kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

সেক্টর-১১

শরীরের রক্তে বালতির অর্ধেকটাই ভরে গিয়েছিল

মো. ওসমান গণি তালুকদার, গ্রাম-গাভারকান্দা, উপজেলা-বারহাট্টা, জেলা-নেত্রকোনা। এক মাস ট্রেনিং করেন ভারতের তুরাতে। যুদ্ধ করেছেন ধর্মপাশা, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বিজয়পুর এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শরীরের রক্তে বালতির অর্ধেকটাই ভরে গিয়েছিল

ওসমান গণি তালুকদার। বাবা আব্দুল মজিদ তালুকদার ছিলেন মাতব্বর প্রকৃতির লোক। চৌদ্দ পুরুষের ছিল তালুক সম্পত্তি। তাই নামের শেষে বসেছে ‘তালুকদার’।

বিএ ফাইনালের প্রস্তুতি চলছে তখন। ওসমান গণি নেত্রকোনা কলেজ হোস্টেলে। ওসমানরা হোস্টেলের রেডিওতে শোনেন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি।

২৫ মার্চ ১৯৭১। পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করে ঢাকায়। ফলে জীবন বাঁচাতে মানুষ চলে যেতে থাকে সীমান্তের ওপারে, ভারতে। নেত্রকোনায় পাকিস্তানি সেনারা আসে এপ্রিলের শেষে। এর আগেই ওসমান গণিরা শহর ছেড়ে চলে যান গ্রামে।

বাঁচতে হলে লড়াই করেই বাঁচব। স্বাধীনতার জন্য তাই একদিন তিনি ঘর ছাড়েন। ফুফুর বাড়িতে যাওয়ার নাম করে বিজয়পুরের বর্ডার পার হয়েই নাম লেখান ভারতের মহাদেও ইয়ুথ ক্যাম্পে। দায়িত্বে ছিলেন হাবিবুর রহমান খান। সেখানে কিছুদিন চলে লেফট-রাইট। এরপর ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয় তুরাতে।

ট্রেনিং শেষে ওসমান গণিদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় রণক্ষেত্রে। তাঁদের কম্পানির কমান্ডার ছিলেন ইসলাম উদ্দিন খান আর টোয়াইছি আবুল হোসেন। স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি সেনাদের পুঁতে রাখা মাইনের আঘাতে তাঁর ডান পা উড়ে যায়। সেদিনের দুঃখ-স্মৃতি আজও তাঁকে আনমনা করে দেয়। রক্তাক্ত ওই দিনের কথা বলেন মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণি— “আমরা তখন বাগমারায়, হাইট আউটে। সঙ্গে ৬০ থেকে ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে অপারেশন করে আবার ক্যাম্পে ফিরে আসতাম। পরে ভারতীয় সেনারাও যোগ দেয় আমাদের সঙ্গে। ওখানে যৌথ বাহিনীর কমান্ডে ছিলেন মেজর মুরারি। উনি আমাকে বিজয়পুর অ্যাটাকের নির্দেশ দেন। সেখানে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী ঘাঁটি। গ্রুপ নিয়ে বিজয়পুরের কাছাকাছি থেকে ক্যাম্পের দিকে গুলি শুরু করি ৩ ডিসেম্বর। গোলাগুলি চলে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ওই দিন রাত ১২টার পর আমরা পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে নেমে আসি।

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। ভোরবেলা। ওদের ফার্স্ট ক্যাম্পের পূর্ব দিকে প্রথম অ্যাটাক করি। ওরা পালাতে শুরু করে। ক্রলিং করে সামনে এগিয়ে একটি বাংকার দখলে নিই। এর আগেই ওরা ক্যাম্প ছেড়ে পিছু হটে, আশ্রয় নেয় দুর্গাপুরে।

বাংকারগুলো আমরা সার্চ করছিলাম। সামনে কয়েকজন। পেছনে আমি। সবাইকে সতর্ক থাকতে বলি। একটি বাংকার থেকে অন্য একটি বাংকারে যাওয়ার ছোট্ট একটি রাস্তা। অন্যদিক দিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। চলে যাওয়ার আগে ওরা সেখানে মাইন পুঁতে গিয়েছিল। হঠাৎ একটি মাইনে পা পড়তেই বিকট শব্দ হয়। চারদিকে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া। উড়ে গিয়ে একটি গাছের ডালের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে আমি মাটিতে আছড়ে পড়ি।

ভেবেছি ওরা অ্যাটাক করেছে। ডান পায়ের দিকে চোখ পড়তেই দেখি পা-টি হাঁটুর ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চামড়ার সঙ্গে তা লেগেছিল কোনো রকমে। স্প্লিন্টারে বিদ্ধ হয় বাঁ পা ও ডান হাতের আঙুল। আমি গোঙাচ্ছিলাম। জ্ঞান তখনো ছিল। সহযোদ্ধাদের ডেকে হাতে হাত রেখে শপথ করিয়েছিলাম : ‘হয়তো মরে যাব; কিন্তু তোমরা কথা দাও—দেশটা স্বাধীন করবে।’ মুক্তিযোদ্ধারা সে কথা রেখেছিল। আর তাইতো আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি।

একটি দরজার পাল্লায় সহযোদ্ধারা আমাকে তুলে নিয়ে যায় বাগমারা ক্যাম্প হাসপাতালে। সেখানেই ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়। শরীরের রক্তে ওই দিন বালতির অর্ধেকটাই ভরে গেছিল।”

পায়ের চিকিত্সার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণিকে পাঠানো হয় পুনা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। ওখানে এসেছিলেন ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। উনি ওসমানের কেবিনে আসেন। জানতে চান আহত হওয়ার পুরো ঘটনাটি। সব শুনে তিনি শুধু ওসমান গণির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। হাসপাতালের পাশেই ছিল ইন্দিরা গান্ধীর জনসভা। বিকেলে সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওসমানের নাম উচ্চারণ করেই তিনি বলেছিলেন, ‘যে দেশে ওসমানের মতো হাজার হাজার সাহসী বীরের জন্ম, সে দেশকে তো দমানো যায় না।’ শুনে মনটা ভরে যায় তাঁর। পরে পুুনা ফিল্ম স্টুডিওর চেয়ারম্যান ইন্দিরার সঙ্গে ওসমানের ছবিটি পাঠিয়ে দেন। ওই ছবি আজও একাত্তরের স্মৃতি হয়ে আছে।

দেশের জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কষ্ট করে যেতে হবে মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণিকে। তবু তাঁর সাফ কথা, ‘সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছি, সুবিধা পাওয়ার আশায় নয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তো রাষ্ট্রীয় কোনো প্রটোকল নেই। এটাই খারাপ লাগে।’

 

মন্তব্য