kalerkantho

শুক্রবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৮। ৬ আগস্ট ২০২১। ২৬ জিলহজ ১৪৪২

অনলাইনে দুই তরুণ সফল উদ্যোক্তা

১৪ দেশে যাচ্ছে শিশির-প্রজ্ঞার কন্টেন্ট, আয় চাকরির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি

মোবারক আজাদ   

১১ জুলাই, ২০২১ ১৮:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১৪ দেশে যাচ্ছে শিশির-প্রজ্ঞার কন্টেন্ট, আয় চাকরির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। গত এক বছরে ই-কমার্স খাতে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ঈদসহ যেকোনো উত্সবে এ লেনদেন বাড়ে। বাংলাদেশে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ। এই বাড়ন্ত ফেসবুক ব্যবহারকারীরা ই-কমার্সকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতে অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে দেশে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী সফলতা অর্জন করেছে।  তাদের দুইজন হলেন  প্রজ্ঞা মজুমদার ও রায়হানুল ইসলাম শিশির। তারা আইটি প্রতিষ্ঠান writerskernel.com এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা । বর্তমানে তারা দেশ ছাড়াও বিশ্বের ১৪ টি দেশে নিয়মিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে কন্টেন্ট অর্ডার পাচ্ছেন। ফলে তারা আয়ও  করছেন সাধারণ চাকরির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা শিশির অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন ২০১৪ সালে। তখন তার পুঁজি ছিল শুধু একটা মোবাইল আর কন্টেন্ট রাইটিং এর দক্ষতা। এই ব্যবসা চলাকালীন ২০১৫ সালে তিনি লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়াং ও আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির তত্ত্বাবধানে “ডিজিটাল মার্কেটিং” এর প্রশিক্ষণ নেন। এরপর বি আই টিম এম এর তত্ত্বাবধানে “এসইও” নিয়ে প্রশিক্ষণ নেন।  
ফেসবুকে ব্যবসায়ে সফল হওয়ায় ২০১৬ সালে ফেসবুকে “অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট বাংলাদেশ” নামে একটা গ্রুপের মাধ্যমে জানতে পারেন “অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং” সম্পর্কে। শিশির বলেন, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বিষয়টা নিয়ে গ্রপের পোস্ট গুলো পড়তাম। কিন্তু অনেক কিছুই বুঝতাম না। না বুঝলে ইন্টারনেটে সার্চ দিতাম। তারপরও না বুঝলে গ্রুপের বড় ভাইদের কাছে জিজ্ঞেস করতাম। তারা তখন বুঝিয়ে দিত। এভাবে প্রথমে একটা অ্যাফিলিয়েট ওয়েবসাইট বানাই। ৬ মাস কাজ করেও আশানুরূপ ফল না পেয়ে ওয়েবসাইটে কাজ করা বন্ধ করে দেই। কিন্তু যে ভুলগুলো করেছিলাম সেগুলো আমার পরবর্তীতে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ে ব্যাপক সহায়তা করেছিল। “

অন্যদিকে, প্রজ্ঞা মজুমদার বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পড়ছেন। তার শুরুটা হয় ২০১৬ সালে ‘ভালোবাসার চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয়’ কে নিয়ে একটা আর্টিকেল লেখা ও পরবর্তীতে ফ্রি ওয়ার্ডপ্রেস সাইটে আর্টিকেলটা প্রকাশ করার মাধ্যমে। ভাললাগা থেকে লিখালেখি শুরু করলেও ২০১৭ সাল থেকে ফ্রিল্যান্স ওয়েবসাইট ফাইভারে কাজ করেন। পাশাপাশি নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এ ক্রিয়েটিভ রাইটিং, অনলাইন মার্কেটিং, উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনার উপর অনলাইনে পড়াশুনা করতে থাকেন। 

২০১৭ সালে প্রফেশনালদের নেটওয়ার্কিং সাইট “লিংকডইন” এ প্রজ্ঞা ও শিশিরের পরিচয় হয়। তাদের ২ জনের স্বপ্নই যেহেতু ছিল অনলাইন এ নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, সেহেতু ২০১৭ সালে তারা শুরু করেন অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট বিজনেস। তখন তাদের পুঁজি ছিল দুই হাজার ৪০০ টাকা। এটা দিয়েই তাদের ওয়েবসাইটের  ডোমেইন, হোস্টিং কিনে নিজেরাই ডিজাইন করেন। এভাবে প্রায় এক বছর কাজ করার পর কোনও আয় হয়নি। তারপরও কাজ বন্ধ করে দেননি। পরে ২০১৮ সালে কীওয়ার্ড গুলো গুগলে প্রথম পেজে র্যাঙ্ক করা শুরু করে। যার ফলে তাদের আয় হওয়া শুরু হয়। 

“একেবারে শূন্য থেকেই শুরু করি আমরা, আমাদের ধারণাও স্পষ্ট ছিল না”, কালের কণ্ঠকে এমনটাই বলছিলেন প্রজ্ঞা। বিষয়টাকে তিনি TRIAL AND ERROR মেথডের সঙ্গে তুলনা করেন বলেন, আমারা কাজ শুরু করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে যেসকল বাধার সম্মুখীন হয়েছি তার সমাধান করেছি। কখনো দক্ষতার অভাব থেকে, আবার কখনো প্রতিদন্দ্বীদের রোষানলের জন্য একের পর এক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সঙ্গী হয়ে এসেছে হতাশা, আর ভয়। তবে কখনো থেমে থাকি নি, পরিশ্রম আর একাগ্রতাকে সাথে করে প্রায় সবকিছুর ই সমাধান হয়েছে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছি ইন্টারনেটের।

২০১৯ সালে থেকে তাদের অ্যাফিলিয়েট বিজনেস থেকে যে টাকা আয় করছেন সেটা চাকরি করলে যা বেতন পেতেন তার থেকে কয়েক গুণ বেশি। অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট বিজনেস এ সফলতার পাশাপাশি ২০১৯ সালে তারা ২ জনে মিলে শুরু করেন রাইটার্স কার্নেল নামে কনটেন্ট রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান। যেখানে তারা বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট রাইটিং সার্ভিস দিচ্ছেন। বর্তমানে তাদের বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, ইতালি, বসনিয়া, ভিয়েতনাম সহ সারা বিশ্বের ১৪ টি দেশ থেকে বেশ কিছু রেগুলার কাস্টমার প্রতিষ্ঠান অর্ডার পাচ্ছেন। তাদের পুরো কাজ হয় অনলাইনে।

তাদের বিজনেসের সফলতার মূলমন্ত্র সম্পর্কে শিশির কালের কণ্ঠকে বলেন, “সঠিকভাবে টার্গেট কাস্টমারদের কাছে মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে পৌছানো, তাদেরকে কনভিন্স করে রিজনেবল প্রাইসে কোয়ালিটি সার্ভিস দেওয়া, কাস্টমারদের সাথে সু সম্পর্ক বজায় রাখা, সময়ের মধ্যে ডেলিভারি দেওয়া, কাস্টমারদের কোনও সমস্যা হলে তা দ্রুত সমাধান করা।

প্রজ্ঞা ও শিশিরের স্বপ্ন ভারত যেমন বর্তমান সময়ে আইটি শিল্পে সারাবিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে তেমনি বাংলাদেশও একদিন আইটি শিল্পে সারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিবে। এই লক্ষ্য বাংলাদেশী তরুণদের অনলাইন বিজনেসে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য উত্সাহিত করছেন এবং অনলাইনে কেউ বিজনেস শুরু করতে চাইলে দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এর ধারাবাহিকতায় entrepreneursroof.com নামে তারা একটি অনলাইন ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ম্যাগাজিনের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশি তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অনুপ্রেরনা যোগাচ্ছে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের গল্প সবার সামনে তুলে ধরছেন। 

প্রজ্ঞা বলেন, “জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশ এ যাও”- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনটাই বলেছিলেন। আজকের দিনের সঙ্গে মনে হয় এই উক্তিটি আর মিলতেছে না। এ সময়ে অক্সফোর্ড আর ক্যামব্রিজের লেকচার শুনার জন্য ইংল্যান্ড আমেরিকায় পাড়ি দিতে হয় না, ছোট একটা স্মার্টফোন, পিসি আর ইন্টারনেট কানেকশান ই যথেষ্ট।



সাতদিনের সেরা