kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

করোনাকালে বেপরোয়া সাইবার অপরাধীরা

৯০ শতাংশ নারী সাবেক প্রেমিক বা স্বামীর দ্বারা হয়রানির শিকার, সাইবার পর্নোগ্রাফির শিকার ৬০ শতাংশ টিনএজার

রেজোয়ান বিশ্বাস    

২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০২:২৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাকালে বেপরোয়া সাইবার অপরাধীরা

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন সাভারের এক তরুণ ও নারায়াণগঞ্জের এক তরুণী। কোচিং ক্লাসে পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। তা থেকে পরিণয়। এর পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুজনের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও আদান-প্রদান। একসময় সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে সরে আসতে চান মেয়েটি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কথিত প্রেমিক মেয়েটির আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছেড়ে দেন ইন্টারনেটে। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মেয়েটি। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে ছেলেটিকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযোগটি কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ইউনিটে তদন্তাধীন।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন বেশ কিছু সাইবার অপরাধের ঘটনা সিটিটিসির তদন্তে উঠে এসেছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, ফেসবুকে নিজের সুন্দর ছবি দিয়ে আকর্ষণীয় প্রফাইল খোলা হয়। আর সেই ফাঁদে ফেলে সম্পর্ক গড়ে তোলে তরুণীদের সঙ্গে। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে। তরুণীর দুর্বল মুহূর্তের কিছু ছবি বা ভিডিও করে পরে শুরু করে ব্ল্যাকমেইল। সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার অপরাধ এখন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা জরুরি।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের চলমান স্থবিরতায় বিশেষত তরুণ-তরুণীরা ইন্টারনেটে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে। আর এই ফাঁকে সাইবার অপরাধীরা যেন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ওদের নানামুখী তৎপরতা থাকে। শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক রাজনৈতিক নেতাও সাইবার অপরাধীদের শিকার হয়েছেন। সাইবার ফাঁদে পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী, পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কৌশলে জিম্মি করে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অর্থ। এমনকি নারী-পুরুষের সম্ভ্রমও নিরাপদ থাকছে না। এমন অনেক ভুক্তভোগীই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ভিড় করছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একের পর এক সাইবার অপরাধের অভিযোগ আসছে। একটির তদন্ত শেষ করতে না করতেই আরো একাধিক অভিযোগ জমা হচ্ছে। আর ফেক আইডি ব্যবহার করায় অপরাধীদের ধরাও সহজ হচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।

সাইবার ইউনিটের তথ্য বলছে, চার বছর ধরে প্রতিদিনই অসংখ্য অভিযোগ আসছে। আর করোনার এই সময় তা অনেকটা বেড়ে গেছে। সাইবার বিষয়ে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মামলা বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ শতাংশ। পরবর্তী বছর তা কিছুটা কমলেও ২০১৯ সালেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ শতাংশ। এসংক্রান্ত এক হাজারের বেশি মামলার তদন্তে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী নারীদের ৯০ শতাংশই সাইবার পর্নোগ্রাফির শিকার। তাদের ৬০ শতাংশের বয়সই আবার ২০ বছরের নিচে। তারা সাবেক প্রেমিক বা স্বামীর মাধ্যমে সাইবার পর্নোগ্রাফির শিকার হয়েছে।

সিটিটিসির সাইবার বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে সাইবার অপরাধ বেড়েছে। কারো পোস্টে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা পর্নোগ্রাফি আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যেও শাস্তি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টিতে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে সাইবার ইথিকস শেখানোর বিষয় থাকা দরকার। কী করলে হ্যাকিংয়ের হাত থেকে বাঁচা যাবে শিক্ষার্থীদের তা শেখানো যেতে পারে।

সাইবার অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে আইডি হ্যাকের শিকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তাঁদের বেশির ভাগই আবার নারী। এর বাইরে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২১৮ জন। তাঁদের মধ্যে ৪৫ জন পুরুষ ও ১৭৩ জন নারী। ফেক আইডি দিয়ে প্রতারণার শিকার ৩১৮ নারীসহ ৫১৩ জন। ই-মেইল হ্যাকের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ২৯১ জন নারী।

ডিএমপির সাইবার নিরাপত্তা ও ক্রাইম ডিভিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে সারা দেশে সাইবার অপরাধের দায়ে মামলা হয় ৬৩৮টি, যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৯২৩টি। একইভাবে ২০১৭ সালে ১০৫৮টি, ২০১৮ সালে ১১৩৬টি ও ২০১৯ সালে ১৪৫৬টি মামলা হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা হয়েছে যথাক্রমে ২৩২, ২০৬, ২৮০, ৩৭৩ ও ৫৪০টি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা