kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

সক্ষমতা বাড়ানোই চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যালেঞ্জ

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সক্ষমতা বাড়ানোই চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হচ্ছে। ফাইল ছবি

বর্তমান সরকার দেশে যে বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাতে পণ্য ওঠানামার এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি আরো অনেক গুণ বাড়বে। কিন্তু এই সময়ে অর্থাৎ ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে যোগ হবে না নতুন জেটি বা টার্মিনাল। তবে যোগ হবে আধুনিক অনেক যন্ত্রপাতি। ফলে সক্ষমতা বাড়িয়ে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই হবে নতুন বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল স্বীকার করছেন, ২০১৮ সালে নতুন করে জেটি বা টার্মিনাল কার্যক্রম শুরু করা হবে না। এ জন্য বছরটিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে পণ্য ওঠানামা গতিশীল রাখাই হবে তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে এ বছরই যোগ হবে ২০ হাজার একক কনটেইনার রাখার ইয়ার্ড, ‘ফলে পণ্য ওঠানামায় গতি আসবে। আর চলতি বছরই আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ হবে। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্ট্যাডল ক্যারিয়ার, ক্রেনসহ ৫১টি যন্ত্রপাতি যোগ হবে। সেগুলো যোগ হলে পণ্য ওঠানামায় গতি অনেক বাড়বে। এ ছাড়া কাস্টমস ও বন্দর ব্যবহারকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং শ্রমিকদের দক্ষভাবে গড় তুলে পরিস্থিতি সামাল দেব।’

চট্টগ্রাম বন্দরের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নকারী জার্মানির এইচপিসি হামবুর্গ (হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিং জিএমবিএইচ) পূর্বাভাসে বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামা প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সক্ষমতা ২০১৮ সালের আগেই পূর্ণ হবে। এই সময়ের মধ্যে নতুন টার্মিনাল কার্যক্রম শুরু না হলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে আর এতে সংকটে পড়বে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জাহাজগুলো বন্দরে ভিড়তে পারবে না। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। ইতিপূর্বে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজাম উদ্দিনও ২০১৮ সালে পায়রা সমুদ্রবন্দর কিংবা অন্য কোনো স্থানে বাড়তি জাহাজ সরানোর কথা বলেছিলেন।

এইচপিসি হামবুর্গের হিসাবে, ২০১৮ সালে বন্দরের মোট সক্ষমতা থাকবে ২৩ লাখ ৭০ হাজার একক, আর সে বছর পণ্য ওঠানামা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২৩ লাখ ৯৮ হাজার একক। ফলে ২০১৮ সালেই সক্ষমতা অতিক্রম করবে চট্টগ্রাম বন্দর। ২০১৯ সালে সক্ষমতা থাকবে ২৩ লাখ ৮০ হাজার একক, আর পণ্য ওঠানামা হবে ২৬ লাখ ৪৬ হাজার একক।

মাস্টারপ্ল্যানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে সক্ষমতার অন্তত ৩২৬ একক কনটেইনার বেশি আসবে বন্দরে। ফলে বিদ্যমান জেটি-টার্মিনাল দিয়ে সেগুলো ওঠানামা করা সম্ভব হবে না। বাড়তি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং করার জন্য মাস্টারপ্ল্যানে জোর তাগাদা দেওয়া হয়েছে কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল (কেসিটি) এবং বে কনটেইনার টার্মিনাল (বিসিটি) পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বে টার্মিনালকে অগ্রাধিকার বা ফাস্ট ট্র্যাক তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও এখন পর্যন্ত নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলছেন, ‘অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে দেশে ব্যবসা বাড়ার গতি ১৬০ মাইল, এর বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ৬০ মাইল হলে তো চলবে না। সেই গতিতে আমাদের এগোতে হবে। গত ৪০ বছরে জেটির দরকার ছিল ৬০টি। নির্মিত হয়ে হয়েছে সাতটি। এর ফলে বড় জাহাজে প্রতিদিন ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। এই টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা তো ভুক্তভোগী হচ্ছেন; আর দিন শেষে ভোক্তাকেই এই টাকা দিতে হচ্ছে।’

এদিকে জাহাজজট, বাড়তি সময় বহির্নোঙরে জাহাজ বসে থাকা, পণ্য পরিবহন ধর্মঘটের পরও ২০১৭ সালের প্রায় প্রতি মাসেই পণ্য ওঠানামায় নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। শুধু তা-ই নয়, কনটেইনার ওঠানামার সূচক বিবেচনায় বিশ্বের ১০০ বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৭১ নম্বরে। ২০১৫ সালে ছিল ৭৬তম আর ২০০৮ সালের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৯৮তম। কনটেইনার ওঠানামার সূচক বিবেচনায় বিশ্বের সেরা ১০০টি বন্দরের তালিকাটি তৈরি করেছে শিপিংবিষয়ক ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম ‘লয়েডস লিস্ট’। গত সেপ্টেম্বরে এ তালিকা প্রকাশিত হয়। বন্দরের ভেতর বছরের পর বছর পড়ে থাকা পণ্যের নিলামকাজে বেশ গতি এসেছিল ২০১৭ সালে। পণ্য নিলামে তুলে প্রচুর স্থান খালি হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরে। নতুন বছরে কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পও আলোর মুখ দেখছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত এই খননকাজ শুরু হবে। এতে বন্দর জেটিতে বড় জাহাজ ভেড়া অনেক নিরাপদ ও সহজ হবে।

জুনিয়র চেম্বার চিটাগাংয়ের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, আগে ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা না বাড়ায় বর্তমান বোর্ড ও চেয়ারম্যানের ওপর চাপটা বেশি পড়েছে। এখন পণ্য ওঠানামা গতিশীল করতে অগ্রাধিকার ঠিক করতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন জোর দিতে হবে।

নতুন বছরে সদরঘাট লাইটার জেটি চালু এবং ১৫ নম্বর ঘাটের পাশে আরো লাইটার জেটি চালুর আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম সামশুজ্জামান রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য যে হারে বাড়ছে সে হারে সক্ষমতা বাড়েনি ঠিক; কিন্তু সক্ষমতা একেবারে বাড়েনি এই তথ্য সঠিক নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নিরলস কাজ করছেন বর্তমান চেয়ারম্যান এম খালেদ ইকবাল। তিনি বলেন, নতুন বছরে বন্দরের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ করে জেটিতে পণ্য ওঠানামার গতি বাড়ানো, লাইটার জাহাজ সংকট কাটানো এবং ঘাটগুলো আধুনিকায়ন করে পণ্য পরিবহন খরচ কমিয়ে আনা। আর এনসিটি পুরোদমে চালু করা।

জাহাজজট উন্নতির উদ্যোগের পাশাপাশি বন্দরের ভেতর পণ্য ওঠানামা ব্যবস্থাপনার উন্নতির তাগাদা দিচ্ছেন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন। তিনি পরামর্শ দেন পণ্য ওঠানামায় গতিশীলতা আনতে বন্দরের ভেতর এলসিএল কনটেইনার মূল চত্বর থেকে সরিয়ে নেওয়ার। এ ছাড়া প্রতিটি গেটে পৃথক স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনেরও তাগাদা দেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা