kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

সেক্টর-১০

‘অপারেশন জ্যাকপট’ ছিল সমন্বিত আক্রমণ

নৌ কমান্ডো খলিলুর রহমান, গ্রাম-ভাতশালা, উপজেলা-দেবহাটা, জেলা-সাতক্ষীরা। তিন মাসের নৌ কমান্ডো ট্রেনিং নেন ভারতের পলাশীতে, ভাগীরথী নদীর তীরে। অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় অপারেশন করেন মোংলা বন্দরে

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘অপারেশন জ্যাকপট’ ছিল সমন্বিত আক্রমণ

“আটজন বাঙালি সাবমেরিনার ফ্রান্স থেকে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে চলে আসেন ভারতে। ভারতীয় নৌবাহিনীর সহযোগিতায় তাঁরা সমন্বিত একটি দল গঠন করার উদ্যোগ নেন। ক্যাম্পে তখন পাঁচ হাজারের মতো যুবক। এর মধ্য থেকে আমিসহ ১২০ জনকে সিলেক্ট করেন তাঁরা।

টাকি থেকে প্রথমে কল্যাণী এবং পরে ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় পলাশীতে। সেখানে ভাগীরথী নদীর তীরে ক্যাম্প করা হয়। প্রথমেই শপথ নিই, ‘দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উত্সর্গ করেই আমি স্বেচ্ছায়, স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই আত্মঘাতী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি।’ ট্রেনিংয়ে ভারতীয় নৌবাহিনী আমাদের শেখায় বিশেষ ধরনের সাঁতার। নৌবাহিনীর তিন বছরের ট্রেনিং আমরা নিই তিন মাসে।

প্রশিক্ষণ শেষেই পরিকল্পনা হয় চট্টগ্রাম, মোংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর একই দিন একই সময়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর। সমন্বিত এই আক্রমণের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন জ্যাকপট’। প্রশিক্ষিত যোদ্ধা ছিলাম ১৬০ জন। চট্টগ্রামের জন্য ৬০ জন, মোংলার জন্য ৬০ জন, চাঁদপুরের জন্য ২০ জন ও নারায়ণগঞ্জের জন্য ২০ জন করে চারটি গ্রুপ গঠিত হয়। মোংলা বন্দরের গ্রুপে ছিলাম আমি। কমান্ডার ছিলেন আহসান উল্লাহ বীরপ্রতীক।

৭ আগস্ট ১৯৭১। আমাদের নেওয়া হয় বেরাকপুর ক্যাম্পে। সেখানে গঙ্গা নদীতে একটি জাহাজ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। পরে ক্যানিং থেকে নৌকায় রায়মঙ্গল নদ পার হয়ে সুন্দরবনের ভেতর কৈখালী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছি।

পরে ক্যাম্প করা হয় সুতারখালীতে। সেখানে ২০ জন করে তিনটি দলে ভাগ হই। দলগুলোর উপদলনেতা—মজিবর রহমান, আফতাব উদ্দিন ও আমি। আমাদের সাপোর্টিংয়ের জন্য আসেন ২০ জন গেরিলা। তাঁদের কমান্ডার ছিলেন খিজির আলী বীরবিক্রম। অতঃপর আমরা নির্দেশের অপেক্ষায় থাকি।

চারটি বন্দরে আক্রমণের জন্য সব কটি গ্রুপকে একসঙ্গে নির্দেশ প্রদান করা হবে। এ জন্য প্রতিটি গ্রুপকে দেওয়া হয় একটি করে রেডিও। বলা হলো, তোমরা ১৩ আগস্ট থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে আকাশবাণী ‘খ’ কেন্দ্র শুনবে। যেকোনো দিন পঙ্কজ মল্লিকের কণ্ঠে তোমাদের একটা গান শোনানো হবে। গানটি হলো, ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান...।’ এই গান শুনলেই বুঝতে হবে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ২৪ ঘণ্টা বা তারও পরে শোনানো হবে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটি গান, ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি...।’ এই গানটি হলে বুঝতে হবে ওই দিনই টার্গেটে হিট করতে হবে।

১৩ আগস্ট ১৯৭১। রেডিওতে শুনি প্রথম গানটি। কিন্তু দ্বিতীয় গানটি শোনানো হলো ৪৮ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১৫ আগস্ট সকালে। আহসান উল্লাহ সাহেব সবাইকে ডেকে নির্দেশ দিলেন হিট করার। আমরা প্রস্তুত হয়ে নিলাম। সাঁতার কাটার জন্য পায়ে শুধু ফিন্স ও একটি সুইমিং কস্টিউম পরা। গামছা দিয়ে শরীরে পেঁচিয়ে নিলাম মাইনটি। জাহাজের গায়ে মাইন লাগানোর জন্য সঙ্গে ছিল একটি ডেগার।

রাতে নৌকায় করে রওনা হয়ে ভোরের দিকে পৌঁছলাম মোংলা বন্দরের অপর তীরে, বানিশান্তা গ্রামে। আমরা অবস্থান নিই বেড়িবাঁধের নিচে। তখন সূর্য উঠছে। শরীরে সরিষার তেল মেখে কস্টিউম পরে নিই। বুকে মাইন বেঁধে পানিতে নেমে প্রকাশ্য দিবালোকেই আমরা অপারেশন করি। বন্দরের জাহাজগুলোতে মাইন লাগিয়ে যে যার মতো দ্রুত সরে পড়ি। পানির ওপরে তখন পাকিস্তানিদের গানবোট। সকাল তখন ৯টার মতো। একে একে বিস্ফোরিত হতে থাকে মাইনগুলো। ওই অপারেশনে চারটি বন্দরের মোট ২৬টি জাহাজ আমরা ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম।”

অপারেশন জ্যাকপটের ইতিহাস এভাবেই তুলে ধরেছিলেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডো খলিলুর রহমান। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলাম। অপারেশন জ্যাকপট শেষে ফেরার পথে সাতক্ষীরার বুদহাটায় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন তাঁরা। ১৮ আগস্ট রাত তখন ১টা। সবাই ছিলেন নৌকায়। হঠাৎ লাইট মেরে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়তে থাকে। সহযোদ্ধা মহসীন সাঁতরিয়ে পালিয়ে গেলেও ধরা পড়েন খলিলুরসহ বাকিরা। অতঃপর শুরু হয় নির্মম টর্চার। নৌ কমান্ডো খলিলুরের ভাষায়— ‘ওরা চোখ বেঁধে সারা শরীর রড দিয়ে পেটাত। পায়ের তলায়ও পেটাতে থাকে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমার কোমর পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়। সামনের দাঁতগুলোও যায় ভেঙে। ইটের খোয়ার রাস্তায় এক দিন জিপ গাড়ির সঙ্গে আমার পা বেঁধে টেনে নিয়ে গেল তাঁরা। পেটের চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত পড়ছিল তখন। প্রায়ই বেয়নেট দিয়ে শরীরে খোঁচাত। তারা বেয়নেট দিয়ে আমার মলদ্বারও খুঁচিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এই যন্ত্রণার কথা তো ভুলতে পারি না।’

মন্তব্য