kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

করোনাকালের দুর্দান্ত সব স্মার্টফোন

অনলাইন ডেস্ক   

৩০ আগস্ট, ২০২০ ১১:৫০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনাকালের দুর্দান্ত সব স্মার্টফোন

আলোকচিত্র : মোহাম্মাদ আসাদ

‘কভিড ১৯’-এর প্রভাব চলমান থাকলেও থামেনি স্মার্টফোনের নিত্যনতুন মডেলের আসার পালা। যুক্ত হয়েছে নতুন ট্রেন্ড। করোনার জন্য ফোন বিক্রিতে বিশাল প্রভাব পড়বে—এই আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হতে চলেছে। বছরের প্রথম ছয়টি মাসে স্মার্টফোন বাজার কেমন ছিল, কী চাহিদা মাথায় রেখে ক্রেতারা ফোন কিনেছেন আর তা মেটাতে সক্ষম হয়েছে কি না স্মার্টফোন নির্মাতারা—সেসবের খোঁজখবর জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

নতুন সব ফোন

আইফোন এসই (২০২০)
বলা যায়, বছরের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ ছিল নতুন ‘আইফোন এসই’। পুরনো ডিজাইনে হালের নতুন হার্ডওয়্যার পুরে তৈরি এই ডিভাইস সবচেয়ে কম দামি নতুন আইফোন। সাধারণত অ্যাপল স্বল্পমূল্যে আইফোন বিক্রি করে না, আর ২০২০ সালে এসে ২০১৭ সালের মডেল ব্যবহার করে নতুন ফোন বাজারে আনা অস্বাভাবিক বটেই। ফোনটির পুরো ডিজাইন ‘আইফোন ৮’-এর মতো, তবে ক্যামেরা ও প্রসেসর ‘আইফোন ১১’ থেকে নেওয়া। কম রেজল্যুশনের ডিসপ্লের সঙ্গে শক্তিশালী প্রসেসর এটিকে বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী গেমিং ফোন করে তুলেছে। দেশের বাজারে ‘আইফোন ১১’-র দাম যেখানে ৭০ হাজার থেকে ৭৪ হাজার টাকা, সেখানে ‘আইফোন এসই’র দাম পরবে ৫৩ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকা। 

স্যামসাং গ্যালাক্সি এস২০ সিরিজ
একটি ফোনে যত ফিচার দেওয়া সম্ভব তা দেওয়া হলে যা হতে পারে সেটাই ‘গ্যালাক্সি এস২০’ সিরিজ। সর্বশেষ কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৮৬৫ প্রসেসর, ১০০এক্স জুম ক্যামেরা, ১০৮ মেগাপিক্সেল মূল ক্যামেরা, ৮কে ভিডিও, সর্বোচ্চ মানের ১২০ হার্জ সুপার অ্যামোলেড ডিসপ্লে, ৫জি নেটওয়ার্ক, বিশাল ব্যাটারি—কী নেই এতে! হতে পারে এ সিরিজে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের মডেলও আছে। কিন্তু কেনার পর এতটুকু সান্ত্বনা পাওয়া যাবে, বাদ পড়েনি একটি ফিচারও। ডিজাইন এবং তৈরির মানেও সেরা বলা ছাড়া উপায় নেই।

স্যামসাং গ্যালাক্সি জেড ফ্লিপ
ফোল্ডেবল ডিসপ্লের ফোন এখনো মূলধারায় প্রবেশ করেনি। এর প্রমাণ, এস২০ সিরিজের বদলে ফোল্ডেবল ডিসপ্লের ফোন স্থান করে নিয়েছে ‘গ্যালাক্সি জেড ফ্লিপ’ নামে; যেখানে গ্যালাক্সি ফোল্ডের ডিজাইন ছিল ট্যাবলেটের ডিসপ্লেকে ভাঁজ করে ফোনে পরিণত করার, জেড ফ্লিপের চেষ্টা বড় ডিসপ্লের ফোনকে ভাঁজ করে পকেটে রাখার। ডিজাইনে ফোনটি বারবারই পুরনো ফ্লিপ ফোনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে ডিভাইসটির দাম লাখ টাকার ওপর হলেও স্পেসিফিকেশন রয়ে গেছে বিগত বছরের এস১০ সিরিজের সমান। ফোল্ডিং ডিসপ্লের জন্য কি ‘এস২০’ ছেড়ে ফ্লিপ কেনা উচিত? ক্রেতারা কী বলেন? 

পকো এক্স২/রেডমি কে৩০
সাধ্যের মধ্যে নতুন সব ফিচার—এমন স্লোগানে তৈরি ফোন ‘পকো এক্স২’, যার চৈনিক নাম ‘রেডমি কে৩০’। ডিজাইন একেবারেই ২০২০ সালের মতো হালনাগাদ। পেছনে আছে ৪টি ক্যামেরা, যার মূলটি ৬৪ মেগাপিক্সেলের। ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর জায়গা করে নিয়েছে সাইডে। আছে বিশাল এইচডিআর এবং ১২০ হার্জ রিফ্রেশরেটের ডিসপ্লে। নচের বদলে ডুয়াল সেলফি ক্যামেরার বসবাস ছোট কাটআউটের মধ্যে। প্রসেসরটি ফ্ল্যাগশিপ নয়, কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৭৩০জি।

ওয়ানপ্লাস ৮/৮ প্রো
যদি বলা হয় আইফোনের মতো দ্রুতগামী এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হালকা সফটওয়্যারের ফ্ল্যাগশিপ অ্যানড্রয়েড কি আছে, তাহলে একটিই নাম সবাই বলবে, আর সেটি—‘ওয়ানপ্লাস’। তবে ওয়ানপ্লাস এবার বিতর্কের শিকার—‘৮ প্রো’র দাম ‘স্যামসাং এস২০’ সিরিজের সমান, অথচ ক্যামেরায় আছে পিছিয়ে। কিন্তু ‘ওয়ানপ্লাস ৮’ প্রায় সব টেক রিভিউয়ারের প্রশংসা কুড়িয়েছে। চমৎকার ডিজাইন, হালনাগাদ স্ন্যাপড্রাগন ৮৬৫ প্রসেসর এবং চমৎকার ডিসপ্লে ফোনটিকে এগিয়ে রেখেছে হার্ডওয়্যারে। ‘অক্সিজেন ওএস’ ফোনটিকে অন্যান্য অ্যানড্রয়েডের চেয়ে এগিয়েছে সফটওয়্যারে।

হুয়াওয়ে পি৪০ প্রো
গুগলসেবা হারিয়ে হুয়াওয়ে যেন স্মার্টফোন দুনিয়া থেকেই বিদায় নিয়েছে। প্লে স্টোর, ইউটিউব, জিমেইল, কন্ট্যাক্টস সিংক না থাকায় ব্যবহারকারীরা হুয়াওয়ের সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপকে ভুলেই গেছে। অথচ বলা যায়, বর্তমানে বাজারে থাকা সবচেয়ে সেরা ক্যামেরা ফোন এটি। মূল ক্যামেরা ৫০ মেগাপিক্সেল, পেরিস্কোপ ৫এক্স অপটিক্যাল জুম ক্যামেরা ১২ মেগাপিক্সেল, আর আলট্রাওয়াইড ৪০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার পাশাপাশি আছে পোর্ট্রেটের জন্য টাইম অব ফ্লাইট থ্রিডি ক্যামেরা। সেলফিতে ৩২ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার পাশাপাশি আছে থ্রিডি ইনফ্রারেড ক্যামেরা, যা পোর্ট্রেটের পাশাপাশি ফেস স্ক্যানেও কাজ করে। ফোনটির প্রসেসর কিরিন ৯৯০, র‌্যাম ৮ গিগাবাইট। সব দিক থেকেই অনবদ্য একটি ফোন, শুধু নেই গুগলসেবা!

জেডটিই নুবিয়া রেড ম্যাজিক
গেমিং ছাড়া চলেই না—এমন স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে জেডটিই এনেছে ‘নুবিয়া রেড ম্যাজিক ৫জি’। এতে আছে ১৪৪ হার্জ অ্যামোলেড ডিসপ্লে। আছে লেটেস্ট স্ন্যাপড্রাগন ৮৫৬ প্রসেসর। সর্বোচ্চ ১৬ গিগাবাইট র‌্যাম ও ২৫৬ গিগাবাইট স্টোরেজে ফোনটি পাওয়া যাবে। টানা গেমিং করার জন্য এতে কুলিং ফ্যানও আছে, সঙ্গে চার্জিং দ্রুত করার জন্য দেওয়া হয়েছে ৫৫ ওয়াট চার্জার।

ডিজাইনে ট্রেন্ড
ফোনে চারটি ক্যামেরা ব্যবহার এক ধরনের স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গেছে। মেগাপিক্সেলের পরিমাণও এ বছর ১২ বা ১৬ থেকে একলাফে ৪৮ ও ৬৪-এ ছুঁয়েছে, ফ্ল্যাগশিপে দেখা যাচ্ছে ১০৮ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা। এমন বিপুল পরিমাণ পিক্সেলের ছবি শুনে যতটা অসাধারণ মানের মনে হচ্ছে, বিষয়টি তা নয়। বেশির ভাগ ফোনেই ৪৮ বা ৬৪ মেগাপিক্সেল সেন্সরগুলোকে পিক্সেল বিনিংয়ের মাধ্যমে ১২ বা ১৬ মেগাপিক্সেলে নামিয়ে আনা হচ্ছে। তবে একাধিক পিক্সেলকে একত্র করে বিনিং করার কারণে ছবিগুলো ১২ মেগাপিক্সেল হলেও শার্পনেসে অনেক এগিয়ে।

মোবাইল ফোনের ক্যামেরা সেন্সরগুলো ডিএসএলআর ক্যামেরার মতো বড় না হওয়ার ফলে প্রতিটি পিক্সেলের সাইজ হয় অনেক কম। ফলে দেখা যায়, আলোর পরিমাণ কমে গেলে সেগুলো ভালো মানের ছবি তুলতে পারে না। পিক্সেল বিনিংয়ের মাধ্যমে চারটি পিক্সেলের তথ্য একত্র করে একটি পিক্সেল হিসেবে গণ্য করে ছবি তৈরি করা হয়। ফলে ৪৮ মেগাপিক্সেল হয় যায় ১২ মেগাপিক্সেলের কিন্তু ছবির মান যায় বেড়ে।

শুরুতে ফোনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর স্থান করে নিয়েছিল ডিসপ্লের নিচের বেজেলে, এরপর তা পেছনে মাঝ বরাবর বসানো ছিল ডিজাইনের ট্রেন্ড। এ বছর থেকে সাইডে পাওয়ার বাটনের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর বসানোর ট্রেন্ড চলছে। গ্লাস ব্যাকে ফুটো করে সেন্সর বসালে খরচ বেড়ে যায়, গ্লাস হয়ে যায় ঠুনকো—সেটি চিন্তা করেই সম্ভবত ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে বাড়তি লাভ, বিশাল ফোনের পেছনে কোথায় সেন্সর তা নিয়ে ব্যবহারকারীকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে না।

ডিসপ্লের বেজেল কমাতে কমাতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছেন নির্মাতারা। কিন্তু ক্যামেরা, সেন্সর ও ইয়ারপিসের জন্য বিশাল নচের প্রয়োজনীয়তা কমেনি। এ বছর থেকে কাটআউট ক্যামেরার আধিক্য বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সামনে ডুয়াল ক্যামেরা ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে বেশি। তবে পপআপ ক্যামেরা ব্যবহার অনেক নির্মাতাই বাদ দিয়েছে।

ফোল্ডেবল ডিসপ্লের কিছু ফোন বাজারে এসেছে, যার জনপ্রিয়তা রয়ে গেছে পরীক্ষামূলক পর্যায়েই।

ফিচারে ট্রেন্ড
ফোন নির্মাতারা এ বছর থেকে ফোনে ৬ ইঞ্চির ওপরে ডিসপ্লে সাইজ প্রায় সব মডেলেই ব্যবহার শুরু করেছে। সঙ্গে আছে ৯০ বা ১২০ হার্জ রিফ্রেশ রেট। গেম খেলার জন্য এ দুটি ফিচারই অত্যন্ত কার্যকর। আইপিএস এলসিডি ডিসপ্লের আধিক্য কমতে শুরু করেছে, মাঝারি বাজেটে অ্যামোলেড ডিসপ্লের মডেলের পরিমাণ বেড়েছে অনেকখানি। অন্যদিতে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ৫জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি। ফ্ল্যাগশিপের পাশাপাশি মাঝারি বাজেটের ফোনেও ৫জি প্রযুক্তির দেখা মিলছে। আপাতত সেটি কাজে না লাগলেও খুব দ্রুতই ৫জি চালু হয়ে গেলে ফিচারটি সবার ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা বদলে দেবে।

এ বছরের প্রতিটি ফোনেই দেখা গেছে বিশাল ব্যাটারি। প্রচুর স্বল্পমূল্য, মাঝারি মূল্যের, এমনকি ফ্ল্যাগশিপেও দেখা গেছে ব্যাটারির ধারণক্ষমতা ৪৫০০ থেকে ৫০০০ এমএএইচের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। বিশাল আকৃতির উচ্চ রিফ্রেশরেট ডিসপ্লে এবং ৫জি ব্যাটারির ওপর বড়সড় চাপ ফেলাতেই এ ট্রেন্ড শুরু হয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সব শেষে ৩০ বা ৪০ ওয়াটের চার্জিং প্রযুক্তিও বাজারে আসতে শুরু করেছে। গেমিং করার ফলে দ্রুত চার্জিং আগের চেয়েও জরুরি হয়ে যাওয়ায়ই প্রযুক্তিটি এত দ্রুত বাজারে চালু হয়েছে।

ব্যবহারকারীদের চাওয়া-পাওয়া
ফোনে শুধু কথা বলা, গান শোনা বা ভিডিও দেখা নয়, ব্যবহারকারীদের নতুন চাওয়া গেমিং। টেনসেন্ট গেমসের ‘পাবজি’, ‘কল অব ডিউটি’ এবং এপিক গেমসের ‘ফোর্টনাইট’ মোবাইল গেমিং বাজারকে শুধু চাঙ্গাই করেনি, মোবাইলের ব্যবহারই অনেকখানি বদলে দিয়েছে। যার প্রভাবে ফোনের ডিসপ্লের আকৃতি বেড়েছে, ৯০ বা ১২০ হার্জে উঠেছে রিফ্রেশ রেট। স্বল্পমূল্যেও শক্তিশালী গ্রাফিকসের প্রসেসর বাজারে আনছে মিডিয়াটেক ও কোয়ালকম। ব্যাটারি ও চার্জিংয়ের প্রয়োজনীয়তায় সামনে আসছে ৬০০০ এমএএইচ ব্যাটারি এবং ১০০+ ওয়াট চার্জিংয়ের ফোন। বলা যায়, গেমিং হচ্ছে ২০২০ সালে ফোন ব্যবহারকারীদের মূল চাওয়া।

বাকি বছরে কী আসছে
এ বছরে দুটি বড় ফোন বাজারে আসা এখনো বাকি আছে। অ্যাপলের নতুন আইফোন ও গুগলের নতুন পিক্সেল। বলা যায়, এ দুটি সিরিজ আগামীর সব ফোনের ডিজাইন ও ফিচার কেমন হবে তা বাতলে দেবে। আরো শক্তিশালী ক্যামেরা এবং সম্ভবত লাইডার প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হবে আইফোন। গুগল তাদের ক্যামেরা সফটওয়্যার করবে আরো শক্তিশালী। এ ছাড়া ডিজাইনে আসবে নতুনত্ব। আর ৫জিই হবে মূল নতুন ফিচার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা