kalerkantho

শনিবার । ২৭ চৈত্র ১৪২৭। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২৬ শাবান ১৪৪২

দেশের প্রথম সিমুলেটর কমপ্লেক্স

অনলাইন ডেস্ক   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৯:৪৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশের প্রথম সিমুলেটর কমপ্লেক্স

দেশের প্রথম সিমুলেটর কমপ্লেক্সের ভেতরটা দেখতে এমনই হবে

বিশ্ববাজারে মানসম্পন্ন নাবিক তৈরি করতে দেশে প্রথমবারের মতো সিমুলেটর কমপ্লেক্স হচ্ছে মেরিটাইম ইনস্টিটিউট। ৪০ কোটি টাকার প্রকল্পটির অর্ধেক কাজ শেষ। জুনের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার আশা কর্তৃপক্ষের। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আসিফ সিদ্দিকী

জাহাজ পরিচালনায় ক্যাডেট তৈরিতে দেশে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল, তা সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ছিল না। সরকারি-বেসরকারি মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষণে কিছু আধুনিক প্রযুক্তি যোগ হয়েছে ঠিক, কিন্তু তা সমন্বিত ছিল না। ফলে ক্যাডেটরা প্রশিক্ষণ নিয়ে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় সেভাবে সক্ষমতা দেখাতে পারছিলেন না। এই অসুবিধা দূর করতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ক্যাডেট তৈরিতে দেশে প্রথম ‘সিমুলেটর কমপ্লেক্স’ স্থাপন করছে চট্টগ্রামের সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট (এনএমআই)। মেরিটাইম সেক্টরের দক্ষ জনবল তৈরির অংশ হিসেবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এটি স্থাপন করছে।

সিমুলেটর কী?
সোজা বাংলায় সিমুলেশন হচ্ছে বাস্তবিক জীবনের কোনো কর্মকাণ্ডের আনুমানিক অনুকরণ। সুরক্ষা প্রকৌশল, পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং ভিডিও গেমে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ধরুন, গাড়ি চালানো শেখানোর জন্য সিমুলেশন করতে চান। সে জন্য বিশেষ একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হলো, যা শুধু গাড়ি চালানোর সিমুলেশন করবে। আর এটিকে বলা হয়ে থাকে সিমুলেটর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিমান, জাহাজ, গাড়ির সিমুলেটরগুলো একটি থেকে অন্যটি একেবারে আলাদা হয়ে থাকে।

ঘরে বসেই শেখা যাবে জাহাজ চালানো
জাহাজের সিমুলেটর ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় মনে হবে যেন সত্যিকারেই কোনো জাহাজ চালাচ্ছেন। সিমুলেটরে থাকবে পুরোপুরি জাহাজের আবহ, পাওয়া যাবে ইঞ্জিনের শব্দ। বাদ পড়বে না পরিবেশও—ঢেউয়ের শব্দ থেকে শুরু করে উত্তাল সাগরে জাহাজের ছুটে চলা, ঝড়ের মুখে পড়া, এমনকি ঝড় সামলে এগিয়ে চলা—সব শেখা যাবে সত্যিকারের জাহাজের আদলেই।

মেরিন একাডেমির নৌ শিক্ষা বিভাগের প্রধান ও ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলছেন, ‘এই সিমুলেটরে ক্যাডেটরা প্রথমেই সব ধরনের জাহাজ সম্পর্কে প্রাথমিক পরিচালনার প্রশিক্ষণ পাবেন। এরপর ধরুন, জাহাজটি প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে যাচ্ছে, এমন সময় জাহাজের সামনে ঝড় এলো, তখন আবহাওয়ার তথ্য যোগ করে কিভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন, সেটিও শেখানো হবে। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ধরা পড়লে, তখন সেটিও কিভাবে শনাক্ত করে ত্রুটিমুক্ত করবেন, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে এই সিমুলেটরে।’

এ ছাড়া ‘রিমোর্ট অপারেটেড ভেসেল’ বা দূর নিয়ন্ত্রিত জাহাজ পরিচালনা প্রশিক্ষণও নিতে পারবেন ক্যাডেটরা। অর্থাৎ সাগরের নিচে থাকা পাইপলাইন মেরামত ও স্থাপন করার মতো প্রশিক্ষণও পাবেন। এলএনজি-এলপিজি জাহাজ পরিচালনা, অফশোর বা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান জাহাজ পরিচালনাও করতে পারবেন। মোটকথা সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে ২৫ থেকে ৩০ ধরনের জাহাজ পরিচালনা প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।

কেন এই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন?
আগে ক্যাডেট প্রশিক্ষণে থিওরিটিক্যাল বা তাত্ত্বিক শিক্ষার পর প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণের জন্য প্রত্যেক ক্যাডেটকে বাস্তবিক জাহাজে যেতে হতো। কিন্তু ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের জন্য একসঙ্গে এত জাহাজ পাওয়া এবং সব সময় জাহাজে ওঠাটাও দুষ্কর হয়ে পড়ে। এই অবস্থার উত্তরণে সিমুলেটরভিত্তিক অর্থাৎ জাহাজে না গিয়েও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব উঠে আসে। এর পর থেকেই ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) বিশ্বব্যাপী ক্যাডেট প্রশিক্ষণে ‘সিমুলেটরভিত্তিক’ প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছে।

নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন কে এম জসিম উদ্দিন সরকার বলছেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) জাহাজে না উঠে জাহাজের মতোই রিয়াল টাইম, রিয়াল এনভায়রনমেন্ট ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করে। এর পর থেকেই মূলত সিমুলেশনভিত্তিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়।’

এগিয়ে থাকবেন বাংলাদেশি ক্যাডেটরাও
বাংলাদেশে সরকারি ‘বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি’তে ডেক ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণে সিমুলেটর থাকলেও ইঞ্জিন ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণে প্রয়োজনীয় সিমুলেটর নেই। তবে ক্যাডেট প্রশিক্ষণের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘আইএমএ’ সিমুলেশনভিত্তিক প্রশিক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো থেকে কিছুটা এগিয়ে আছে।

সিমুলেশনভিত্তিক প্রশিক্ষণ থাকলে একজন ক্যাডেট কিভাবে এগিয়ে থাকবে জানতে চাইলে মেরিন একাডেমির নৌ শিক্ষা বিভাগের প্রধান ও ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘একজন ক্যাডেট খোলা জাহাজ, কনটেইনার জাহাজ-ট্যাংকার জাহাজের প্রশিক্ষণ পান। কিন্তু এনএমআইয়ের আধুনিক ও সমন্বিত সিমুলেটর দিয়ে বিশেষায়িত কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে, যা বাংলাদেশে প্রথম ও একেবারে নতুন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রিমোট অপারেটেড ভেসেল, অফশোর ভেসেল এবং এলপিজি-এলএনজিভিত্তিক জাহাজ পরিচালনা। আমাদের ক্যাডেটরাও আধুনিক প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরির বাজারে এগিয়ে থাকবেন।’

বিদেশে প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানো যাবে
সর্বাধুনিক সমন্বিত এই সিমুলেটর দিয়ে শুধু ক্যাডেট প্রশিক্ষণই নয়, বন্দর ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি সম্ভব। বন্দর ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক কি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ আরটিজি পরিচালনা কাজে প্রচুর কর্মীর চাহিদা দেশে এবং বিদেশে রয়েছে। বাংলাদেশে এখন তিনটি সমুদ্রবন্দর আছে। মাতারবাড়ী গভীর সুমদ্রবন্দর চালু হবে ২০২৫ সালে। এ ছাড়া নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, অনুমোদিত বে টার্মিনালে ভারী ও আধুনিক যন্ত্র পরিচালনায় প্রয়োজন দক্ষ কর্মীর। একই সঙ্গে বিদেশেও এই ধরনের দক্ষ কর্মীর প্রচুর চাহিদা রয়েছে; কিন্তু প্রশিক্ষণ না থাকায় সেই খাত অবহেলিতই রয়ে গেছে।

বন্দর টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের চিফ অপারেটিং অফিসার ক্যাপ্টেন তানভীর হোসাইন বলেন, ‘আগে আমরা বন্দরের কি গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টায়ার গ্যান্ট্রি, স্ট্যাডল ক্যারিয়ার পরিচালনায় বিদেশিনির্ভর ছিলাম। এখন বিদেশের স্বনামধন্য বন্দরের প্রশিক্ষিত-কর্মরত বাংলাদেশিদের দেশে এনে এখন কাজ করাচ্ছি। চট্টগ্রাম বন্দরের এখন নিজস্ব সিমুলেটর আছে, যেটি দিয়ে এসব ক্রেন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশেই যদি সর্বাধুনিক এমন সিমুলেটর থাকে, তাহলে দেশে এই খাতের বর্ধিত চাহিদা পূরণ করা যাবে। একই সঙ্গে বিদেশে প্রচুর প্রশিক্ষিত কর্মীও পাঠানো যাবে।’

এগিয়ে ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট
ক্যাডেট প্রশিক্ষণে মেরিন একাডেমি, মেরিন ফিশারিজ একাডেমি এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি মেরিন একাডেমিতে সিমুলেটর রয়েছে; কিন্তু সেগুলো পূর্ণাঙ্গ নয়। সব ধরনের প্রশিক্ষণের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানেরই কোনো পূর্ণাঙ্গ সিমুলেটর নেই। সেদিক থেকে সরকারি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটে সমন্বিত সিমুলেটর স্থাপন করা হলে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষ নাবিক তৈরিতে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

ভবিষ্যতের যোগ্য জনবল তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার চট্টগ্রাম ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটে রেটিং বা জাহাজ পরিচালনায় কর্মী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মেরিন ক্যাডেট প্রশিক্ষণেরও অনুমতি দিয়েছে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগেই এই সর্বাধুনিক ও সমন্বিত সিমুলেটর কমপ্লেক্স তৈরি করছে।

ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিম বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলো এই সিমুলেটরের সঙ্গে যুক্ত থাকছে। ফলে ইনল্যান্ড ও কোস্টার জাহাজের নাবিকদেরও নৌ নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে।’

চালু হবে জুনে
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এই সিমুলেটর কমপ্লেক্স স্থাপন করছে। প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের কাজ এরই মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এখন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, নির্ধারিত সময় ২০২১ সালের জুনের মধ্যেই এটি সম্পন্ন হয়ে যাবে। মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিম বলছেন, ‘কভিড-১৯ মহামারির মধ্যেই আমরা এই প্রকল্পের কাজ চালিয়েছি; খুব বেশি প্রভাব পড়তে দিইনি। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি সিমুলেটর যন্ত্র চলে এসেছে দেশে। বাকিগুলো নির্ধারিত সময়েই পৌঁছাবে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ে এই কমপ্লেক্স চালু করা যাবে।’

সরকার বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম নাবিক তৈরি করতে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটকে সর্বাধুনিকভাবে গড়ে তুলছে। গত আট বছরে এই প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বর্তমানে রেটিং বা কর্মী ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে; বছরে সক্ষমতা ৬০০ জন। রেটিং তৈরি করতে সরকার এরই মধ্যে মাদারীপুরে শাখার অনুমতি দিয়েছে, যেটির অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। মাদারীপুর শাখার প্রশিক্ষণ এখন চলছে চট্টগ্রামে। একই সঙ্গে কুড়িগ্রামেও ইনস্টিটিউটের একটি শাখা স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে প্রশিক্ষণের গুণগত মানের স্বীকৃতি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মেরিটাইম সেফটি এজেন্সির সনদ পেয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে আইএসও সনদ, ওয়েল্ডিং প্রসিডিউর স্পেসিফিকেশন সনদ এবং যুক্তরাজ্যের মারলিনসের অনুমোদিত টেস্ট সেন্টারের মর্যাদাও লাভ করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা