kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

সেক্টর-৯

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়ার স্থানে কেন শিশু পার্ক?

সৈয়দ আবদুল মালেক, গ্রাম-আলেকান্দা, উপজেলা-বরিশাল সদর, জেলা-বরিশাল। এক মাসের ট্রেনিং নেন বরিশাল বেলস পার্কে (বঙ্গবন্ধু উদ্যান)। যুদ্ধ করেছেন বরিশাল শহর ও আশপাশের এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়ার স্থানে কেন শিশু পার্ক?

‘১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও ক্ষমতা ছাড়ে না পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ফলে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। তখন অনার্স পাস করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাস শুরু না হওয়ায় ফিরে যাই বরিশালেই।

বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন ৭ই মার্চ। রেডিওতে শুনি সেই ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো বরিশালে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা মিলে সংগ্রাম কমিটি গঠন করি। ২৬শে মার্চ, ভোরবেলা। ঢাকায় আর্মি নামার এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের খবর মাইকিং করছিল সংগ্রাম কমিটির লোকজন। গ্রেপ্তারের আগে ওয়্যারলেসে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। টিঅ্যান্ডটি এক্সচেঞ্জ অফিসের অপারেটর সেটি টাইপ করে বিলি করছেন। আমিও ঘোষণাটির একটি কপি সংগ্রহ করি।

বরিশাল পুলিশ লাইন ছিল আমাদের বাড়ির কাছেই। আমির হোসেন আমু, মেজর জলিল, জালাল সরদার প্রমুখের নেতৃত্বে পুলিশ লাইনের অস্ত্র চলে আসে সাধারণের হাতে। উদ্যোগ নেওয়া হয় বেলস পার্কসহ শহরের বড় বড় মাঠে অস্ত্র চালনার ট্রেনিংয়ের। খবর পেয়ে আমিও নাম লেখাই। সকালে ফলিং, পিটি প্যারেড, দৌড়ঝাঁপ, ডামি বন্দুক দিয়ে ফায়ারিং প্র্যাকটিস চলত। সন্ধ্যার পর লেডিস পার্কের পাশে নদীর পারে শেখানো হয় গ্রেনেড চার্জ ও নাইট অপারেশন প্রভৃতি। এভাবে এক মাসের গেরিলা ট্রেনিং করান আবদুল মান্নান নামের সেনাবাহিনীর একজন হাবিলদার।

একাত্তরে বরিশাল এক মাস ছিল মুক্ত। এর পরই পাকিস্তানি সেনারা হেলিকপ্টারে নামে ঝুনাহার তালতলীতে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভারী অস্ত্রের মুখে টিকতে পারেন না। আমরা তখন চলে আসি ফুফুর বাড়ি জাগুয়া রূপাতলীতে।’ যুদ্ধদিনের কথা এভাবেই বলছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবদুল মালেক।

মালেকরা যুদ্ধ করেন ৯ নম্বর সেক্টরের সুইসাইড স্কোয়াডের কমান্ডার রেজা-ই-সাত্তার ফারুকের নেতৃত্বে। গেরিলা সেজে বরিশাল শহরে বোমা থ্রো করেই সরে পড়তেন তাঁরা। নির্দেশ ছিল—হিট অ্যান্ড ব্যাক। এভাবেই গেরিলা অপারেশন করেন নভেম্বর পর্যন্ত।

এক অপারেশনে তিনি ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। গুলিটি তাঁর হাঁটুর নিচ দিয়ে ঢুকে হাড় ভেঙে বেরিয়ে যায়। রক্তাক্ত সেই দিনটির আদ্যোপান্ত শুনি মুক্তিযোদ্ধা মালেকের মুখে। তাঁর ভাষায়, ‘বরিশাল ডিসি অফিসের ক্লার্ক আবদুল রহিম হাওলাদারের কাছ থেকে আর্মিদের মুভমেন্ট জেনে আমি রেজা-ই-সাত্তারকে জানাতাম। পরে তাঁর নির্দেশেই রাতের আঁধারে শহরের বিভিন্ন জায়গায় হাতবোমা ছুড়ে সরে পড়তাম। ডিসি এ কে এম সিদ্দিকুল্লাহ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে।

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। সন্ধ্যাবেলা। ডিসি সাহেবের পাঠানো দুটি গাড়িতে রহিমের সঙ্গে যাই লাকুটিয়ায় রেজা-ই-সাত্তার ফারুকের ক্যাম্পে। দুটি গাড়িতে আমরা ১৪ জনের মতো। রহিমসহ একটি গাড়িতে আমি, আবুল কালাম আজাদ, ফেরদৌস, মাহবুব আলম। নির্দেশ ছিল ডিসি অফিস ও প্রশাসন দখলে নেওয়ার। মুক্তিযোদ্ধাদের অন্য দলগুলোও তখন শহরে ঢুকে পড়েছে।

পরিকল্পনা ছিল একটি গাড়ি জিলা স্কুলের সামনে দিয়ে এবং অন্যটি পুলিশ লাইনের পাশ দিয়ে ডিসি অফিসে ও তাঁর বাংলোতে পৌঁছবে। আমাদের গাড়িটি পুলিশ লাইনের পথ ধরে। গাড়িতে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। হালিমা খাতুন স্কুলের উত্তর দিকের রাস্তার বাংকারে ওত পেতে ছিল সাত-আটজন রাজাকার। পতাকা ওড়ানো গাড়ি দেখেই তারা বৃষ্টির মতো ফায়ার করতে থাকে। গাড়ি থেকে আমরাও প্রত্যুত্তর দিই। কিন্তু তার আগেই ড্রাইভারসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। গাড়িটি পড়ে যায় রাস্তার পাশের খালের মধ্যে। পরে পশ্চিম দিক থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল আমাদের উদ্ধার করে। ডিসি অফিসের রহিম স্পটেই মারা যান। আমি ডান পা-টা নাড়াতে পারছিলাম না। পিনপিন করে রক্ত বেরোচ্ছিল। গুলিটি হাঁটুর এক ইঞ্চি নিচ দিয়ে ঢুকে হাড় ভেঙে বেরিয়ে যায়। সহযোদ্ধারা আমাকে তুলে নিয়ে বটতলা মসজিদে শুইয়ে দেন। এরপর আর কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফিরতেই দেখি সদর হাসপাতালে। ডান পা-টা টানা দেওয়া।’ গুলিবিদ্ধ হলেও ওই রাতেই ত্রিশ গোডাউন ছাড়া বরিশাল মুক্ত হয়েছিল।

স্বাধীনের পর উন্নত চিকিত্সার জন্য মুক্তিযোদ্ধা মালেককে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাঠানো হয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। ওখানে তাঁকে দেখতে যান তত্কালীন রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান ও সুইস মন্ত্রী জ জিগলার। সে সময়কার ছবিগুলো আজও আগলে রেখেছেন এই যোদ্ধা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা