kalerkantho

বাংলা বলে লি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ১০:২০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলা বলে লি

বাম থেকে দলনেতা নওশাদ সজীব, মেহদী হাসান, জিনিয়া সুলতানা, সামিউল হাসান, সাইফুল ইসলাম। ছবি : আশকার আমিন রাব্বি

তিন বছরের চেষ্টায় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পাঁচ শিক্ষার্থী তৈরি করেছে এক হিউম্যানোয়েড রোবট। ‘লি’ নামের এই রোবট দুই পায়ে হাঁটতে পারে, বলতে পারে বাংলা। বিস্তারিত ইয়াহইয়া ফজলের কাছে

স্পট উচ্চারণ শুরুতেই জানিয়ে দিল, ‘আমি বাংলায় কথা বলতে পারি। হাঁটতেও পারি। আমার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানুষের উপকার করতে চাই।’

মঙ্গলবার বিকেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনের ল্যাবে ‘কথা হয়’ ‘লি’র সঙ্গে।

লির হাঁটার ধরন দেখে মনে পড়ে গেল জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিক ‘রোবোকপ’-এর সেই রোবকপের কথা। মানুষের আদলে তৈরি এই রোবট শুধু হাঁটতেই পারে না, হাত দিয়ে অভিবাদন, হ্যান্ডশেক থেকে শুরু করে মানুষের মতোই বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিও করতে পারে। নিয়ম করে চোখের পলক ফেলে, কথা বলার সময় ঠোঁট দুটিও নড়ে ওঠে মানুষের মতোই।

বাংলা বর্ণমালা থেকে হারিয়ে যাওয়া ‘৯’-এর মতো দেখতে স্বরবর্ণ ‘লি’-কে বাঁচিয়ে রাখতে এমন নামকরণ।

২০ এপ্রিল শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘সাস্ট টেক ফেস্টে’ এ আলোড়ন তুলেছে লি।

লির উচ্চতা ৪ ফুট ১ ইঞ্চি (১২৬ সেমি)। ওজন ৩০ কেজি। বাংলা বুঝতে ও বাংলায় কথা বলতে পারে। প্রশ্ন করা হলে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে উত্তর দিতে পারে। বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রশ্নের সে উত্তর দিতে পারে। এই রোবটটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি ডিভিশনের ইনভেশন ফান্ড এর অর্থায়ন করেছে।

ওরা পাঁচজন
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রাইডে ল্যাবের পাঁচ সদস্যের দল প্রায় তিন বছর পরিশ্রম করে লি নামের রোবটটি তৈরি করেছে। নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নওশাদ সজীব। দলের অন্য সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের মেহেদী হাসান, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাইফুল ইসলাম, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সামিউল ইসলাম এবং জিনিয়া সুলতানা। আর মাথার ওপর ছায়া হয়ে সব সময় ছিলেন ফ্রাইডে ল্যাবের প্রধান উপদেষ্টা জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

রোবো সাস্ট
লির গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রোবটিক ক্লাব ‘রোবো সাস্ট’-এর জন্মের গল্পও। দলনেতা নওশাদ সজীব সেই গল্প শোনাতে শুরু করেন, ‘২০১১ সাল থেকে রোবট নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু। দুই বছর পর ২০১৩ সালে গঠন করি ‘রোবো সাস্ট’। শুরুতে ২০-২৫ জন সদস্য ছিল। পরে অনেকের উৎসাহে ভাটা পড়ে, সদস্য সংখ্যা কমে যায়। তবে আমরা কয়েকজন লেগে ছিলাম।’

২০১৩ সালে তাঁরা তৈরি করেন ‘সাস্টু-ওয়ান’। সেই রোবটের পরবর্তী সংস্করণ ‘সাস্টু-টু’ তৈরি হয় দুই বছর পর। প্রথমটির কার্যক্ষমতা অতটা না হলেও সাস্টু-টু লিখতে পারত। পরের বছর তাঁরা তৈরি করেন ‘রিবো’। লিখতে পারার পাশাপাশি রিবো ঘুরে তাকানো এবং বাংলা বুঝে উত্তর দিতে পারত। এসবেরই ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় ‘লি’। 

লি’র লি হয়ে ওঠা
লির নকশার কাজে ভূমিকা রেখেছেন মেহেদী হাসান। তিনি বললেন, ‘এর আগে ‘রিবো’ বানিয়েছিলাম। তাতে পিভিসি, প্লাস্টিক—এসব ব্যবহার করা হয়। তাই সেটি দেখতে সুন্দর হয়নি। লি বানানোর সময় আমাদের মাথায় ছিল সেটি যেন দেখতে সুন্দর হয়। লির শরীর তৈরিতে তাই অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়। পা দুটি সংযোজন করার পর আমরা লি’র ওপরের অংশের কাজ শুরু করি। রোবটের ওপরের অংশের ইলেকট্রিক দিকগুলো দেখছিল সাইফুল আর সামিউল ব্যস্ত ছিল রোবটের হাত নিয়ে। তখন লি’র মুখমণ্ডল তৈরির চিন্তাভাবনা শুরু করি।’

মুখমণ্ডলের নকশা করতে গিয়ে মেহেদী দেখলেন ঘুরেফিরে চেহারা কেমন যেন কাটখোট্টা হয়ে যাচ্ছে। তখন ড. জাফর ইকবাল স্যারের সঙ্গে পরামর্শ করে ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে রোবটের মুখমণ্ডলের ডিজাইন আহ্বান করেন। কিছু ডিজাইন জমা পড়লেও পছন্দ হয়নি তাঁদের। মেহেদী হাসান বললেন, ‘পরে আবার চেষ্টা করে নিজেরাই একটা ডিজাইন করলাম। পরে সেটা থ্রিডি প্রিন্টারে প্রিন্ট করি। দেখা গেল সেটায় খানিকটা মানবিক রূপ এসেছে।’

রোবট তৈরির সময় যান্ত্রিক বিষয়গুলো অনেকটাই সামলেছেন সামিউল হাসান। শুরুর দিকে সিমুলেশন নিয়ে কাজ করেছিলেন সামিউল। এসবের মধ্যে ছিল রোবটটির হাঁটা, ভারসাম্য রাখার বিষয়গুলো। এরপর যখন মেকানিক্যাল কাজ শুরু হলো, তখন লি’র পায়ের জয়েন্টগুলো নিয়ে কাজ করছেন সামিউল, ‘হাতগুলো আমার বানানো। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল যন্ত্রপাতি জোগাড় করা। এতেই আমাদের এক বছরের মতো সময় লেগে গেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনের ল্যাবের যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করে তাঁরা কাজ সেরেছেন। কিন্তু সেগুলো এতটা শক্তিশালী ছিল না। ফলে কষ্ট হয়েছে বেশি। সেই অভিজ্ঞতা জানালেন তিনি, ‘অনেক সময় দেখা গেছে কঠিন কোনো বস্তু ড্রিল করছি, মেশিনটা সেরকম শক্তিশালী না হওয়ায় ফসকে আমার হাতে লেগে কেটে গেছে।’ নানা সীমাবদ্ধতার পর সাফল্যের অনুভূতি জানালেন সামিউল, ‘যখন একসময় রোবট সত্যি সত্যি পা ফেলে হাঁটল, তখন যে কী রকম লাগছিল সেটা বলে বোঝাতে পারব না।’

যেভাবে কথা বলে লি 
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কে? জাতির জনক কে? কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস কবে? এমন সহজ প্রশ্নগুলোর উত্তর অনায়াসে দিতে পারে লি। তোমার দেশের নাম কী? এমন প্রশ্নের জবাবে সে কিছুক্ষণ নিয়ে বলে, ‘আমার দেশের নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ আমাকে খুব ভালোবাসে।’

আবার কোনো প্রশ্ন না বুঝলে তার সরল স্বীকারোক্তি, ‘আমি বুঝতে পারিনি। আবার বলো।’

কিভাবে রোবটটি কথা বলে কিংবা উত্তর দেয় সে বিষয়টি খোলাসা করে বললেন রোবটটির উদ্ভাবক দলের নেতা নওশাদ সজীব, ‘লি-কে প্রশ্ন করা হলে প্রথমে গুগল এপিআইয়ের মাধ্যমে গুগল ভয়েস রিকগনাইজেশন দিয়ে সেই প্রশ্নটিকে টেক্সটে রূপান্তরিত করা হয়। পরে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রগ্রাম মডিউল সেই টেক্সটির অর্থ বুঝে উত্তর তৈরি করে। তারপর টেক্সট টু স্পিচের মাধ্যমে লি উত্তর দেয়।’

লি-কে কথা বলানোর কাজটি করেছেন দলের একমাত্র নারী সদস্য জিনিয়া সুলতানা। সেই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন, ‘রোবটটি বাংলায় যাতে কথা বলতে পারে, অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছি। রোবটটিকে সংগীত, কবিতা ইত্যাদিও শেখানো হয়েছে। সাধারণত বাসাবাড়ি ও অফিসে যেসব বাক্য বা ভাষা ব্যবহার হয়—এমন সব ভাষা তাকে শেখানো হয়েছে।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দেশে রোবট নিয়ে তো অনেকেই কাজ করছেন। তাঁদের রোবটের চেয়ে লি কেন আলাদা? এমন প্রশ্নের জবাবে নওশাদ বলেন, ‘আমাদের রোবট হাঁটতে পারছে। অল্প অল্প করে, আস্তে আস্তে করে হলেও লি হাঁটতে পারে। এটা আমরা তৈরি করতে পেরেছি। আমাদের দেশে এটি প্রথম। আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা বাংলায় একটা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছি। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও আমাদের রোবট অনেক প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে দিতে পারছে।’

লি বা রোবট নিয়ে তাঁদের পরবর্তী পরিকল্পনা কী সেটাও টেকবিশ্বকে জানালেন সজীব, ‘সত্যি বললে পরবর্তী লক্ষ্যটা আসলে আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কারণ এই রোবট উদ্ভাবনে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এরপরে আমরা নিশ্চয়ই এরচেয়ে ভালো রোবট তৈরি করতে চাইব। তার মানে আমাদের বাজেট হতে হবে কোটি টাকা বা ওই অঙ্কের কাছাকাছি। সুতরাং চাইলেই আমরা আর এভাবে খুব বেশি এগোতে পারব না। এই অবস্থায় সরকারের সহযোগিতা দরকার।’

এই রোবট তৈরি করতে পেরে নিজেরা যে আত্মতৃপ্তি পেয়েছেন সে কথা জানাতে ভুললেন না নওশাদ, ‘এখন আমরা জানি কিভাবে হিউমেনয়েড রোবট বানাতে হয়। কিভাবে রোবটকে হাঁটাতে হয়, প্রগ্রামিংসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি আমাদের কাছে আছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে জাপানের হোন্ডা কম্পানির তৈরি আসিমো রোবটের মানের রোবট বানাতে চাই।’

মন্তব্য