kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

আর উড়বে না প্রজাপতি

সামীউর রহমান   

১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আর উড়বে না প্রজাপতি

কথা বলতে গেলে জড়িয়ে যেত। বিদ্যুতের মতো দ্রুতগতিতে চলা হাতগুলোতে ভর করেছিল কাঁপুনি। জনসম্মুখে আসাটা তাই কমিয়ে দিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী। সবশেষ সামনে এসেছিলেন এপ্রিলে, পারকিনসনস রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসার তহবিল গঠনের জন্য একটি দাতব্য নৈশভোজের অনুষ্ঠানে। হুইলচেয়ারে বসা। দেখে বোঝার উপায় নেই, বক্সিং রিংয়ের ভেতর এই মানুষটারই চলাফেরা ছিল বিদ্যুতের মতো দ্রুত। বেশির ভাগ সময় নির্বাক বসে থাকা মানুষটাই প্রতিপক্ষকে যেমন লড়াইয়ের আগে কথার বাণে বিদ্ধ করতেন, যার বক্সিংয়ের দর্শনটাই ছিল ‘প্রজাপতির মতো ভেসে বেড়াও আর মৌমাছির মতো হুল ফোটাও’। কেভহিলের কবরে শুয়ে থাকা মোহাম্মদ আলীকে গোটা বিশ্ব মনে রাখবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করা, কালোদের অধিকার আদায়ে লড়াইয়ের সংগ্রামী চেহারা হিসেবেও। তবে ‘গ্রেটেস্ট’ তো তিনি হয়েছিলেন মুঠোর জোরেই।

যখন বড় হয়ে উঠছেন আলী, তখনো মার্কিন সমাজে বর্ণবাদ প্রকট। আলীর মায়ের বর্ণনায়ই শোনা যায়, একবার এক দোকানি পানিটা পর্যন্ত খেতে দিতে চায়নি ছোট্ট ক্যাসিয়াসকে। কারণ তার গায়ের রং যে কালো! অভাবের সংসারে ১২ বছর বয়সের এক কিশোর বিনা পয়সার চকোলেট আর লেমোনেডের লোভে গেল শহরের এক মেলায়। সেখানেই চুরি হয়ে গেল ছেলেটার সাইকেল। পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গিয়ে বলেছিল, ‘চোরটাকে ধরতে পারলে চাবকাব।’ বক্সিংপ্রেমী সেই পুলিশ কর্মকর্তা জো মার্টিনের উত্তর ছিল, ‘তার আগে ঘুষিটা মারতে শেখো।’ লুইসভিলের সেই ছেলে ঘুষি মারা শিখেছিল বটে!  কেন্টাকির গোল্ডেন গ্লাভস শিরোপা জেতেন ছয়বার, অপেশাদার বক্সিং প্রতিযোগিতায় জাতীয় চ্যামিপয়ন। এসব সাফল্য তাঁকে জায়গা করে দিল রোম অলিমিপকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দলে। লাইট হেভিওয়েট ওজনশ্রেণিতে লড়বেন সে সময়কার ক্যাসিয়াস ক্লে। চার বছর আগে, মেলবোর্ন অলিমিপকে মিডলওয়েটে সোনা জেতা গেনাডি শাটকভ কোয়ার্টার ফাইনালে আলীর কাছে হারলেন ৫-০তে। এরপর সেমিফাইনালে কমনওয়েলথ গেমসের সোনাজয়ী অস্ট্রেলিয়ান বক্সার অ্যান্থনি ম্যাডিগানও হারলেন একই ব্যবধানে। সোনা জয়ের লড়াইয়ে পোল্যান্ডের জেগ্নেই পিয়েত্রিকোস্কিও ৫-০তে হার মানলেন লুইসভিলের ছেলের কাছে। একই বছর অপেশাদার বক্সার থেকে পেশাদার বক্সার হলেন আলী। পরের তিনটা বছর ১৯টা লড়াইতে কেউ তাঁকে হারাতে পারেনি, যার ১৫টাতেই প্রতিপক্ষকে নকআউট করেন ‘দ্যা গ্রেটেস্ট’।

সনি লিস্টনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপার দাবি তোলেন আলী। লিস্টন তখন আতঙ্কের অন্য নাম। ছোটবেলায় বাবার অত্যাচার তাঁর মনটাকে করে তুলেছিল কঠোর। অপরাধীদের দলে যোগ দিয়ে একসময় নিজেই একটা ছিনতাই ও ডাকাতির দল গড়ে তুলেছিলেন লিস্টন। পুলিশের খাতায় তাঁর নাম ছিল ‘হলুদ শার্ট পরা ডাকাত’। ধরা পড়ার পর জেল হলে জেলখানাতেই বক্সিং শেখেন লিস্টন। এরপর নাম লেখান পেশাদারি বক্সিংয়ে। এমন একজনের প্রতিপক্ষ আলী, লিস্টনের তুলনায় আকারে অনেক ছোটখাটো। বাজির দর তাই লিস্টনের পক্ষে।  ফ্লয়েড প্যাটারসনকে ২ রাউন্ডেই নকআউট করে দেওয়া লিস্টনের সঙ্গে আলীর লড়াইটা তো ডেভিড আর গোলিয়াথেরই! মিয়ামিতে সেই লড়াইতে প্রজাপতির মতো নেচে নেচেই লিস্টনের বুনো মহিষের মতো তেড়ে আসা আক্রমণগুলো ঠেকালেন আলী। সুযোগ বুঝে পালটা এমন একটা মার বসালেন যে লিস্টনের চোখের কোণে কেটে গেল। লিস্টনের ক্যারিয়ারে মার খেয়ে ক্ষত হওয়া ওটাই প্রথম। কেউ কেউ বলে, এরপর লিস্টনের দস্তানায় বিষাক্ত মলম লাগিয়ে দেয় তার লোকজন, যার আঘাতে আলী চোখে কম দেখতে শুরু করেন। একপর্যায়ে রক্ত আর ঘাম ধুয়ে দেয় সেই বিষ, কমে আসে জ্বলুনি। ছয় নম্বর রাউন্ডে লিস্টন বেদম মার খান আলীর কাছে। সপ্তম রাউন্ডের বেল বাজার পর লিস্টন আর উঠে দাঁড়াননি। কাঁধের আঘাত নিয়ে টেকনিক্যাল নকআউট! এমনটাই ছিলেন আলী।

২৫ থেকে ২৭, একজন বক্সারের সবচেয়ে সোনালি সময়টাতেই তিনি রিংয়ে নামতে পারেননি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তাঁর লাইসেন্স। তার পরও তিনবার বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যামিপয়ন হওয়ার কৃতিত্ব ছাপিয়ে আলী নিজেকে বক্সার হিসেবে স্মরণীয় করে রেখেছেন তাঁর লড়াইয়ের কৌশল আর লড়াইয়ের আগে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথার লড়াই দিয়ে। সহজাত বক্সার ছিলেন আলী। গতি ছিল বিদ্যুতের মতো। বিশাল পেশিবহুল শরীর ছিল না, ছিল না বিরাট পাঞ্জা। হেভিওয়েট বক্সিংয়ের সঙ্গে তাঁর কৌশল ছিল অনেকটাই বেমানান। আসলে আলী নিজেই একটা কৌশল তৈরি করে নিয়েছিলেন, যেটাকে বলতেন ‘ফ্লোট লাইক আ বাটারফ্লাই, স্টিং লাইক আ বি’। দুর্দান্ত গতি, অসাধারণ রিফ্লেক্স আর অবিশ্বাস্য লেফট জ্যাবে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিতেন আলী। মাইক টাইসনেরও ম্যানেজার থাকা জিমি জ্যাকবস প্রযুক্তির সাহায্যে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন আলীর ঘুষির গতি, ফলাফল চোখ কপালে তোলার মতো! জ্যাকবস জানিয়েছেন, ‘আলীর প্রতিপক্ষ জানত যে সে দ্রুত, কিন্তু রিংয়ে নামার আগ পর্যন্ত বুঝতে পারত না সে আসলে কতটা দ্রুত।’ আলীর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁর সঙ্গে লড়া চার্লি পাওয়েল বলেছিলেন, ‘প্রথম ঘুষিটা খাবার পর ভেবেছিলাম, এ রকম দুটি মারলে আমিও তো একটা মারতে পারব। কিন্তু আমি একের পর এক ঘুষি খেয়েই গেলাম, আর আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। আসলে মারগুলো কতটা জোরে লাগে, সেটা বুঝে ওঠার আগেই সে অনেকগুলো ঘুষি মেরে বসবে।’ আরেক বক্সার ফ্লয়েড প্যাটারসন বলেছিলেন, ‘চলন্ত কোনো কিছুতে আঘাত করা কঠিন। আলী রিংয়ের ভেতর শুধু ছুটতেই থাকত। ’ আলীর বায়োপিকের জন্য   উইল স্মিথকে অনুশীলন করাতেন ড্যারেল ফস্টার। তিনিই বলেছিলেন, ‘আলীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মারটা ছিল বাঁ হাতের জ্যাব। সেটাই সে কমপক্ষে ছয়ভাবে মারতে পারত। একটা জ্যাব ছিল গোখরা সাপের ছোবল দেওয়ার মতো। আলী এত দ্রুত বাঁ হাতে চার-পাঁচটা জ্যাব মেরে প্রতিপক্ষের দৃষ্টি ঘোলাটে করে দিত যে টেরই পেত না ডান হাতে নকআউট পাঞ্চটা ধেয়ে আসছে।’ সনি লিস্টনের সঙ্গে দ্বিতীয় লড়াইয়ে আলী যেভাবে নকআউট করেন, সেটা খালি চোখে দেখে অনেকেই বুঝতে পারেননি ঘুষিটা কোথা থেকে এলো! স্লো মোশনে দেখা যায়, কিভাবে লিস্টনের অরক্ষিত চোয়ালে ধেয়ে এসেছে আলীর পাঞ্চ। মার্শাল মেকানিকস নামের একটি বইতে লেখক বিভিন্ন রকম লড়াইয়ের কৌশল নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। তিনিই দেখিয়েছেন আলীর একটা ঘুষির ওজন ১০০০ পাউন্ড!

মানবতার পক্ষে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, শান্তির পক্ষে কথা তো অনেকেই বলেছেন। কিন্তু বক্সিং রিংয়ের ভেতর অমন ‘গ্রেটনেস’ আর কে দেখাতে পেরেছেন? আক্রমণের বৈচিত্র্য, সুপার স্পিড, কৌশল—সব কিছু মিলিয়ে শুধু বক্সার হিসেবেই তো আলী ‘গ্রেটেস্ট’। বাকি বিষয়গুলো তাঁকে করে তুলেছে আরো অতুলনীয়।

মন্তব্য