kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামপন্থীদের উত্থান

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামপন্থীদের উত্থান

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ইন্দোনেশিয়া। যেন মহান আল্লাহ নিজ হাতে দেশটিকে সাজিয়েছেন

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া। অনেক দ্বীপের সমষ্টিতে গড়ে ওঠা মানবেতিহাসের প্রাচীনতম জনপদ। আয়তন ১৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার। ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ৯৪০। সরকারি ভাষা বাহাসা ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু বেশির ভাগ ইন্দোনেশীয় স্থানীয় মাতৃভাষায়ই কথা বলে।

বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশের বসবাস এই দেশটিতে। মোট জনসংখ্যার ৮৮ শতাংশই মুসলমান। বিশ্বের বুকে এটিই  প্রথম সংখ্যাধিক্য মুসলমানের দেশ। সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ইন্দোনেশিয়া থেকে দুই লাখ ২১ হাজার নর-নারী হজে যান, যেখানে বাংলাদেশ থেকে যান এক লাখ ২৭ হাজার।

হিজরি দ্বিতীয় শতকের শেষভাগে ইয়েমেনের আরব ব্যবসায়ীরা নোঙর ফেলেন ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে। তাঁদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের বাণী প্রচারিত হয়। আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে আরবদের সঙ্গে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক আরো দৃঢ় হলে এই জনপদের একদল নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের সঙ্গে দেখা করেন এবং ইসলামের সুমহান বার্তা সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরেন।

হিজরি নবম শতকে পুরো অঞ্চলে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। সুলতান হারুন তুরনাথ ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্র ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে প্রতারণার মাধ্যমে হত্যা করে পর্তুগাল ইন্দোনেশিয়া দখল করে নেয়। সুলতান হারুনের হত্যার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় মুসলিম শাসনের পতন ঘটে। তবে ব্রিটিশ আর ওলন্দাজরা তাদের সাম্রাজ্য স্থাপন করলেও ধর্ম ও সংস্কৃতিতে তারা কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি।

১৫৮০ থেকে কয়েক শতাব্দীকালের ঔপনিবেশিক শাসনের পর ১৯৪৯ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ইন্দোনেশীয় স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয় এবং দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। এ সময় অনেক আন্দোলনকারীকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কারাবন্দি করা হয়, যাঁদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি সুকর্ণও ছিলেন।

১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট মিত্রশক্তির হাতে জাপানের আত্মসমর্পণের তিন দিন পর সুকর্ণ ও মোহাম্মাদ আতার নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র দল ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ইন্দোনেশিয়া প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। চার বছর যুদ্ধ ও আলাপ-আলোচনার পর ওলন্দাজরা ইন্দোনেশীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ১৯৫০ সালে ইন্দোনেশিয়া ৬০তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে।

১৯৪৯ সালে ওলন্দাজদের সঙ্গে শত্রুতার অবসানের কিছু পর ইন্দোনেশিয়া একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। ১৯৫৫ সালে দেশব্যাপী প্রথম নির্বাচনের আগে ও পরে ইন্দোনেশিয়ার সংসদ বহু দলের মধ্যে বিভক্ত ছিল এবং স্থিতিশীল কোয়ালিশন গঠন ছিল দুরূহ। তখন ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের ভূমিকা একটি বিভাজক ইস্যুতে পরিণত হয়। সুকর্ণ ‘পঞ্চশীলা’ নামের রাষ্ট্রের পাঁচ মূলনীতি অনুসারে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন। পাঁচটি মূলনীতি ছিল ধর্মীয় একত্ববাদ, মানবতাবাদ, জাতীয় ঐক্য, ঐকমত্যভিত্তিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু কিছু মুসলিম দল একটি ইসলামী রাষ্ট্র কিংবা মুসলিমদের জন্য আলাদা ইসলামী আইন প্রয়োগের পক্ষপাতী ছিল। সেই সব মুসলিম দলের সর্বাত্মক পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘ইসলাম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটারদের বড় অংশ তরুণরাই এখন রক্ষণশীল ইসলামের সমর্থক।

গতবারের নির্বাচনে অর্থাৎ ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন জোকো উইদোদো বা জোকোয়ীও দেশটিতে ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রক্ষণশীল ইসলাম ধর্মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক চাল নির্ধারণ করেই বিজয়ের মালা পরিধান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে ২০১৯ সালেও। ইসলাম রক্ষায় কে বেশি রক্ষণশীল, তাঁর লড়াই বিবেচনা করেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সাধারণ জনতা।

লেখক : মুহাদ্দিস, মারকাজু আবু হানিফা, নুরেরচালা, ঢাকা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা