায় পুরো পরিবারও। তো সেই প্রিয় ক্লাবে গিয়ে চরম প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে এমনভাবে জিতব, সেখানে আবার আমার গোল থাকবে—এটি স্বপ্নের মতো ব্যাপার। সে বছর মোহামেডানে গেলাম আমি, আমার ছোট ভাই শরীফ ও আবাহনী থেকে মন্্জু। দল হিসেবে আবাহনীই ভালো। কিন্তু ম্যাচের দিন ওদের আমরা চুরমার করে দিই। এখানে দুটি কথা একটু বলতে চাই। প্রথমত ম্যাচটি আমরা ৪-০ না, সত্যিকার অর্থে জিতেছিলাম ৬-০ গোলে। রেফারি মনির ভাই দুটি গোল দেননি অফসাইডের অজুহাতে। আমি বাটুকে কাটিয়ে গোল দিয়ে এসেছি, সেটিও অফসাইড! মনির ভাইকে জিজ্ঞেস করি, ‘এটি আপনি কিভাবে অফসাইড দিলেন?’ ওনার উত্তর, ‘চুপ করে থাকো নওশের, খেলাটি ভালোয় ভালোয় শেষ করতে দাও। তোমরা আরো গোল দেবে, ওদিকে আবাহনী কোনো ছুতোয় মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলে খেলাটি তো স্থগিত হয়ে যাবে।’ বুঝে গেলাম আর গোল হলেও উনি দেবেন না। আর মনে পড়ে মন্্জুর সেই অবাক করা ঘটনাটি। ডান সাইডের টাচলাইন ধরে বল কাটিয়ে নিয়ে ঢুকে পড়েছে। এবার বক্সে ঠেললেই আমি বা হাফিজ ভাই গোল দিয়ে দেব। ও করল কী, টাচলাইনের পাশে শেখ কামাল যেখানে বসে ছিলেন, সেখানে আস্তে করে বল রেখে চলে আসে। আমরা তো পারলে ওকে মারতে যাই। বলি, ‘বলটি কেন দিলে না, দিলেই তো নিশ্চিত গোল’। মন্জু বলল, ‘আরে ধূর! চার গোল দিয়ে দিয়েছি, ওদের সঙ্গে আর কী খেলব। এবার ওরাই খেলুক।’ বুঝলাম, আবাহনী থেকে যে তিক্ততা নিয়ে এসেছে, সেই ঝাল ঝাড়ছে মন্‌জু।

প্রশ্ন : ৪-০ গোলে জয়ের উদ্যাপন করেছিলেন কিভাবে?

নওশের : আমাদের হেঁটে ক্লাবে ফিরতে হয়নি। সমর্থকদের কাঁধে চড়েই গিয়েছি। আর ক্লাবে গিয়েও কী উৎসব শেষ হয়! অনেক রাত পর্যন্ত সমর্থকরা ছিল। টিপু ভাই সাধারণত খেলার পর বাসায় চলে যায়, ওই ম্যাচের পর তিনিও যাননি। মধ্যরাতে দেখি একটি গাড়ি এসে থামল মোহামেডান ক্লাবে। সেখান থেকে বেরোয় সালাউদ্দিন, নান্নুসহ আবাহনীর চার ফুটবলার। অন্য দুজনের নাম এখন মনে পড়ছে না। ওদের পরনে তখনো হাফপ্যান্ট। আমার রুমে নিয়ে এলাম, চা-সিগারেট খাওয়া হলো। এরপর ওরা বলল, ‘দোস্ত, তোরা কী কাজ করলি! এখন তো লজ্জায় বাসায় যেতে পারছি না।’ মাঠে শত্রু হলেও মাঠের বাইরে আমরা কিন্তু বন্ধুই ছিলাম। এরপর ওই অত রাতে ক্লাব থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই মগবাজারে এসে আমরা সবাই বিরিয়ানি খেয়েছি। এরপর আবাহনীর খেলোয়াড়দের বিদায় দিয়ে রাত তিনটা-সাড়ে তিনটার দিকে ফিরি ক্লাবে।

প্রশ্ন : লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা তো ওই বছরই হয়েছিলেন?

নওশের : হ্যাঁ, ২২ গোল। সামর্থ্যের দিক দিয়ে ঢাকার মাঠে আমার চেয়ে ভালো স্কোরার আর কেউ ছিল না। এখনো নেই।

প্রশ্ন : কাজী সালাউদ্দিনও না?

নওশের : আমি সবার কথা মাথায় রেখেই বলছি। তখন গোল করার জন্য জাতীয় দলে ছিলাম আমরা তিনজন। সালাউদ্দিন, এনায়েত, নওশের। নিজের কথা বলা ঠিক না, তবু না বলে পারছি না—এই তিনজনের মধ্যে আমার গোল করার সামর্থ্য ছিল অনেক অনেক বেশি। কেন জানেন? আমি ছিলাম অলরাউন্ডার। দুই পায়ে সমান মারতে পারি। বাঁ পায়ে গতি ছিল বেশি আর ডান পায়ের শট হয়তো একটু বেশি নিখুঁত। আর হেডওয়ার্কে ওদের দুজনের চেয়ে আমি অনেক অনেক এগিয়ে। সালাউদ্দিন তো হেডই পারত না। তবে জাতীয় দলে খেলার সময় আমাদের কোনো পাস দেওয়া হতো না। সব পাসই যেত সালাউদ্দিনের কাছে। এসব মেনে নিয়েই খেলতে হয়েছে আমাকে।

প্রশ্ন : কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ফুটবলারের তালিকায় সবার আগে আসে সালাউদ্দিন-এনায়েতের নাম। সেখানে আপনার নাম আসে না সেভাবে। এ নিয়ে কোনো আফসোস?

নওশের : কোনো আফসোস নেই। বরং নিজেদের সময়ে আমরা সালাউদ্দিনকে আরো উৎসাহিত করেছি। ও হংকংয়ে পেশাদার ফুটবলে গেল, আমি ওকে অভিনন্দন জানিয়েছি। ’৭৫-এর মারদেকায় সালাউদ্দিন তিন গোল করল, সবগুলো আমার পাসে। তবে আমি বলছিলাম গোল করার সামর্থ্যের কথা। সেখানে আমি ছিলাম অনেক এগিয়ে। আরেকটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে, আমি ক্যারিয়ারের কেবল তিন বছর খেলেছি বড় দল মোহামেডানে। সালাউদ্দিন তো পুরো সময় আবাহনীতে। প্রতি ম্যাচে আট-দশটা সুযোগ পেত, দু-একটা গোল করত। আমাকে গোল করতে হয়েছে অনেক কম সুযোগের ভেতর থেকে। কেননা জানতাম, ভিক্টোরিয়া-ওয়াপদা-ওয়ান্ডারার্সে আমার জন্য ম্যাচে আট-দশটি গোলের সুযোগ তৈরি হবে না। তবে সালাউদ্দিনের স্টাইল ছিল খুব সুন্দর, ওর টেক অফ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেত। আর এনায়েতের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। সামগ্রিকভাবে ফুটবলার হিসেবে এনায়েতের সামর্থ্য ছিল সবচেয়ে বেশি। অমনটা আমারও ছিল না, সালাউদ্দিনেরও ছিল না।

প্রশ্ন : আপনার কি নিজেকে শুধু স্কোরারই মনে হয়?

নওশের : মোটেই না। অনেককে দিয়ে অনেক গোল করিয়েছি। সালাউদ্দিনকে মারদেকায় তিন গোল করানোর কথা বললাম। আর মোহামেডানে হাফিজ ভাইকে দিয়ে কত গোল করিয়েছি, হিসাব নেই। এমন গোলও করিয়েছি, যেটি উনি জানেন না। ১৯৭৬ সালে আবাহনীর বিপক্ষে আমি মাইনাস করলাম, ওদের গোলরক্ষককে এগিয়ে আসতে দেখে হাফিজ ভাই ভয়ে উল্টো ঘুরে গেলেন। ওনার পিঠে লেগে গোল। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরি। উনি জিজ্ঞেস করেন, ‘কী হয়েছে?’ বললাম, ‘আপনার পিঠে লেগে গোল হয়ে গেছে।’ অথচ এই হাফিজ ভাই ডি-বক্সের ভেতর বল পেলে কখনো আমাকে পাস দেননি। আমাকে না, কাউকেই কখনো দেননি। ওখানে বল পেলে উনি রীতিমতো কান বন্ধ করে ফেলতেন, আমাদের চিৎকার শোনেননি। যেকোনোভাবে চেষ্টা করতেন নিজে গোল দেওয়ার।

প্রশ্ন : ঢাকার মাঠে আপনার একটি ব্যাকভলি বিখ্যাত হয়ে আছে। গল্পটি যদি একটু বলতেন?

নওশের : এটিও ১৯৭৫ সালে, ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে। কাদা মাঠে আমরা ০-১ গোলে পিছিয়ে। একেবারে শেষ মুহূর্তে পূর্ব দিক থেকে রকিব থ্রো করল, ভিক্টোরিয়ার কার মাথায় লেগে বলটি উড়ে আসল আমার উল্টো দিকে। খেয়াল করে বুঝলাম, ব্যাকভলি ছাড়া আর কিছুই করার নেই। শরীরকে শূন্যে ভাসিয়ে তা-ই করি। বলটি কোথায় গেল, পেছনে তাকিয়ে আর দেখার সুযোগ হয়নি। মোহামেডানের গ্যালারি থেকে চিৎকার উঠল আর ওই কাদামাঠেই আমার ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল সব খেলোয়াড়। খেলা শেষে ভিক্টোরিয়ার গোলরক্ষক হালিম দৌড়ে এসে আমার কোলে উঠে পড়ে কপালে দিল চুমু। বলল, ‘নওশের ভাই, যে শট আপনি নিয়েছেন, পৃথিবীর কোনো গোলরক্ষকই তা ঠেকাতে পারত না।’

প্রশ্ন : আপনার ফুটবলার পরিচয়টাই গেঁথে আছে এ দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে। ঢাকার মাঠে ক্রিকেটও খেলেছেন অনেক দিন। ছোটবেলায় কি ভেবেছিলেন, খেলাধুলায় এত দূর যাবেন?

নওশের : মোটেই না। কী হব, কী হব না— এগুলো ভাবার বয়স সেটি নয়। মুন্সীগঞ্জে বাড়ির পাশে মাঠ ছিল, সেখানে মনের আনন্দে খেলেছি। আব্বা মৌলভী জুলফিকার আলী ছিলেন উকিল। আমাদের মূল বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে, তবে ওকালতি করার জন্য আব্বা চলে আসেন মুন্সীগঞ্জ। আম্মা আমেনা বানু পুরোপুরি গৃহিণী। আমাদের সাত ভাই, দুই বোনের মধ্যে আমি তিন নম্বরে। বাবা-চাচারা খেলাধুলা করতেন। ছোটচাচা সাদিরুজ্জামান ফুটবল খেলতেন খুব ভালো। ওনার ছবি মুন্সীগঞ্জ হাইস্কুলে এখনো আছে। তো ছোটবেলায় ফুটবলে আমি স্কুল দলেই সুযোগ পেতাম না। কিন্তু ক্রিকেটে ক্লাস সেভেন থেকেই সুযোগ পাই মুন্সীগঞ্জ একাদশে। খেলাধুলায় আমার আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল হয়তো আব্বার সঙ্গে রেডিওতে কমেন্ট্রি শোনা। তখন আমাদের বাসায় রেডিও ছিল না। অনেক দূরে দূরে আব্বার সঙ্গে গিয়ে কমেন্ট্রি শুনতাম। খেলায় ঝোঁক হওয়ার সেটিও হয়তো কারণ।

প্রশ্ন : ঢাকার ক্লাব ফুটবলে যাত্রা শুরু কিভাবে?

নওশের : আমার শখ ছিল ডাক্তার হওয়ার। সিলেট মেডিক্যালে পরীক্ষা দিলাম, সুযোগ পেলাম না। সিলেট থেকে ঢাকা ফিরে উঠি সাইন্সল্যাবে বড় বোন রোকেয়া আহমেদের বাসায়। সেখান থেকে আগে গুলিস্তানে এসে বিআরটিসি বাসে নারায়ণগঞ্জ, এরপর লঞ্চে মুন্সীগঞ্জ—এভাবে ফিরতাম বাড়িতে। সেদিন গুলিস্তানে এসে দেখি আউটার স্টেডিয়ামে খুব ভিড়। কারণ ফুটবল খেলা হচ্ছে। আজাদ বয়েজ ক্লাবের একজন সংগঠক ছিলেন মুশতাক ভাই, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন—তিনি আমাকে দেখলেন ভিড়ের মধ্যে। মুন্সীগঞ্জ মাঠে উনি আমার খেলা দেখেছিলেন। সেদিন আউটার স্টেডিয়ামে আমাকে দেখে মুশতাক ভাই বললেন, ‘এই ছেলে, তুমি ট্রায়াল দিবা?’ আমি বলি, ‘কিসের ট্রায়াল?’ উনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান জুনিয়র দলের জন্য?’ আমি তো রাজি। উনি আমাকে ধরে নিয়ে গেলেন আজাদ বয়েজ ক্লাবে। দিলেন ক্লাবের ১০ নম্বর কালো জার্সি, এক জোড়া বুট ও মোজা। সেগুলো নিয়ে চলে যাই ট্রায়ালে। কোচ সাহেব আলী ভাই আমাকে পছন্দ করলেন। প্র্যাকটিস শেষে ফিরলাম বড় বোনের বাসায়। ঘটনা খুলে বলি তাদের। আমার দুলাভাই আহমেদুল্লাহ খুশি খুব। উনি খেলাধুলা পছন্দ করতেন। স্টেডিয়ামে আমার প্রতিটি খেলা দেখেছেন। ঢাকার মাঠে শেষদিকে আমি ক্রিকেট খেলেছি কেবল এই দুলাভাইয়ের জন্য। যাই হোক, ট্রায়াল থেকে মূল দলে সুযোগ পাওয়ায় দুই মাস ক্যাম্প করি স্টেডিয়ামে। এর মধ্যে আবার সুযোগ পেয়ে যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুয়োলজিতে। দুটি ঘটনা মিলে যাওয়ায় থেকে যাই ঢাকা। সময়টা ১৯৬৭ সাল।

প্রশ্ন : প্রথম ক্লাব?

নওশের : রেলওয়ে ক্লাব। যদিও সেখানে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ আমাকে দেওয়া হয়নি। পরে ওয়ারীর জামিল আখতার আমাকে ধরে নিয়ে যায় ওদের ক্লাবে। পরদিন প্র্যাকটিস দেখে কোচ গদা ভাই, কর্মকর্তা হাশিম ভাই আমাকে পছন্দ করলেন। আমি গিয়ে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে আসি রেলওয়ে থেকে। আর ঢাকার মাঠে প্রথম যেদিন মাঠে নামি, ইস্ট এন্ডের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে একাই করি দুই গোল। তখন আমি খেলি লেফট আউটে।

প্রশ্ন : ওয়ারীতে থাকলেন কত দিন?

নওশের : এক মৌসুম। ফায়ার সার্ভিসের ডিরেক্টর সিদ্দিকুর রহমান ছিলেন মুন্সীগঞ্জের লোক। হাশিম ভাইকে বলে ১৯৬৯ সালে তাঁর দলে নিয়ে যান আমাকে। ওয়ারীতে বোধ হয় আড়াই শ-তিন শ টাকা দিয়েছে। আর ফায়ার সার্ভিস মাসে মাসে দিয়েছে ভার্সিটিতে পড়ার খরচটা। ১৯৭০ সালে এলাম ভিক্টোরিয়াতে। এটি ছিল বাঙালিদের দল। এনায়েত, আমি, পেয়ারু, মামুন, আলতাফ, খোকনরা মিলে চতুর্থ করাই ভিক্টোরিয়াকে। এরপর যুদ্ধ লেগে গেল। যুদ্ধের পর তিন মৌসুম খেলি ওয়াপদাতে। এই ক্লাবে এসেই লেফট আউট থেকে আমি স্ট্রাইকার হয়ে যাই। কোচ স্যান্ডি বদলে দেন আমার পজিশন। সেটি ভুল হয়নি। ১৯৭২ সালে অসমাপ্ত লিগে সাত ম্যাচে ১৬ গোল করে আমি ছিলাম সর্বোচ্চ স্কোরার। আমার পরে ছিল বড় নাজির, তাঁর গোল আমার অর্ধেক—আট গোল। এরপর ১৯৭৫ সালে মোহামেডানে আসি। তিন মৌসুম খেলার পর ওয়ান্ডারার্সে ১৯৭৮ সালে। সেই ক্লাবেই ১৯৮০ সালে নিই অবসর।

প্রশ্ন : স্বপ্নের ক্লাব মোহামেডানে খেলার প্রস্তাব প্রথম পান কবে?

নওশের : ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ওয়াপদার ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের এত আদর করতেন যে, কিছুতেই ছাড়েননি। পরেরবার চলে যাব, কিন্তু সেবার ওয়াপদাতে এলো এনায়েত। ও তো আমার খুব বন্ধু। বলল, ‘দোস্ত, তুই যাইস না। আমি এসেছি। আয়, সবাই মিলে ভালো একটা দল করি।’ দলটা সত্যি দারুণ হয়েছিল। প্রথম লেগে আমরাই ছিলাম এক নম্বরে। সুপার লিগে গিয়ে দলের অন্তঃকোন্দলের কারণে আর চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। ১৯৭৫ সালে মোহামেডানে গেলাম। সর্বোচ্চ স্কোরার হলাম, দল চ্যাম্পিয়ন হলো— আর কী চাই!

প্রশ্ন : আপনার অন্য দুই ভাই শরীফ-আরিফও তো খেলেছেন ঢাকার মাঠে?

নওশের : আরো দুই ভাই বলছেন কী, আমরা মোট পাঁচ ভাই খেলেছি। আমি ফায়ার সার্ভিসে খেলার সময় শরীফকে নিয়ে আসি। ও খুব বুদ্ধিমান মিডফিল্ডার ছিল। ১৯৭৬ সালে মোহামেডানে থাকার সময় বিজি প্রেসের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও করেছে। আরিফ ছিল গোলরক্ষক। আশরাফ খেলেছে দিশকুশাতে। মামুন ভিক্টোরিয়াতে। ঢাকার মাঠে আর কোনো পরিবারের পাঁচ ভাই ফুটবল খেলেছে কি না—আমার জানা নেই। আর পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ১৯৭৬ সালে নওশের-শরীফ-আরিফ এই তিনজন একসঙ্গে খেলি মোহামেডানে।

প্রশ্ন : ক্লাব ফুটবলে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পেয়েছেন কত?

নওশের : ওয়ান্ডারার্সে ৩০ হাজার। মোহামেডানে ২৫ হাজার পেয়েছি।

প্রশ্ন : জাতীয় দলে খেলেছেন কোন সময়টায়?

নওশের : প্রথম জাতীয় দল থেকেই তো ছিলাম। ১৯৭২ সালে ঢাকা একাদশ নাম নিয়ে গৌহাটিতে বরদুলাই ট্রফি খেলতে যাই। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৫ সালের মারদেকায় খেলেছি। ১৯৭৬ সালে পা ভেঙে যাওয়ার পর জাতীয় দলে আর খেলা হয়নি। ’৭২-র বরদুলাই ট্রফিতে ইস্টবেঙ্গলের কাছে হেরে রানার্স-আপ হই আমরা। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা আমি, কিন্তু ওই লম্বা হিপ্পি চুল আর খেলার স্টাইলের কারণে নাম হলো বেশি সালাউদ্দিনের। ওদের পেপারে লেখা হয়েছে, ‘হিপ্পি সালাউদ্দিন অ্যান্ড বিজনেস লাইক নওশের, সিঙ্গার নওশের’...

প্রশ্ন : গায়ক নওশের?

নওশের : হ্যাঁ, ওখানে খেলার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের ২২টি সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। ওখানে গান গেয়েছি বলেই অমন নাম। গানের তালিম যে ছোটবেলা থেকে নিয়েছি, তা নয়। ওই গুন গুন করে গাইতে গাইতে গায়ক। ভার্সিটিতে ডিপার্টমেন্টে কেউ গানে নাম দেয় না, আমাকে লিড দিতে হলো। সেই হিসেবে জাতীয় দলেও গায়ক। শান্টু, প্রতাপদারা গলা মিলিয়েছেন অবশ্য। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘মা গো, ভাবনা কেন? আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’—গানটি তখন বেরিয়েছে মাত্র। নতুন স্বাধীন দেশের ফুটবল দলের মুখে এই গান শুনলে ভারতীয়রা খুশি হতো খুব। আর পরে তো আমি বঙ্গবন্ধুকে পর্যন্ত গান শুনিয়েছি।

প্রশ্ন : কবে?

নওশের : আমাদের জুয়োলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে এস্কাশনে বাইরে যাব। সে জন্য বিদেশি মুদ্রা দরকার। কিন্তু সে অনুমতি কিছুতেই পাই না। পরে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান কাজী জাকির হোসেন স্যারের সঙ্গে আমরা চার-পাঁচজন ছাত্র গণভবনে গেলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। প্রফেসর ইউসুফ আলী ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। উনি আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘মুজিব ভাই, এই হচ্ছে নওশের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় আর গৌহাটিতে গান গেয়ে সবাইকে পাগল করে দিয়েছে।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তুই আবার গান জানিস নাকি রে?’ আমি বললাম, ‘এই বাথরুম সিঙ্গার আর কি।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘শোন, তোরা কেন এসেছিস, তা তো জানিই। কিন্তু যদি গান না শোনাস, ফরেন কারেন্সির অনুমতি পাবি না।’ কী আর করা! হেমন্তবাবুর গানটি শোনালাম। এখনো ভাবলে গর্ব হয়, আমিই বোধ হয় একমাত্র ফুটবলার যে কিনা বঙ্গবন্ধুকে গান শোনাতে পেরেছি।

প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আর কোনো স্মৃতি?

নওশের : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সামনাসামনি যে কথা বলতে পেরেছে, সে কোনোদিন তা ভুলতে পারবে না। সবাইকে কী যে আপন করে নিতেন! আমাদের দেখতেন নিজের ছেলের মতো। ’৭৫-র মারদেকা খেলতে যাওয়ার আগে জাতীয় দল গণভবনে গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। ছবি তোলা শেষে উনি কাকে যেন বললেন, ‘ওদের জন্য নাশতা রেডি কর। আমি ওদের মাছের খেলা দেখিয়ে নিয়ে আসি।’ সবাইকে নিয়ে গেলেন লেকে। পানির মধ্যে তুড়ি বাজালেন বঙ্গবন্ধু, সব মাছ চলে এলো কাছে। শিশুর মতো খুশি হয়ে বললেন, ‘দেখ, মাছের খেলা দেখ। আমি অবসর সময়ে ওদের সঙ্গে খেলা করি।’ এই স্মৃতিটা খুব মনে আছে।

প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অংশ হলেন কিভাবে—সেটি যদি একটু বলতেন?

নওশের : যুদ্ধের শুরুতে আমি ছিলাম মুন্সীগঞ্জে। ফখরুদ্দিন চৌধুরী নামে আব্বার কলিগ এপ্রিল মাসের এক সকালে এসে বললেন, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তোদের ফুটবলারদের ডাকছে। ভারতে দল করবে, তোদের যেতে বলেছে।’ আমার বয়স তখন ১৯-২০ বছর। দেশের জন্য কিছু করার প্রবল ইচ্ছে। তো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমিও শুনলাম ঘোষণা। ভারত যাওয়ার জন্য মাথা খারাপ হয়ে গেল। পকেটে টাকা নেই কিন্তু হাতে ফেভারলুভা ঘড়ি তো আছে। ঘড়িটি ফখরুদ্দিন সাহেবকে দিয়ে বললাম, ‘কাকা, এই ঘড়ি রেখে আমাকে কিছু টাকা দিন। ভারতে যাব।’ ১০০ টাকা দিলেন। আরেক চাচার কাছ থেকে আরো এক-দুইশ টাকা নিলাম। আব্বাকে বলে চলে গেলাম ভারতে। সঙ্গে অবশ্য বড় ভাই বদিউজামান খসরু গিয়েছিলেন। পরে উনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ক্যাম্প কমান্ড্যান্ট হয়েছিলেন। দুই ভাইয়ের সঙ্গে আমার বন্ধু কামরুল, গুলজার ও চাচাতো ভাই তৌহিদুজ্জামান এই কয়েকজন মিলে নৌকায় চড়ে রওনা দিই ভারতে।

প্রশ্ন : কলকাতা নাকি আগরতলা?

নওশের : শুরুতে আগরতলায়। সেখানে কায়কোবাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। এনায়েতও আসল। সেখানে বীরেন্দ্র ক্লাব নামে একটি দলে লিগে খেলা শুরু করলাম। ওদের বানিয়ে দিলাম লিগ চ্যাম্পিয়ন; এনায়েত আর আমি হয়ে গেলাম হিরো। এর মধ্যে আমরা ‘জয় বাংলা একাদশ’ নামে একটি দল করে ম্যাচ খেললাম। পরে প্রতাপদারা এসে আমাদের নিয়ে যান কলকাতা। সেখানে খেলা শুরু করি ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ নাম নিয়ে। প্রতিটি ম্যাচের আগে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আমরা পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করি। সেটি যে কী অনুভূতি ছিল—বলে বোঝানো যাবে না। কৃষ্ণনগরে প্রথম খেলার আগে বাংলাদেশ-ভারতের জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। এ নিয়ে শুরুতে ওখানকার ডিসির আপত্তি ছিল, কেননা ভারত তো তখনো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু আমরা বললাম, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত না গাওয়া হলে খেলব না। পরে ঠিকই তা গাওয়া হয়।

প্রশ্ন : আপনার স্মরণীয় কিছু খেলার কথা যদি একটু বলেন?

নওশের : প্রথমত বলব, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি মুহূর্ত স্মরণীয়। ’৭৫ সালে আবাহনীর বিপক্ষে মোহামেডানের ওই ম্যাচটির কথা বলতেই হবে। ১৯৭০ সালে ভিক্টোরিয়ায় থাকতে আমার গোলে মোহামেডানকে ১-০ গোল হারিয়েছি। সেটিও মনে রাখার মতো। মোহামেডানের জার্সিতে প্রথম ম্যাচ খেলেছি দিলকুশার বিপক্ষে। সেখানে দলের ৬-০ গোলের জয়ে পাঁচ গোলই আমার। ওই দিনটি ভোলার মতো না। ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে ব্যাকভলির গোলও যেমন। পরাজিত এক ম্যাচের কথাও বলতে চাই। ১৯৬৯ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলছিলাম চট্টগ্রামের হয়ে ঢাকার বিপক্ষে। সেখানে দুর্দান্ত দুটি গোল করেছি আমি। কিন্তু রেফারি ননী বসাক দুটি পেনাল্টি দিয়ে আমাদের হারিয়ে দেয় ২-৩ ব্যবধানে। আর জাতীয় দলের হয়ে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নাম দিয়ে প্রথম খেলি ১৯৭৩ সালের মারদেকায়। খারাপ খেলিনি কিন্তু জিততে পারিনি কোনো ম্যাচ। মালয়েশিয়া থেকে ফেরার পথে সিঙ্গাপুরে প্রীতি ম্যাচ খেলি আমরা। সেখানে ওদের জাতীয় দলের বিপক্ষে জিতি ১-০ গোলে। গোলটি আমার দেওয়া। বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক জয়ে গোল করার গর্বে এখনো বুক ফুলে ওঠে।

প্রশ্ন : যাদের বিপক্ষে খেলেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ডিফেন্ডার মনে হয়েছে কাকে?

নওশের : অমন কঠিন তো কাউকে লাগেনি। সবচেয়ে ভালো স্টপার বলতে পারি ছোট নাজিরকে। ওর গতি ছিল দারুণ; বিট করলেও পরে কিভাবে যেন কাভার করে ফেলত। আরেক কঠিন ডিফেন্ডার আইনুল ভাই। কোনো বাছবিচার নেই, ব্যাকরণ নেই— দ্রিম করে মেরে দিত। ওই মারের জন্য আইনুল ভাইয়ের বিপক্ষে খেলতে ভয়ই লাগত।

প্রশ্ন : শেষ দিকে এসে একটু ক্রিকেটের কথা জানতে চাই। ক্লাস সেভেনে থাকতেই মুন্সীগঞ্জ একাদশে খেলার কথা বলেছেন শুরুতে। ঢাকায় প্রথম খেলেন কোন ক্লাবে?

নওশের : ১৯৭৪ সালে টাউন ক্লাবে। নূর হোসেন স্যারের ক্লাব ছিল সেটি। ফুটবলের অফ সিজনে ক্রিকেট হতো তো। টাউন ক্লাবে খেলতে গিয়ে দেখি, ওদের খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হয়ে উঠলাম। আমার চোখ ছিল খুব ভালো, ব্যাটিং করতাম সোজা ব্যাটে। সঙ্গে অফ স্পিন বোলিং। অলরাউন্ডার হিসেবে ঢাকার মাঠে অনেক রান করেছি, অনেক উইকেট পেয়েছি। 

প্রশ্ন : মোহামেডানেও তো খেলেছেন?

নওশের : হ্যাঁ। ’৭৫ সালে মোহামেডানে এলাম। ফুটবল মৌসুম শেষেও আমি ক্লাবে থাকি। তখন ক্রিকেট মৌসুম শুরু হবে। দলিল ভাইকে বলে ক্লিয়ারেন্স ফর্ম নিয়ে ওদের সঙ্গে শুরু করি অনুশীলন। লিগে খেলা শুরু করি কিন্তু ব্যাটিং আর পাই না। কিভাবে পেলাম, তা-ও এক গল্প। শুক্রবার খেলা ওয়ান্ডারার্সের সঙ্গে। ওরা অল্প রানে অলআউট, আমরা তো হেসেখেলে জিতব। আমি আর টিপু ভাই তখন গুলিস্তান হলে যাব ম্যাটিনি শোতে সিনেমা দেখতে। পোশাক পরে তৈরী হয়ে এসে স্টেডিয়ামে আরেকবার উঁকি দিয়ে দেখি, মোহামেডানের অবস্থা খারাপ। ছয় উইকেট নেই। তাড়াতাড়ি আবার ফিরে যাই ক্লাবে। প্রতাপদা আমাকে প্যাড পরিয়ে দিলেন। সেখান থেকে মাঠে এসে ব্যাটিং করে দলকে জিতিয়ে দিই। ১৯৭৬ সালের স্বাধীনতা কাপ ফাইনালের কথাও মনে পড়ছে। বৃষ্টির জন্য প্রথম দিন খেলা শেষ হয়নি, পরের দিনে গড়াল। সেদিনও শেষের দিকে নেমে মোহামেডানকে জেতালাম। পরে তো আমি মোহামেডানে রকিবুল হাসানের সঙ্গে ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছি। বিমানের বিপক্ষে ওপেনার হিসেবে নেমে পুরো ইনিংস ব্যাটিং করে অপরাজিত থাকি ৬৯ রানে। সেঞ্চুরি হতো কিন্তু কাভারে রবিন এমন ফিল্ডিং করল যে তা হয়নি। এই সেদিনও দেখা হওয়ার পর রবিনকে বলেছি, ‘আমার একটি সেঞ্চুরি হতো, কিন্তু তোমার কারণে হয়নি।’

প্রশ্ন : ফুটবল ছাড়ার পরও তো অনেক দিন ক্রিকেট খেলেছেন?

নওশের : ফুটবল ছেড়েছি ১৯৮০ সালে। ক্রিকেট খেলেছি ১৯৯০ পর্যন্ত। ওই যে আগেই বললাম না, শেষ দিকে শুধু দুলাভাইয়ের জন্য খেলে গিয়েছি। মোহামেডান ছাড়া ওয়ান্ডারার্স-ভিক্টোরিয়ায় খেলেছি। আর শেষ সাত বছর কলাবাগানে; এর মধ্যে পাঁচ বছরই ছিলাম অধিনায়ক। আমার একটি তৃপ্তি আছে, স্বাধীনতার পর মোহামেডান ফুটবল ও ক্রিকেট লিগে প্রথম যেবার চ্যাম্পিয়ন হয়, আমি ছিলাম সেই দলের অংশ। ১৯৭৫ সালে ফুটবল ও ১৯৭৮ সালে ক্রিকেট। ক্রিকেট খেলে মোহামেডানে কোনো টাকা পাইনি। তবে দল যখন চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে ছোট্ট একটি টেলিভিশন কিনে দিয়েছিল।

প্রশ্ন : ফুটবল ছাড়ার পর কোচ কিংবা অন্য কোনো ভূমিকায় থাকার ইচ্ছা হয়নি?

নওশের : না। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে আমি বিয়ে করলাম তো। বিয়েটা একটু দেরিতেই হয়েছে, যে কারণে ফুটবল আর চালিয়ে যাইনি। এক বছর খেলে নিয়ে নিই অবসর। আর ফুটবলে পরে ২০০৩ সালে বাফুফেতে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলাম। এই বছর করলাম সদস্য পদে। কিন্তু এখানে এত ঘোরপ্যাঁচ যে, জিতে বেরিয়ে আসা যায় না।

প্রশ্ন : পরিবারের কথা একটু জানতে চাই।

নওশের : আমার স্ত্রীর নাম জাফরিন জামান। আমার এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে সিমিন নূর জামান গ্র্যাজুয়েশন করার পর এখন বিয়ে করে গৃহিণী। ছেলে মইনুজ্জামান এবার ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা দিচ্ছে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

নওশের : তৃপ্তির শেষ নেই। খেলোয়াড় হিসেবেই পেয়েছি জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান। জাতীয় দলে খেলেছি, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলেছি, মোহামেডানে খেলেছি, লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্লু হয়েছি—এগুলো জীবনের বড় প্রাপ্তি। তবে মনটা খারাপ হয়ে যায় জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের কথা ভাবলে। আমার চেয়ে কত কম যোগ্যরা এই পুরস্কার পেয়েছেন, আমার কথা মনে পড়েনি কারো। এ ছাড়া আমাদের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এটিও বোধ হয় দেওয়া উচিত ছিল।

 

মন্তব্য