kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

শিশুশ্রম ও ইসলাম

মুফতি আবদুল্লাহ নুর   

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিশুশ্রম ও ইসলাম

শিশু জীবন ও জগতের শোভা ও সৌন্দর্য। ইসলাম এই সৌন্দর্যের সযত্ন প্রতিপালনের নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।’ (সুরা : কাহফ,     আয়াত : ৪৬)

হাদিসে শিশুকে ফুল ও পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যেন মানুষ কোমলমতি শিশুদের প্রতি স্নেহপরায়ণ ও সযত্ন হয়। তার পেলব দেহ ও সংবেদনশীল মনের প্রতি সচেতন মনোযোগ দেয়। শিশুর বিকাশে অন্যতম অন্তরায় শিশুশ্রম। পৃথিবীর প্রায় ১৫২ মিলিয়ন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত। বাংলাদেশে প্রায় ১৮ লাখ শিশু শিশুশ্রমে নিযুক্ত। এদের বেশির ভাগই রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে।

শ্রম শিশুর মননশীলতা ও দৈহিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয় সে। ইসলামে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। ইসলাম শিশুর নির্বিঘ্ন বিকাশের কথা বলে। বাংলাদেশে শিশুশ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের কারণে এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করেই বিভিন্ন ধরনের পেশায় নিযুক্ত হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ঝরে পড়া শিশু ও শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কমলেও এখনো এর হার উদ্বেগজনক। শিশুশ্রম বন্ধ করা নিঃসন্দেহে সময়সাপেক্ষ। তাই শিশুশ্রম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যতটা সম্ভব শিশুর কর্মস্থল ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ করা প্রয়োজন। ইসলামও জীবনের এই বাস্তবতা স্বীকার করে। তাই কোনো শিশু যদি পারিবারিক ও সামাজিক কারণে শ্রমদানে বাধ্য হয়, ইসলাম তার সঙ্গে মমতাপূর্ণ আচরণের নির্দেশ দেয়। সাধারণভাবেই ইসলামের শ্রমনীতি অনুসারে কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেওয়া সমীচীন নয়। আর সে যদি শিশু হয় তাহলে তা করা আরো গর্হিত কাজ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ কারো ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যাতীত।’  (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)

হজরত আনাস (রা.) তাঁর শৈশবের দীর্ঘ দশ বছর রাসুল (সা.)-এর সেবায় কাটিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য হলো, ‘আমার কোনো কাজে আপত্তি করে তিনি কখনো বলেননি, এমন কেন করলে বা এমন কেন করলে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩০৯)

ইসলামের সাধারণ নির্দেশনা হলো, মাতা-পিতা ও অভিভাবকরা শিশুর প্রতি স্নেহশীল আচরণ করবে। তার জন্য কষ্টকর কিছু চাপিয়ে দেবে না। শিশুর প্রতি স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসাই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। এ জন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ছোটকে স্নেহ করে না সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩) অন্য হাদিসে এসেছে,  শিশুর সঙ্গে স্নেহশীল আচরণ না করায় তিনি এক পিতাকে ভর্ৎসনা করেন।

ইসলামী আইনজ্ঞদের মত হলো, নিতান্ত অপারগ না হলে মা-বাবা শিশু তথা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে উপার্জনে বাধ্য করবে না। পিতা সম্ভব হলে নিজে উপার্জন করবে, নতুবা ঋণ করে তাদের খরচের ব্যবস্থা করবে, যেন তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক হলেও শিক্ষা চলাকালে পিতা তাদের খরচ প্রদান করবে। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ১/৫৬১; রদ্দুল মুহতার : ৫/৩৪১)

শিশুর সুন্দর ও আনন্দময় জীবন উপহার দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব সরকারের। তবে ব্যক্তিগতভাবেও সামর্থ্যবান মুসলিমরা এই দায় এড়াতে পারে না। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) সমাজের অসহায় ও নিরাশ্রয় শিশুদের শিক্ষা ও আবাসনের ব্যবস্থা করতেন। এতিম বালক আমর ইবনে আবি সালামা (রা.) রাসুল (সা.)-এর পরিবারে সন্তানের মতো লালিত-পালিত হন। তিনি নিজে যেমন শিশুর প্রতি যত্নশীল ছিলেন, তেমনি অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করতেন। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও সুশিক্ষা দানের নির্দেশ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা শিশুদের স্নেহ করো, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো এবং সদাচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।’ (তিরমিজি)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সবই করতেন যেন পরবর্তী প্রজন্ম আদর্শ ও যোগ্য নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞান দান করো, কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট।’ (মুসলিম)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা