kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

নার্ডিজের ভার্চুয়াল রিয়ালিটির গল্প

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ জুলাই, ২০১৯ ১১:৩২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নার্ডিজের ভার্চুয়াল রিয়ালিটির গল্প

শিক্ষাক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর নিয়ে কাজ করেছেন দুই তরুণ—প্রদীপ্ত কুমার সাহা ও সাগর মজুমদার। ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি অনুসারে ভিআর কনটেন্ট তৈরি করে থাকে তাঁদের প্রতিষ্ঠান ‘নার্ডিজ’। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরও এই মাধ্যমে শিক্ষা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে লিখেছেন আজরাফ আল মূতী

একবার কল্পনা করুন, দেশের শিশুরা বিদ্যালয়ে বসেই শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ সম্পর্কে পড়ার পাশাপাশি ভার্চুয়াল রিয়ালিটিতে (ভিআর) সেগুলো দেখছে। শ্রেণিকক্ষ থেকে বের না হয়েও ভিআরের সাহায্যে ঘুরে দেখতে পারছে এই স্থানগুলো। সেসবের নকশা ও নির্মাণ সম্পর্কে শুধু মুখে মুখেই পড়ছে না, ভিআরের বদৌলতে সেগুলো চোখেও দেখছে।

বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়গুলো শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এরই মধ্যে একে বাস্তবরূপ দিয়েছেন একদল তরুণ। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এই তরুণরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান ‘নার্ডিজ’-এর মাধ্যমে শিশুদের জন্য নিয়ে এসেছেন ভিজ্যুয়াল লার্নিং প্রক্রিয়া এবং নতুন এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে এরই মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তিন হাজার শিশুকে। 

শুরুটা হলো যেভাবে
নার্ডিজের শুরুটা হয়েছিল প্রদীপ্ত কুমার সাহার হাত ধরে; ‘নার্ডিজের জন্ম ২০১৬ সালে, শুরুতেই নতুন কিছু নিয়ে কাজ করার চিন্তা করেছি।’

অনেক চিন্তাভাবনা শেষে কাজ করার মাধ্যম হিসেবে ভিআর প্রযুক্তিকেই বেছে নেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থী। চিন্তা করেন ভিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল লার্নিংয়ের সম্ভাবনার কথা।

এর পেছনে অবশ্য ছোট একটি গল্পও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে পড়ানো হচ্ছিল লালবাগ কেল্লা। পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবেই লালবাগে যাওয়ার সুযোগ হয় তাঁর। সেবারই প্রথম বুঝতে পারেন ভিজ্যুয়াল লার্নিংয়ের শক্তি। এ থেকেই মূলত এই ক্ষেত্র ও ভিআর প্রযুক্তিকে বেছে নেওয়া।

কিন্তু শুধু চিন্তা করলেই তো হবে না, চাই অর্থ, চাই যন্ত্রপাতি, চাই লোকবল, প্রয়োজন দক্ষতার।

প্রাথমিক অবস্থায়, নিজের টিউশনির আয় থেকেই কেনা হলো প্রথম ধাপের যন্ত্রপাতি। আর কাউকে সঙ্গে না পেয়ে একাই বের হয়ে পড়লেন কনটেন্ট তৈরি করার জন্য। নিজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও অনলাইন ঘেঁটে শিখতে শুরু করলেন ভার্চুয়াল রিয়ালিটি কনটেন্ট তৈরি সম্পর্কে। পাশাপাশি নিজের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত ফেইসবুকে পোস্টও করতেন তিনি। ফেইসবুকেই প্রথম প্রদীপ্তের কাজগুলো দেখেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আরেক শিক্ষার্থী সাগর মজুমদার। তিনিও যোগ দেন প্রদীপ্তর সঙ্গে। ফলাফল, ২০১৭ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘নার্ডিজ’।

নার্ডিজের সেবা
নার্ডিজ বিশ্বাস করে, কোনো কিছু সম্পর্কে শেখার সময় সেটিকে যদি চোখে দেখা যায়, তাহলে তা আরো ভালোভাবে শেখা সম্ভব। এই বিশ্বাস থেকেই ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন ভার্চুয়াল রিয়ালিটি কনটেন্ট তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, বধ্যভূমি, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান প্রভৃতির ভিআর কনটেন্টই রয়েছে নার্ডিজের ভাণ্ডারে।

এগুলো বাদেও বইমেলা অথবা পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবগুলোকেও ভিআর কনটেন্ট হিসেবে নিয়ে এসেছে নার্ডিজ।

এই ৩৬০ ডিগ্রি ভার্চুয়াল রিয়ালিটি কনটেন্টগুলোকে ভিআর হেডসেটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেখানোর ব্যবস্থা করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। নার্ডিজের তৈরি প্রতিটি কনটেন্টই ভিজ্যুয়াল লার্নিংভিত্তিক কনটেন্ট। প্রতিটি কনটেন্ট তৈরির সময় নার্ডিজ জাতীয় পাঠ্যসূচির নিয়মগুলো মেনে কাজ করে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী প্রদীপ্ত কুমার সাহা।

এই পর্যন্ত নিজেদের বানানো ভিডিওর সংখ্যা ষাটটি। সেসবের মধ্যে ২৫টি আবার দেশীয় বিষয় নিয়ে বানানো।

আগ্রহীরা চাইলে নার্ডিজের কনটেন্টগুলো সাবস্ক্রিপশন সেবার মাধ্যমে দেখতে এবং দেখাতে পারবেন। নার্ডিজের সঙ্গে কথা বলে পছন্দমতো কনটেন্ট তৈরি করিয়েও নেওয়া যায়। নার্ডিজের তরফ থেকেও ঘুরে ঘুরে ভিআর কনটেন্ট দেখানোর কাজটিও করা হয়ে থাকে। আপাতত শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম—এই দুই জেলায়ই সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে শুধু ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের এ ধরনের ভিআর কনটেন্ট দেখানো হতো। এখন সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতেও পৃষ্ঠপোষকের সহায়তায় সেবা দিচ্ছে নার্ডিজ। কাজটি করার জন্য ‘প্রজেক্ট রূপান্তর’ নামের আলাদা একটি প্রকল্প রয়েছে। ভবিষ্যতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরেও নিজেদের সেবা নিয়ে হাজির হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে নার্ডিজের।

নার্ডিজের ৩৬০ ডিগ্রির আলোকচিত্র ও ভিডিও দেখতে চাইলে যেতে পারেন এই ঠিকানায়—http://www.nerdiz.com/

অর্জন
নিজেদের কাজের জন্য এরই মধ্যে বেশ কিছু অর্জন রয়েছে নার্ডিজের। এসবের মধ্যে আছে—গ্রামীণফোনের উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা ‘জিপি অ্যাক্সিলেটর’-এর সেরা ১৩ প্রতিযোগীর একটি, বাংলালিংকের উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা ‘বাংলালিংক ইনকিউবেটর’-এর সেরা ১৩ প্রতিযোগীর একটি এবং ব্র্যাক সেন্টারের উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রতিযোগিতার বিজয়ী। এখানেই শেষ নয় সম্প্রতি ‘এন্টারপ্রেনারশিপ ওয়ার্ল্ডকাপ বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতার  সেরা দশ প্রতিযোগীর একটি হতে পেরেছে তারা। আর এটায় বিজয়ী হতে পারলে এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘এন্টারপ্রেনারশিপ ওয়ার্ল্ডকাপ’-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে নার্ডিজ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রতিষ্ঠানটিকে এমন কিছু চড়াই-উতরাই পার করতে হয়, যা আর দশটি প্রতিষ্ঠানের হয়তো করতে হয় না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রদীপ্ত কুমার সাহা বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই আমরা কী করি বা আমাদের সেবা ঠিক কিভাবে সহযোগিতা করতে পারবে, সেটি বলার আগে আমাদের ‘ভার্চুয়াল রিয়ালিটি’ নিয়েই আলোচনা করতে হয়। কনটেন্ট তৈরির সময় অনেকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারপর সঠিক পথটা খুঁজে বের করতে হয়। কারণ এই প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের দেশে তেমন একটা কাজ হয়নি, ফলে সুনির্দিষ্ট কোনো কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। এগুলো একদিক থেকে চিন্তা করলে বেশ আনন্দদায়ক।”

আর নার্ডিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ব্যাপারে প্রদীপ্ত বলেন, “আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে নার্ডিজকে শিক্ষাভিত্তিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা, যা ‘ইমারসিভ’ প্রযুক্তি (এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবিক দুনিয়াকে ‘সিমুলেশন’-এর মধ্যে প্রদর্শন করা যায়। এসবের মধ্যে আছে হলোগ্রাফ, থ্রিডি ডিসপ্লে প্রভৃতি।) নিয়ে কাজ করবে। বর্তমানে সামাজিক ইস্যু নিয়ে কাজ করলেও দিন শেষে নার্ডিজ কিন্তু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। আমরা আপাতত ভিআর দিয়ে শুরু করেছি; কিন্তু ধীরে ধীরে অগমেন্টেড রিয়ালিটি (এআর) এবং অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করব। এভাবে নিজস্ব শিক্ষাভিত্তিক প্রযুক্তি গড়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে আমাদের।”

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অপারেশন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সাগর মজুমদার বলেন, “নার্ডিজ বর্তমানে বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে কাজ করছে। এরই মধ্যে ‘ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে কাজ করে গাজীপুরে নিজেদের ভিআর এডুকেশন সেশন করেছি। এনজিওর সঙ্গে কাজ করার পেছনের কারণ দুটি। প্রথমত, এতে করে আমরা ওই এনজিওর অধীনে যে বিদ্যালয়গুলো রয়েছে, সেগুলোতে এ ধরনের সেশনগুলো সহজে করতে পারছি। আর দ্বিতীয়ত, এই সেশনের পেছনে যে খরচটা হচ্ছে, তা উঠে আসছে। ভবিষ্যতেও এভাবে কাজ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা রয়েছে। আমরা আরো বেশ কয়েকটি এনজিওর সঙ্গে কথা বলছি। ব্র্যাকের অধীনে তিন হাজারের মতো স্কুল রয়েছে, সে বিষয়টি নিয়েও চিন্তা করছি।”

নার্ডিজ পরিবার
নার্ডিজ পরিবারের মোট সদস্যসংখ্যা এখন ৯ জন। প্রত্যেকেই এখনো শিক্ষার্থী। সবাই মিলে নিজ নিজ দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন। প্রদীপ্ত কুমার সাহার কাছ থেকেই জানা গেল, শুরুতে কেউ-ই কাউকে চিনতেন না, নার্ডিজে কাজ করার সময় অনলাইনে একজন আরেকজনকে খুঁজে পেয়েছেন। নিজেদের টিম নিয়ে বেশ আশাবাদী প্রদীপ্ত। টিমের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি একই বিষয়ে সবাই দক্ষ না হয়ে, ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে দক্ষ হয়ে একটি কার্যকর টিম গড়ে তুলতে।’

শিশুদের মুগ্ধতাকে নিজেদের কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন নার্ডিজরা। ভিআর হেডসেট ব্যবহার করার পর শিশুর চেহারায় যে আনন্দ ফুটে ওঠে, সেটির সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না বলেই জানিয়েছেন প্রদীপ্ত ও সাগর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা