kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

ইন্টারনেটে ফ্রি বলতে কি কিছু আছে?

ইন্টারনেটে সার্চ করে গেমস, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সংবাদপত্র ইত্যাদি বিনা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হলেও আদতে কোনোটাই কিন্তু ফ্রি নয়। এসব আপাত ফ্রি পণ্য কিংবা সেবা প্রদানের বিনিময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ডাটা সংগ্রহ করে বিক্রি করে দেয় বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন তামজীদ রহমান

৩০ মে, ২০২১ ১০:৪৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইন্টারনেটে ফ্রি বলতে কি কিছু আছে?

মডেল : আবরার, ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

ঘটনা : ১
ফয়সাল (ছদ্মনাম) একজন কলেজ শিক্ষার্থী। তাঁর মোবাইলটি বেশ পুরনো হয়ে গেছে। তাই তিনি অ্যামাজন ডটকমে ঢুকে বাজারে নতুন কী ফোন এলো সেগুলো দেখে বেড়াচ্ছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ তাঁর ল্যাপটপ থেকে ফোনের ব্যাপারে ঘাঁটাঘাঁটি করে তিনি ফেসবুকে লগইন করেন। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে কিছুদূর যেতে না যেতেই যেসব ফোন তিনি অ্যামাজনে দেখেছিলেন, সেই ফোনগুলোরই বিজ্ঞাপন ফেসবুকে দেখতে পেলেন। ফয়সাল বেশ খানিকটা অবাক হলেন, তিনি কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না।

ঘটনা : ২
সারা দিন গেম নিয়ে পড়ে থাকে তুহিন (ছদ্মনাম)। বন্ধুমহলের সবাই তাকে গেমার হিসেবেই জানে। তাই গেমিং পিসি কেনার জন্য তার কাছ থেকেই পরামর্শ নেয় বন্ধুরা। বাজারে নতুন আসা একটি গেমিং গ্রাফিকস কার্ড নিয়ে বন্ধু মাহমুদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল তুহিন। তুহিনকে নিয়ে মাহমুদ গ্রাফিকস কার্ড কেনার জন্য মার্কেটে যেতে চাইলে তুহিন জানায়, সে বেশ অসুস্থ, তার জ্বর এবং কাশি। তুহিনকে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে কথা শেষ করে মাহমুদ। ঘণ্টা দুই পরে তুহিন প্রতিদিনের মতো তার ই-মেইল চেক করতে যায়। তা করার সময় দুটি প্রমোশনাল ই-মেইল দেখতে পায়, যার একটি মেডিসিন হোম ডেলিভারি সার্ভিস নিয়ে এবং আরেকটি অনলাইনে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করার সার্ভিস নিয়ে।

ওপরের গল্প দুটি কি শুধুই কাকতালীয় ঘটনা? না। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন এমনই সব ঘটনার সম্মুখীন হন। অর্থাৎ আপনি অনলাইনে যা করছেন, তা-ই কেউ না কেউ কোনোভাবে জেনে যাচ্ছে। কারা জেনে যাচ্ছে? যাদের কাছ থেকে আপনি, আমি, আমরা ইন্টারনেটে ফ্রি সার্ভিস ব্যবহার করছি, তারা এসব জেনে যাচ্ছে।

ফ্রি শুধু ফ্রি নয়
ফ্রি ই-মেইল, ফ্রি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, ফ্রি স্টোরেজ, ফ্রি চ্যাটিং, ফ্রি গেম, ফ্রি রিডিং, ফ্রি সার্চিং, ফ্রি ওয়াচিং, ফ্রি হোস্টিং ইত্যাদির কোনোটাই আসলে ফ্রি নয়। যেসব ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের সেবা প্রদান করে থাকে, তারা দাতব্য সংস্থা না হয়ে থাকলে কখনোই বিনা মূল্যে এসব সেবা প্রদান করবে না। স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে দেখবেন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বড় অফিস রয়েছে, সেসব অফিসে রয়েছে প্রচুর কর্মী। তাহলে ফ্রি সার্ভিসের বিনিময়ে তারা এত বড় অফিস পরিচালনা করে কিভাবে, কর্মীদের বেতনই বা দেয় কিভাবে, দৈনিক বা মাসিক বা বার্ষিক অন্যান্য খরচ কিভাবে সামলায়, এমনকি ফ্রি সার্ভিস দেওয়ার জন্য তাদের মূল্যবান সময়ই বা নষ্ট করছে কেন?

যেহেতু সার্ভিসের বিনিময়ে তারা কোনো অর্থ নিচ্ছে না, সুতরাং নিজেদের ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কিছু না কিছু তাদের নিতেই হচ্ছে। আর এসবের মাধ্যমে তারা হচ্ছে লাভবান। এই ‘কিছু না কিছু’ হলো ডাটা, যা কিনা তাদের ফ্রি সার্ভিস ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য। ইন্টারনেটের এই ফ্রি সার্ভিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই তথ্য আপনাকে জানিয়ে আপনার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই নিচ্ছে। এই ফ্রি সার্ভিসগুলো আপনি ব্যবহার করার জন্য যখন নিবন্ধন করেন অথবা অ্যাপ্লিকেশন ইনস্টল করেন, তখন যে শর্তগুলো আপনি না পড়েই সম্মতি দিয়ে দেন, সেসব শর্তের মধ্যেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আপনার প্রদত্ত সব ধরনের তথ্য সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, গবেষণা এবং বিক্রয়ের অনুমতি তারা নিয়ে রাখে। আর এই ডাটা সংগ্রহে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিশ্বসেরা টেক জায়ান্ট গুগল এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক।

আমার গুগল সব জানে
গুগলের সর্বাধিক ব্যবহৃত ফ্রি সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে সার্চ ইঞ্জিন, ই-মেইল সার্ভিস, ওয়েব ব্রাউজার, ম্যাপ এবং গুগল ডকজাতীয় বেশ কিছু অনলাইন টুল, যেগুলো আমরা নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার করে থাকি। একজন ব্যবহারকারী গুগল সার্চ ইঞ্জিনে যেসব বিষয় সার্চ করে থাকে, তা থেকে গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের অ্যালগরিদম সেই ব্যবহারকারীর সার্চের ধরন বের করে ফেলে। উদাহরণ হিসেবে যদি কোনো ব্যবহারকারী গুগলে ‘স্টাডি ইন কানাডা’ লিখে সার্চ করেন এবং বেশ কিছু সময় এই বিষয়ে অতিবাহিত করেন, তাহলে গুগল ধরে নেয় এই ব্যবহারকারী দেশের বাইরে পড়তে যেতে ইচ্ছুক। এ রকম সারা বিশ্ব থেকে দেশের বাইরে পড়তে যেতে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তিদের তথ্যগুলো আলাদা করে। পরে তাঁদের সামনে বিভিন্ন ইমিগ্রেশন এজেন্সির ওয়েবসাইট প্রদর্শন করে থাকে মোটা অর্থের বিনিময়ে। এভাবে সার্চ ইঞ্জিনের বিজ্ঞাপন থেকে গুগল বিশাল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে থাকে। একইভাবে ব্যবহারকারীর ই-মেইলে কী ধরনের ই-মেইল আসে, ব্যবহারকারী কী ধরনের জিনিসপত্র অনলাইনে কেনাকাটা করেন, ব্রাউজারে কী ধরনের ওয়েবসাইটগুলোতে ব্যবহারকারী বেশি ভিজিট করেন, প্লেস্টোর থেকে কী ধরনের গেম বা অ্যাপ বেশি ডাউনলোড করেন—ব্যবহারকারীর এ ধরনের আচরণগুলো শনাক্ত করে গুগল অ্যাডসেন্সের অ্যাড প্রদর্শন এবং ই-মেইল মার্কেটিংয়ের জন্য ডাটা বিক্রি করে থাকে। জি-মেইল এবং গুগল ড্রাইভ ফ্রি সার্ভিসের পাশাপাশি পেইড সার্ভিসও আছে, যেখানে সুযোগ-সুবিধা আরো অনেক বেশি। ফ্রি সার্ভিস দেওয়ার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীদের সার্ভিসটিতে আসক্ত করে তুলে ভবিষ্যতে বিনা মূল্যে সুবিধা দেওয়া উঠিয়ে দিয়ে মাসিক বা বার্ষিক চার্জ নির্ধারণ করে দেওয়া, তত দিনে ব্যবহারকারীরা সার্ভিসটিতে এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন যে পরে টাকা দিয়ে কিনে হলেও তাঁরা সেই সেবা ব্যবহার করতে বাধ্য হন।

পিছিয়ে নেই ফেসবুকও
ফেসবুক তাদের প্রায় পুরোটা ব্যবসাই চালায় বিজ্ঞাপন প্রচার করে। গত বছর শুধু বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে ফেসবুক লাভ করেছিল ৮৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তাদের মোট লভ্যাংশের ৯৮ শতাংশ ছিল। ফেসবুকে যেহেতু ব্যবহারকারীরা বেশ লম্বা সময় অতিবাহিত করে থাকে, তাই ফেসবুক তার ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে আরো গভীরভাবে জানতে পারে। ফেসবুকের ব্যবহারকারীরা যা যা করে বেড়ায়, সেসব ডাটাই ফেসবুক বিশ্লেষণ করে। ধরি, কোনো ব্যক্তি ফেসবুকে যেসব ছবি পোস্ট করে, সেসবের বেশির ভাগ ছবিতেই টি-শার্ট ও সানগ্লাস পরা। এতে ফেসবুক বুঝে নেয়, এই ব্যক্তি কাপড়ের মধ্যে টি-শার্ট ও সানগ্লাস পরতে পছন্দ করেন। পাশাপাশি একই ব্যক্তিটির ফেসবুকে বিভিন্ন গেজেটের দোকানের পেজে লাইক দিয়ে রাখায় ফেসবুক বুঝে যায় ব্যবহারকারী গেজেটও পছন্দ করেন। আবার তিনি বেশ কিছু ভ্রমণ গ্রুপে জয়েন হয়ে আছেন অর্থাৎ তিনি ঘুরে বেড়াতেও ভালোবাসেন। আর খাবারের ক্ষেত্রে তাঁর পিত্জা আর কফি বেশি পছন্দ। কারণ তিনি যেসব রেস্টুরেন্টে চেকইন দেন, সেসবের বেশির ভাগই পিত্জার দোকান আর কফিশপ। সর্বোপরি একজন ব্যবহারকারীর চাহিদা এবং পছন্দের প্রায় অনেক কিছুই ফেসবুক জেনে যায়। এ কারণেই তাদের প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করতে ব্যবসায়ীরা বেশি আগ্রহী হন। কারণ তাঁরা জানেন যে এখানে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করলে তা একেবারে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতাদেরই দেখানো হবে। ফলে বিক্রিবাট্টাও হবে বেশি। শুধু তা-ই নয়, যাঁরা ব্রাউজার থেকে ফেসবুক চালান, তাঁদের কুকিজ ট্র্যাকও করা হয়। এ কারণেই কোনো ই-কমার্স সাইট ভিজিট করে ফেসবুকে এলে ওই ওয়েবসাইটে ব্রাউজ করা কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন ফেসবুকেও দেখা যায়। এটুকুতেই থেমে নেই ফেসবুক। ফোনে ফেসবুক অ্যাপ ইনস্টল করলে তারা ফোনের স্টোরেজ, গ্যালারি, লোকেশন, ক্যামেরা, মাইক্রোফোনসহ যাবতীয় সব কিছু অ্যাকসেস করার অনুমতি নিয়ে নেয়। চিন্তার বিষয় এই যে ব্যবহারকারী অফলাইনে থাকলেও লোকেশন, ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন ফেসবুক অফলাইনেই অ্যাকসেস করে থাকে। এতে ব্যবহারকারী জানতেও পারেন না যে তাঁর কথাবার্তা ও অবস্থান ফেসবুক জেনে যাচ্ছে এবং সেখান থেকেও প্রয়োজনীয় ডাটা সংগ্রহ করে ফেসবুক তা বিজ্ঞাপন প্রদর্শনে কাজে লাগাচ্ছে।

আছে মন্দেরও ভালো
গুগল আর ফেসবুকের কথা তো শুধু উদাহরণ হিসেবে বলা। ইন্টারনেটে বিনা মূল্যে সেবা দেয় এমন যেকোনো প্রতিষ্ঠানই কোনো না কোনো কিছুর বিনিময়েই সেবা প্রদান করে থাকে, যা আপাতদৃষ্টিতে অনুধাবন করা যায় না। ব্যবসা এভাবেই হয়, সাইবারজগতে কোনো কিছুই ফ্রি নয়। যতক্ষণ না আমাদের ডাটা কোনো খারাপ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আসলে আমাদেরই লাভ।



সাতদিনের সেরা