kalerkantho

সোমবার । ২২ জুলাই ২০১৯। ৭ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৮ জিলকদ ১৪৪০

ফেসবুক-ইউটিউব নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সরকারের, কী বলছেন ব্যবহারকারীরা?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৩০ জুন, ২০১৯ ২১:০২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফেসবুক-ইউটিউব নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সরকারের, কী বলছেন ব্যবহারকারীরা?

বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেছেন, সেপ্টেম্বর থেকে ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে।

তিনি বলেছেন, 'রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে যেকোনো ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু ফেসবুক বা ইউটিউবের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না, যেহেতু সেটা মার্কিন প্রতিষ্ঠান। সেখানকার স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে তারা পরিচালনা করে, তাই আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না।'

'কিন্তু আশা করছি, সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমরা এক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা অর্জন করবো। ফলে কেউ ইচ্ছা করলেই ফেসবুক-ইউটিউবে যা খুশি প্রচার করতে পারবে না।'

কীভাবে কাজ করা হবে
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বিবিসি বাংলাকে বলছেন, 'ফেসবুকের সঙ্গে আমার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে। ফেসবুক সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের আইন মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে।'

কিন্তু ফেসবুকে বা ইউটিউবে কেউ কিছু পোস্ট করলে কি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সেটা ব্লক করতে পারবে? ফেসবুক কি সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে? এই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলছেন, 'ফেসবুক যদি বাংলাদেশে তার প্রচলন রাখে, তাহলে ফেসবুক বাংলাদেশের আইনকানুন মেনে চলবে না, সেটা কেমন করে হবে?'

'আমার দেশে কি হবে, আমার দেশে কি হবে না, আমার দেশের মানুষ কি দেখবে বা দেখবে না, সেই সিদ্ধান্ত কি আমি নেবো না?'

এতদিন পর্যন্ত যা ছিল তা হলো এই : ফেসবুকে কোন কিছু আপত্তিকর বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী মনে করলে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি তা ফেসবুককে জানায়, এবং তার পর ফেসবুক পদক্ষেপ নেয়। বাংলাদেশের সরকার এখন তার চেয়ে বেশি কোন ক্ষমতার কথা বলছে?

মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলছেন, 'এখন পর্যন্ত পর্ন বা অন্য ক্ষতিকর ওয়েবসাইট বন্ধ করতে পারে সরকার। তবে ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমে কোন ক্ষতিকর উপাদান বন্ধ করতে হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করতে হয়। অনেক সময় তারা ব্যবস্থা নিলেও তাতে সময় বেশি লাগে। আবার অনেক সময় তারা কোন ব্যবস্থা নেয় না।'

"এই সমস্যা সমাধানে সরকার এসব কনটেন্ট রোধ করার সক্ষমতা অর্জন করার ব্যবস্থা নিয়েছে" - জানান তিনি।

কিভাবে এটা করা হবে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমেই সেটা করা হবে।

''ফেসবুক নিশ্চয়ই বাংলাদেশের আইন মেনে চলবে। সেই সঙ্গে আমাদের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো দৃশ্যমান না থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা হবে। সেটাই প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হবে।''

''সেই প্রযুক্তি এলে এসব কনটেন্ট যাতে দেশে দেখা না যায়, সেই ব্যবস্থা করা যাবে। সম্পূর্ণ ফেসবুক বন্ধ না করে সেখানকার খারাপ কনটেন্ট অপসারণ করা হবে। আমরা যেটাই চাইবো, সেটাই করা যাবে।''

বাংলাদেশের সরকার কেন এই উদ্যোগ নিচ্ছে?
এই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার পাল্টা প্রশ্ন করেন, ''আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশের কেউ পর্ন দেখবে আর সরকার সেটা মেনে নেবে? বাংলাদেশে কেউ জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটাবে, আর সরকার সেটা হতে দেবে?''

''আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো, যাতে জনগণ নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। প্রযুক্তিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।''

কিন্তু পর্ন বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের বাইরে সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রতিরোধেও এই ব্যবস্থা কাজে লাগানো হতে পারে, এরকম একটি আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।

মোস্তাফা জব্বার বলছেন, ''তেমন কোন ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেনি। বাংলাদেশ সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বাকস্বাধীনতা রক্ষা করে থাকে। সেই অধিকার কারো ক্ষুণ্ণ করা হয়নি।''

কিন্তু ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করার জন্য মামলা হয়েছে, বলে জানালে তিনি বলেন, ''সেটার জন্য আদালত আছে, আইন আছে। সেটার সাথে এই ব্যবস্থার কোন সম্পর্ক নেই।'' এ নিয়ে আশংকার কোন কারণ নেই বলে তিনি জানান।

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ
কিন্তু সরকারের এই ঘোষণার পরে ফেসবুক বা ইউটিউব ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফাহমিদা জামান ফ্লোরা নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''এটা তো সরাসরি মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা। কে ফেসবুকে কী লিখছে বা ইউটিউবে কি শেয়ার করবে, সেটা তার স্বাধীনতা। এখানে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি হচ্ছে হুমকির মতো, এটা তো একেবারে বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।''

অরুণিমা তাহসিন নামের আরেকজন ফেসবুক ব্যবহারকারী বলছেন, ''এটা নিশ্চয়ই উদ্বেগজনক। কারণ ফেসবুক হচ্ছে একটা ব্যক্তিগত জায়গা। সেখানে সরকার কর্তৃত্ববাদী আচরণ করতে পারে না।"

"আমার এই ব্যক্তিগত জায়গাতেও যদি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে তো আমাদের বলার মতো আর কোন জায়গাই থাকবে না'' - লেখেন তিনি।

এ নিয়ে বিবিসি বাংলার পাতায়ও অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মোরশেদ আলম নামে একজন লিখেছেন, শেষপর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটাও সত্য বলার জন্য উন্মুক্ত রইলো না।

বেলাল হোসেইন লিখেছেন, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এখন বাকি শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

রাফি আহমেদ লিখেছেন, এটা ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপরে হস্তক্ষেপ ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

মোমিনুর রহমান মন্তব্য করেছেন, খুনখারাপির চিত্র ভিডিও করে পোস্ট করায় সরকার অনেক সময়ই বিব্রতকর পরিবেশে পড়ছে, সেটা জনগণের জন্য ভালো হলেও সরকার পড়ে বেকায়দায়।

কিন্তু এভাবে নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব?
প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বিবিসি বাংলাকে বলছেন, এভাবে নিয়ন্ত্রণ করাটা অসম্ভব না, আবার খুব সহজও না।

তিনি জানান, বেশ কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেকটা থার্ড পার্টির মতো ফেসবুক বা ইউটিউবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙ্গে নিয়ন্ত্রণ নেয়া হয়ে থাকে। তখন এসব থার্ড পার্টি কনটেন্ট দেখতে পারে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

সুমন আহমেদ সাবির বলছেন ''কিন্তু সমস্যা হলো, কোন ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো কোন সংস্থাই চায় না, তাদের নিজেদের বা গ্রাহকদের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হোক। আর শুধু সরকারই নয়, অনেক সময় বিজনেস কোম্পানিগুলোও মার্কেটিং এর জন্য গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে। ফলে তারা কয়েকমাস পরপরই এসব সিকিউরিটি আপগ্রেড করে।''

''তখন যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রবেশ করতো, তারা আর ঢুকতে পারে না। তখন তাদের আবারো অনেক খরচ করে নতুন প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হয়। বাংলাদেশ সরকারকেও দেখা যাবে, এখন তারা সফল হলেও কয়েকমাস পরে আর তারা ফেসবুকে ঢুকতে পারছে না। তখন তাদের নতুন করে প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে হবে।''

তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশের সরকারই এভাবে চেষ্টা করেছে। অনেকে চেষ্টা করে একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছে।

কারণ পুরো ব্যাপারটি অনেক ব্যয়বহুল বলে তিনি জানান। এ জন্য কয়েকশো কোটি টাকা বিনিয়োগ শুরু হয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে।

বিবিসি বাংলা থেকে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা