kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

অ্যান্টিভাইরাস উপকারী না ক্ষতিকর?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৯ জুন, ২০১৯ ১০:৫৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অ্যান্টিভাইরাস উপকারী না ক্ষতিকর?

মডেল : সীমান্ত, ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

অ্যান্টিভাইরাস তো ভালোর জন্য ইনস্টল করা হয়। তাই বলে কি সব অ্যান্টিভাইরাসই ভালো? কখনো কখনো অ্যান্টিভাইরাসগুলোই বিভিন্নভাবে ক্ষতি করে। এসব অ্যান্টিভাইরাসের হাত থেকে কিভাবে নিজের ডিভাইসগুলো রক্ষা করবেন—জানাচ্ছেন তামজীদ রহমান লিও

কম্পিউটার ভাইরাস
কম্পিউটার ব্যবহার করেন অথচ ভাইরাস নিয়ে ঝামেলা পোহাননি, এমন ব্যবহারকারী খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর। কম্পিউটার ভাইরাস মূলত এক ধরনের প্রগ্রাম, যা অপারেটিং সিস্টেমের বিভিন্ন কাজে বাধা সৃষ্টি করে। এই বাধাদানকারী প্রগ্রামগুলো থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য রয়েছে অ্যান্টিভাইরাস। অ্যান্টিভাইরাসও হলো এক ধরনের সফটওয়্যার, যা ভাইরাসের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় করে। যদি কেউ শুধু বাণিজ্যিক সফটওয়্যার ব্যবহার করেন এবং ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা সফটওয়্যার ইনস্টল না করেন, তবে তাঁদের ক্ষেত্রে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা কম। আবার ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা বিভিন্ন থার্ড পার্টি প্রগ্রাম বা গেইম ইনস্টল করলেও ভাইরাস দেখা দিতে পারে। আর কম্পিউটারে অন্য কিছু প্রবেশ করালে যেমন সিডি, আলাদা হার্ডডিস্ক এবং বিশেষ করে পেন ড্রাইভের মাধ্যমে ফাইল আদান-প্রদানে ভাইরাস খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পথ হলো শুধু ওয়েবসাইট ও ই-মেইল।

ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ
কম্পিউটার ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বোঝা যায় কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণে। যেমন কম্পিউটার দেরিতে লোড নেওয়া, হার্ডডিস্কে বেড সেক্টর দেখানো, বিব ফাইলের আকার পরিবর্তন, ফ্রি মেমোরি কম দেখানো, হঠাৎ করে Error Message দেখানো, হার্ডডিস্কের পার্টিশন নষ্ট করে ফেলা, বায়োসের এবং হার্ডডিস্কের ডাটা মুছে ফেলা। সাধারণত কিছু কিছু ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়; কিন্তু এমন কিছু ভাইরাস রয়েছে, যেসব দীর্ঘদিন কম্পিউটারে থাকার পর হঠাৎ করেই কম্পিউটারকে আক্রমণ করে বসে। অনেকেই আবার এসব থেকে সুরক্ষা নিতে অ্যান্টিভাইরাস পছন্দ করেন না। পছন্দ না করারও সংগত কারণ রয়েছে। অ্যান্টিভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে, এটি কম্পিউটারের গতি কমিয়ে দেয়। কারণ ছাড়াই ভাইরাস অ্যালার্ট আর বারবার স্ট্যাটাস পপ-আপ দিয়ে বিরক্তও কম করে না। সেই সঙ্গে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার কিনতে গাঁটের পয়সাও খরচ করতে হয়। এমনকি প্রতিবছর নতুন আপডেটের সঙ্গে লাইসেন্স ফি হিসেবেও বেরিয়ে যায় বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ।

অ্যান্টিভাইরাসই যখন গুপ্তচর
এসব অ্যান্টিভাইরাসই যদি আপনার পিসিকে রক্ষা না করে আপনারই ওপর গুপ্তচরগিরি করে কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য হাতিয়ে নেয়, তাহলে নিশ্চয়ই তা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এই জাতীয় অ্যান্টিভাইরাসগুলোকে ‘গুপ্তচর’ বা ‘স্পাই’ অ্যান্টিভাইরাস বলা হয়। এগুলোর কার্যক্রম অন্য সব ভালো অ্যান্টিভাইরাসের মতোই বলে মনে হয়ে থাকে। কারণ, এগুলোও অন্য ক্ষমতাশালী অ্যান্টিভাইরাসগুলোর মতো ক্ষতিকর ম্যালওয়্যারের সংক্রমণ খুঁজে বের করে জাহির করে। এ ধরনের অ্যান্টিভাইরাসগুলো দিয়ে বিনা মূল্যেই স্ক্যান করা যায়, কিন্তু শনাক্তকারী ক্ষতিকর ম্যালওয়্যারগুলো ডিলিট করার জন্য নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ফি যেহেতু ক্রেডিট কার্ডের নাম্বার প্রবেশ করিয়ে পরিশোধ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর ক্রেডিট কার্ডের নাম্বার এবং টাকা গুপ্তচর অ্যান্টিভাইরাস পরিচালনাকারী দলের কাছে চলে যায়। পাশাপাশি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ব্যবহারকারীর পছন্দ-অপছন্দ, ক্যাশ-কুকিজ, ব্রাউজিং হিস্টোরি ইত্যাদি চুরি করে কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই। এ ছাড়া এটি ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয়। এটি বর্তমানে এক বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ ধরনের চক্রান্তকারী দলগুলোর সাধারণত প্রযুক্তিগত সহায়তা ও কাস্টমার সার্ভিস হটলাইন টিমও থাকে। আসলে এই অ্যান্টিভাইরাসগুলো ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে ভাইরাস নির্মূল বা শনাক্তকরণ জাতীয় কোনো কাজই করে না। এ জন্যই এগুলো অন্য যেকোনো ভালো অ্যান্টিভাইরাস অপেক্ষা দ্রুততর, যা একজন অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহারকারীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট।

সব ফ্রি কিন্তু ভালো নয়
ফ্রি অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করলে দেখবেন, এর পাশাপাশি বিভিন্ন থার্ড পার্টি সফটওয়্যার, ব্রাউজারে সার্চবার, অ্যাডঅন, অ্যাডওয়্যার ইত্যাদি ইনস্টল হয়ে যায়। সার্চবার টেকনিক্যালি ক্ষতিকারক নয়, তবে তা ব্যবহারকারীকে তাঁর পছন্দের সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখে। কিন্তু অ্যাডঅনগুলো অনেক ক্ষেত্রে খুবই বিপজ্জনক হয়ে থাকে। এই অ্যাডঅনগুলোর কোনোটি আবার ব্রাউজারে ব্যবহারকারীর ইনপুট করা ডাটা চুরি করে, আবার কোনোটি ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট গতিবিধির ওপর নজরদারি করে। অ্যাডওয়্যারগুলো ব্যবহারকারীকে জোরপূর্বক নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইটে ভিজিট করায় অথবা পপআপে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখিয়ে থাকে। অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করার সময় ব্যবহারকারী নিজের খামখেয়ালিপনার কারণেই এই থার্ড পার্টি অ্যাপগুলো ইনস্টল করে বিপদে পড়েন। আরেক ধরনের অ্যান্টিভাইরাস রয়েছে যেগুলো ‘স্কেয়ারওয়্যার’ নামে পরিচিত। এগুলো শুধু টাকা কামানোর উদ্দেশ্যেই ছাড়া হয়েছে। এ ধরনের অ্যান্টিভাইরাসগুলো সম্পূর্ণভাবে অনিষ্টকারী বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে, যার হাত থেকে ব্যবহারকারীর নিস্তার পাওয়া বেশ দুষ্কর। কিছু অ্যান্টিভাইরাস পরীক্ষাকারী ল্যাবরেটরি যেমন—ড্যানিশ টেকনোলজি ল্যাব, এভি কম্পারেটিভ, এভি টেস্ট ইত্যাদি অ্যান্টিভাইরাসকে অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রেখেছে। এ ধরনের অ্যান্টিভাইরাস ম্যালওয়্যারের বিপক্ষে কতটা প্রতিরক্ষা দিতে সক্ষম, এটা গবেষণাই তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, তাঁদের বেশির ভাগ পরীক্ষার ফলাফলই এসেছে বিপজ্জনক। ল্যাবে পরীক্ষিত এবং সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত অ্যান্টিভাইরাসগুলো ব্যবহার করতে হলে যেহেতু ব্যবহারকারীকে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হয়, তাই এখন বেশির ভাগ ব্যবহারকারী এ ধরনের নকল, ক্ষতিকারক অ্যান্টিভাইরাসের দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ছেন।  এমন কিছু অ্যান্টিভাইরাসও রয়েছে, যেগুলো কিছুদিন বিনা মূল্যে ব্যবহার করার পর আর ব্যবহার করা যায় না। তবে কিছু পরিমাণ ফি পরিশোধ করে নিবন্ধিত সংস্করণ করে সেটি আবার ব্যবহার করা যায়। যদি ফি পরিশোধ করেই অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করতে হয়, তাহলে স্বনামধন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করাই উচিত। এমন অ্যান্টিভাইরাস প্রতিষ্ঠান বাছাই করা উচিত, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিবাজারে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

অ্যান্টিভাইরাস ছাড়াই ইন্টারনেটে সতর্কতা
বিভিন্ন পর্নো সাইট ও ম্যালওয়্যারভিত্তিক অজানা সাইটগুলোও ভাইরাসের খনি। এগুলোতে ঘোরাঘুরির অভ্যাস থাকলে অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল না করার কোনো বিকল্প নেই। যাঁরা এসব সাইটে যান না, তাঁরা স্রেফ কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করলেই অ্যান্টিভাইরাস ছাড়াও নিরাপদ থাকতে পারবেন।

ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে পপআপ। মনোযোগ দিয়ে কোনো ওয়েবপেজ ব্রাউজ করছেন, তখন অনাকাঙ্ক্ষিত ঠিকানাহীন কিছু পেজ বারবার এসে আপনার সাধারণ কাজ ব্যাহত করে। এসব বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুয়া সাইট। পপআপমুক্ত পিসি পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই পপআপ প্রটেকশন সফটওয়্যার ইনস্টল করতে হবে। মজিলা ফায়ারফক্সসহ বেশ কয়েকটি ব্রাউজারের সঙ্গেই দেওয়া থাকে পপআপ ব্লক করার উপায়। এ ছাড়া ইন্টারনেট থেকে বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যায় পপআপ প্রটেকশনসহ টুলবার। এ ক্ষেত্রে গুগল ক্রোমের পপআপ ব্লকার প্লাগইনটি যেকোনো ব্যবহারকারীর জন্য ভালো সমাধান হতে পারে। এখনকার বেশির ভাগ ব্রাউজারের সিকিউরিটি কন্ট্রোল আছে। ডাউনলোড করার সময়ই এসব ব্রাউজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাইরাস আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। ব্রাউজারে বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরাস টুল যোগ হওয়ায় এসব ব্রাউজার নিজেই অনেক ভাইরাস প্রবেশে বাধা দেয়। এ জন্যই ভালো ব্রাউজারে ভাইরাস আক্রমণের হার অনেক কম। তাই অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ঝামেলা এড়াতে ব্রাউজারের সর্বশেষ সংস্করণটিই ব্যবহার করা শ্রেয়। এ ক্ষেত্রে ফায়ারফক্স, ক্রোম বা সাফারি ব্যবহারেও আপনি ব্রাউজারটি আপডেট করে নিতে পারবেন। কখনো জেনেশুনেও যদি ক্ষতিকর কোনো সাইট খুলতে চান, সে ক্ষেত্রেও প্রচলিত অনেক ওয়েবব্রাউজার স্ক্রিনে সেটি দেখানোর আগেই সতর্ক করে দেবে। ইন্টারনেট সার্ফিং করার সময় আরো বেশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ম্যাকাফি সাইট অ্যাডভাইজার টুল (www.siteadvisor.com) ব্যবহার করা যেতে পারে। এই টুল সার্চ রেজাল্টের সঙ্গে ক্ষুদ্র সাইট রেটিং আইকন দেখায় এবং ব্রাউজারে একটি নতুন ব্রাউজার বাটন ও অপশনাল সার্চ বক্স অপশন যোগ করে। এই দুটি অপশন একত্রে ভালো কাজ করে। কোনো বিপজ্জনক সাইটে ঢোকার আগে সতর্ক করে দেয়। এ ছাড়া সব ধরনের ফাইল ই-মেইল থেকে বা ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করার সময় সতর্ক থাকতে হবে, অপরিচিত ই-মেইল এটাচমেন্ট এবং অপরিচিত সাইটগুলো পরিহার করতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা