kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

ইউরো রোমাঞ্চ

খালিদ রাজ   

১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইউরো রোমাঞ্চ

বল

১৯৬৮ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত খেলা হয়েছে টেলস্টার বলে। এরপর ট্যাঙ্গো যুগ। ১৯৮০ সালে ট্যাঙ্গো ইতালিয়া, ১৯৮৪ ট্যাঙ্গো মুন্দিয়াল, ১৯৮৮ ট্যাঙ্গো ইউরোপা, ১৯৯২ এত্রুস্কো ইউনিকো, ১৯৯৬ কোয়েস্ত্রো ইউরোপা, ২০০০ টেরেস্ট্রা সিলভারস্ট্রিম, ২০০৪ রোতেইরো, ২০০৮ ইউরোপাস আর ২০১২ সালের ট্যাঙ্গো ১২-এর পর এবার খেলা হবে বুঁ জ্য বলে।

মাসকট

মাসকট চালু হয় ১৯৮০ থেকে। ১৯৮০ সালের মাসকট পিনোচ্চিও, ১৯৮৪ পেনো, ১৯৮৮ বার্নি, ১৯৯২ র‌্যাবিট, ১৯৯৬ গোলিয়াথ, ২০০০ বেনেলাকি, ২০০৪ কিনাস, ২০০৮ ট্রিক্স অ্যান্ড ফ্লিক্স, ২০১২ স্লাভেক অ্যান্ড স্লাভকোর পর এবারের মাসকটের নাম সুপার ভিক্তর।

 

বিশ্বকাপের পর ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিচারে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল মহাযজ্ঞের চেয়েও বেশি উত্তেজনাপূর্ণ। ইউরোপের সেরা দলগুলোই যে প্রতিযোগিতা করে মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে। বিশ্বকাপ ট্রফি ইউরোপ ও লাতিন অঞ্চলের বাইরে যায়নি কখনো। লাতিন অঞ্চলে যেহেতু মাত্র ১০টি দল, আর আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের দাপটের মঞ্চ, সেই হিসাবে ইউরোপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি। শিরোপা জয়ে নির্দিষ্ট কোনো দলকে আগে থেকে পরিষ্কার ফেভারিট মানা কঠিন। রোমাঞ্চ ও উত্তেজনায় ভরা সেই ইউরো চার বছর পর আবার আসছে ফুটবলবিশ্বকে মাতাতে। আজ থেকে বিশ্ব কাঁপবে ইউরো জ্বরে। টুর্নামেন্টটির ১৫তম আসর নিয়ে প্রস্তুত এবার ফ্রান্স।

৫৬ বছর আগে ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের এ লড়াই শুরু হয়েছিল এই ফ্রান্সেই। ১৯৬০ সালে প্রথমবার মূল পর্বের আয়োজন হয়েছিল চার দল নিয়ে। বাছাই পর্ব পেরিয়ে আসা দলগুলো সরাসরি খেলেছিল সেমিফাইনাল। শেষ চার ও ফাইনালের বাধা পেরিয়ে প্রথমবার ইউরো জয়ের কীর্তি গড়েছিল তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরের বারের আয়োজক স্পেন। সেবারও মূল পর্বে খেলা চার দলের লড়াইয়ে শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা উড়িয়েছিল স্পেন। ১৯৭৬ সালে যুগোস্লাভিয়ার আসর পর্যন্ত টুর্নামেন্টের মূল পর্বের দল ছিল চারটি। তবে চার বছর পর ইতালির আসর থেকে সংখ্যা বাড়ে আটে। ফুটবলবিশ্বকে চমকে দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছোটা বেলজিয়াম স্বাগতিক ইতালিকে পেছনে ফেলে উঠেছিল ফাইনালে। কিন্তু পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ফাইনালে হেরে চোখের জলে শেষ হয়েছিল বেলজিয়ামের স্বপ্নযাত্রা। ইতালি থেকে সেবার দ্বিতীয়বার ইউরো জিতে ফেরে জার্মানরা।

ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্ব তো বটেই, বাছাইয়ের উত্তেজনাও অন্য রকম। মূল পর্বে চার থেকে আট দলের ওঠার সুযোগ থাকলেও ইউরোপের ফুটবল কাঠামো ও দলগুলোর শক্তি-সামর্থ্যের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। ফেভারিট হলেও দেখা গেছে, অনেক দল মূল পর্বে যাওয়ার টিকিটটাই নিশ্চিত করতে পারেনি। আসল লড়াইয়ে তাই দল বাড়ানোর অনুরোধ ভক্তদের সব সময়েরই। ১৯৯২ সালে সুইডেনের আসর থেকে তাই বাড়ে আরো আট দল, সব মিলিয়ে ইউরোর জমজমাট লড়াই ২০১২ পর্যন্ত ছিল ১৬ দলের। এবার বেড়েছে আরো আট দল, মানে ফ্রান্সের টুর্নামেন্ট দিয়েই বিশ্বকাপের পর ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর শুরু হচ্ছে ২৪ দল নিয়ে।

এবার দিয়ে তৃতীয়বার ইউরোর আয়োজক ফ্রান্স। শুরুর ওই আসরের পর ১৯৮৪ সালেও ইউরোপ সেরার আসর বসেছিল ফ্রান্সে, মিশেল প্লাতিনির দল যেবার প্রথম শিরোপাও জিতেছিল ঘরের মাঠের টুর্নামেন্ট থেকে। ইউরোর সর্বোচ্চ আয়োজকও ফ্রান্স। সবচেয়ে সফল দল অবশ্য ফরাসিরা নয়, ২০০০ সালে বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডসের আসর থেকে ফ্রান্স নিজেদের দ্বিতীয় শিরোপা জিতলেও তাদের চেয়ে এগিয়ে জার্মানি ও স্পেন। পশ্চিম জার্মানি হিসেবে দুইবার, আর বার্লিনের দেয়াল ভেঙে দুই জার্মানি এক হওয়ার পর জিতেছে আরো একবার—সব মিলিয়ে তিনবার। স্পেনও গতবার ছুঁয়ে ফেলেছে তাদের। পোল্যান্ড-ইউক্রেনের আসর থেকে ‘লা রোজা’ জিতেছে তৃতীয় শিরোপা। একটা জায়গায় অবশ্য তারা জার্মানিকেও ছাড়িয়ে। স্পেনই একমাত্র দল, যারা টানা দুইবার জিতেছে ইউরো। ২০০৮ সালে অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ডের আসর থেকেও শিরোপা জিতে ফিরেছিল ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

এবার তাই চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফ্রান্সে নামতে যাচ্ছে স্পেন। সামনে হ্যাটট্রিক শিরোপার হাতছানি। যদিও তাদের খুব একটা সম্ভাবনা দেখছিলেন না ফুটবল বিশ্লেষকরা। বাছাই পর্বে নিজেদের গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূল পর্ব নিশ্চিত করলেও পারফরম্যান্স দিয়ে মন ভরাতে পারেনি ভিসেন্তে দেল বোস্কের শিষ্যরা খোদ নিজেদের সমর্থকদেরই। অবশ্য ইউরো শুরুর আগমুহূর্তে ‘লা রোজা’ ফিরেছে চেনা ছন্দে। প্রীতি ম্যাচে প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে গোলোৎসব করেই পা রাখতে যাচ্ছে ফ্রান্সে। দেল বোস্কে তো টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফেভারিট ঘোষণা করেছেন নিজেদেরই। এবার কথাটা মূল মঞ্চে প্রমাণের পালা।

স্পেন নামবে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে, আর জার্মানি পা রাখবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তকমা গায়ে সেঁটে। ১৯৯৬ সালের পর আর শিরোপা ওঠেনি জার্মানির ঘরে। ২০০৮ সালে ফাইনালে উঠেও হারতে হয়েছিল স্পেনের কাছে। এবার তাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার সঙ্গে আগের টুর্নামেন্টের হতাশা কাটানোর ব্যাপারও রয়েছে জার্মানদের। বিশ্বকাপের পর দলের বেশ কয়েকজন সেরা খেলোয়াড়ের অবসরে এলোমেলো হয়ে যাওয়া জার্মানি গত কিছুদিনে গুছিয়ে নিয়েছে নিজেদের। এখন শুধু মূল পর্বে নামার অপেক্ষায়।

ইউরো জয়ের সম্ভাবনায় স্পেন-জার্মানি থেকেও এগিয়ে রাখতে হবে ফ্রান্সকে। একে স্বাগতিক, সঙ্গে যোগ করুন গত কিছুদিনের পারফরম্যান্স। সর্বশেষ ১০ ম্যাচে মাত্র একটিতে হেরেছে ‘লেস ব্লুস’। জমাট রক্ষণ, শক্তিশালী মাঝমাঠ ও কার্যকর আক্রমণভাগ—টুর্নামেন্ট জিততে আর কী লাগে। যদিও অনেক দিন প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ না খেলাটা বড় ধাক্কা হয়ে আসতে পারে ফ্রান্সের ওপর। ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে জায়গার জন্য অন্য দলগুলো যেখানে নিজেদের সেরাটা ঢেলেছে, সেখানে ফরাসিরা খেলেছে প্রীতি ম্যাচ। স্বাগতিক হওয়ায় বাছাই পর্ব খেলতে হয়নি যে তাদের। যদিও ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম মনে করেন না, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের অভাব কোনো প্রভাব ফেলবে তাঁদের পারফরম্যান্সে। ঘরের মাঠের সমর্থন আছে না!

এই তিন দলের সঙ্গে ইতালিকেও রাখতে হবে ফেভারিটদের খাতায়। চারবার বিশ্বকাপ ও একবার ইউরো জিতেছে বলে নয়, গতবারের রার্নাস আপ তো ‘আজ্জুরিরা’ই। অন্যভাবে নিজেদের উপস্থাপন করা ইংল্যান্ডের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এদের সঙ্গে যোগ করতে হচ্ছে আরেকটি নাম। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এখনো কোনো টুর্নামেন্ট জিততে না পারলেও ফ্রান্সের আসরে ‘কালো ঘোড়া’ কিন্তু বেলজিয়াম। বাছাই পর্বে প্রমাণ দিয়ে আসার দলটি এখন ফিফা র্যাংকিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে। শীর্ষেও উঠেছিল কিছুদিন আগে। অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়ের মিশেলে দুর্দান্ত এই দলটির শিরোপা জেতার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই।

এই বেলজিয়াম মহাদেশের সেরা হওয়া লড়াইয়ের মঞ্চে প্রথমবার সুযোগ পেয়েছে সেই ২০০০ সালের পর। আগে এই টুর্নামেন্টে খেলেছে, ২০১৬ ইউরোতে খেলতে নামার অপেক্ষায় থাকা এমন দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় পর মূল মঞ্চে জায়গা পেয়েছে ‘রেড ডেভিলস’। ফ্রান্সের আসর দিয়ে অভিষেক হতে যাচ্ছে পাঁচ দলের। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরোর মূল পর্বে খেলার সুযোগ পেয়েছে আলবেনিয়া, আইসল্যান্ড, নর্দান আয়ারল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও ওয়েলস। এই দলগুলো যেখানে অভিষেকের অপেক্ষায়, সেখানে সবচেয়ে বেশি ১২ বার প্রতিযোগিতাটিতে নামতে যাচ্ছে জার্মানি। ১৯৭২ সাল থেকে একমাত্র দল হিসেবে এখন পর্যন্ত সব টুর্নামেন্টের মূল পর্বে খেলছে জার্মানরা। তাদের পর সবচেয়ে বেশি ৯ বার যে দলটি খেলেছে ইউরোপ সেরার লড়াইয়ে, সেই নেদারল্যান্ডস এবার সুযোগই পায়নি মূল পর্বে! আইসল্যান্ডের মতো দল ‘এ’ গ্রুপ থেকে তাদের টপকে টিকিট কেটেছে ফ্রান্সের। প্লে অফ খেলার সুযোগও পায়নি ‘দ্য অরেঞ্জ’, চতুর্থ হয়ে শেষ করেছিল বাছাই পর্ব। ইউরো ২০১৬ বাছাইয়ের সবচেয়ে বড় অঘটন ডাচদের ছিটকে যাওয়া।

যদিও মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের খবরে বেশি আলোচনায় ছিল এবারের ইউরো। সন্ত্রাসী হামলায় কেপে ওঠা ফ্রান্সে শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট হয় কি না, সে নিয়ে সংশয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। প্যারিসের স্তাদে দে ফ্রান্সের ঠিক বাইরে সন্ত্রাসী হামলায় মারা গিয়েছিল অন্তত ১৩০ জন। এই স্টেডিয়ামেই আজ ফ্রান্স-রোমানিয়ার ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে টুর্নামেন্ট। ইউরোর ফাইনালও হবে এখানে। টুর্নামেন্টের আগে মর্মান্তিক ওই হামলা, তবু ইউরোপের বাকি দলগুলো আস্থা রেখেছে ফ্রান্সের ওপর। অবশ্য শুরুর আগে আগে আবার দানা বাঁধছে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। ইউরোকেই নাকি নজরে রেখেছে সন্ত্রাসীরা। এমনকি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদও মেনে নিয়েছেন, ঝুঁকি আছে ইউরোর আয়োজনের ওপর।

মাঠের বাইরের নিরাপত্তাবিষয়ক এ লড়াই জেতাই ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবেই না সুন্দরভাবে হবে মাঠের লড়াইটা। ফুটবলপ্রেমীরা তৈরি তো?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা