kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

সেক্টর-৮

জীবিত মানুষেরও ঠাঁই হয়েছিল কবরে!

গোলাম মোস্তফা দুলাল, বাবার চাকরির সুবাদে ছিলেন কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলে। ২৮ দিন ট্রেনিং নেন ভারতে, বিহারের চাকুলিয়ায়। যুদ্ধ করেছেন কুষ্টিয়ার আলমডাঙ্গা ও মেহেরপুর এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবিত মানুষেরও ঠাঁই হয়েছিল কবরে!

বড় দুলাভাই চাকরি করতেন খুলনা কোকোনাট প্রসেসিং মিলে। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ৩ মার্চ ১৯৭১। খুলনায় একটা মিছিল সার্কিট হাউসের কাছে পৌঁছলে গুলি চালায় পাকিস্তানি সেনারা। ওখানেই শহীদ হন তিনি। এ খবর আমাদের মনে ঝড় তোলে।

খবর ছিল, কিছু একটা ঘটবে। তাই হান্নান ভাই প্রথম ট্রেনিংয়ের উদ্যোগ নেন। স্কাউট ট্রেনিং ছিল আমার। আনসারদের কাছ থেকে রাইফেল চালানো শিখে নিয়েছিলাম। স্কুল থেকে এসিডবাল্ব চুরি করে সেটা দিয়ে এলজিইডির মাঠে শেখানো হলো ককটেল বানানো। দুটি রাইফেলও জোগাড় হয়ে যায়। তা দিয়েই আমরা আলমডাঙ্গায় পাহারা বসাই।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে পাকিস্তানি সেনারা দখলে নেয় কুষ্টিয়া। এপ্রিলের ৭ তারিখে তারা পজিশন নেয় আলমডাঙ্গা থানায়। ওই দিনই আবুল হোসেনসহ ৮-১০ জনকে ওরা ধরে নিয়ে হাটবলিয়া ফেরিঘাটের সামনে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। আলমডাঙ্গায় ওটাই ছিল প্রথম গণহত্যা।

যুদ্ধদিনের কথা শুনছিলাম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা দুলালের জবানীতে। আব্দুল গফুর সরদার ও আয়েশা গফুরের সপ্তম সন্তান দুলাল। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। একাত্তরে বিহার চাকুলিয়া থেকে ট্রেনিং নেন এই যোদ্ধা। অতঃপর চলে আসেন রণাঙ্গনে।

এক অপারেশনে মারাত্মক আহত হন মুক্তিযোদ্ধা দুলাল। পাকিস্তানি সেনাদের ব্রাশের গুলিতে তাঁর ডান হাতের কবজির ওপরের হাড় ভেঙে, মাংস পুড়ে, রগগুলো ছিঁড়ে যায়। চিকিত্সা হলেও এখনো ডান হাতের আঙুলগুলো পুরোপুরি সোজা করতে পারেন না।

স্মৃতি হাতড়ে দুলাল জানালেন ওই দিনের আদ্যোপান্ত—

১১ নভেম্বর ১৯৭১। সন্ধ্যাবেলা। কুমার নদের ওপারে কুঠিবাড়ীর কাছে পাওয়ার স্টেশনটি আমরা উড়িয়ে দিই। সেখানকার রেললাইনও ওড়ানো হয়। এভাবে কুষ্টিয়া থেকে আলমডাঙ্গাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। আমরা তখন পজিশনে থাকি আলমডাঙ্গার চারদিকে।

গেরিলা সেজে শহরের ভেতরটা ‘রেকি’ করতে হবে। তাই ১২ নভেম্বর ভোরে চারজনকে নিয়ে নান্নু ভাই শহরে ঢুকলেন। সময় সকাল ৯টা। হঠাৎ গুলির শব্দ। ভেতরে কিছু একটা হয়েছে। আমরা কুমার নদী দিয়ে আলমডাঙ্গা শহরে ঢুকি। চারদিক থেকে অন্যরাও এগোতে থাকে। সোনালী ব্যাংকের পাশ থেকে চাঁদতারার দিকে ফায়ার দিই। ওখানে ছিল রাজাকাররা। খানিক এগোতে নান্নু ভাইকে পাওয়া গেল। চারদিকের আক্রমণে রাজাকার ও মিলিশিয়ারা আশ্রয় নেয় আলমডাঙ্গা থানায়। সেখানকার বাংকারে অবস্থান নিয়ে তারা ব্রাশ চালাতে থাকে।

হান্নান ভাইসহ আমরা তিনজন ছিলাম অ্যাডভান্স পার্টিতে। একটা বাড়িতে পজিশন নিয়ে থানার দিকে দেখে দেখে ফায়ার দিচ্ছি। তখন মধ্যদুপুর। নান্নু ভাই গার্লস স্কুলের পাশ দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু একটি গুলি এসে লাগে তাঁর মাথায়। কয়েকটা ঝাঁকি দিয়েই তাঁর শরীরটা নিথর হয়ে যায়। একইভাবে গুলিতে মারা যান বজলু ডাক্তারও। হাসু ভাই ঢুকছিলেন ডাকবাংলোর পাশ দিয়ে। ওখানে মিলিশিয়ারা তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারে। আনসার ভাই গুলি খান চাঁদতারার ওখানেই। একটা আরবান ফাইট ছিল ওটা।

প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে। আমাদের দৃষ্টি থানার দিকে। কিন্তু ডানে পোস্ট অফিসের কাছে যে একটা বাংকার আছে, সেটা বুঝতেও পারিনি। আমাকে টার্গেট করেই ওরা গুলি ছোড়ে। আমিও পাল্টা জবাব দেব। হঠাৎ মনে হলো ধাক্কা খেলাম। হাত থেকে এসএলআরটাও পড়ে গেল। গুলিটা মুখে লাগার কথা। কিন্তু ম্যাগাজিনটা তখন কাট করছিলাম। তাই গুলিটা প্রথম লাগে এসএলআরের বডিতে। অতঃপর তা ঢুকে যায় ডান হাতের কবজিতে। ফলে হাড্ডি ভেঙে মাংস বেরিয়ে যায়। চামড়া ঝলসে গিয়ে রগগুলোও গাছের শিকড়ের মতো ঝুলতে থাকে।’

গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত দুলাল তখন আশ্রয় নেন আলমডাঙ্গার এক কবরস্থানে। পুরনো একটি কবরে লুকিয়ে রাখেন নিজেকে। একাত্তরে জীবিত মানুষেরও ঠাঁই হয়েছিল কবরে! সেসব স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হন দুলাল। বলেন, ‘হাতের ব্যথায় আমি গোঙাচ্ছিলাম। পরে নওশের আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে যায় এরশাদপুর গ্রামে। সেখানেও ডাক্তার নেই। পরে বেলগাছির ওহাব মেম্বারের বাড়িতে মিলে গ্রাম্যচিকিত্সা। আমার হাত তখন পচতে শুরু করেছে। গ্যাংগ্রিন হয়ে গিয়েছিল। গন্ধে কেউ সামনে আসে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সঙ্গে ছিলেন সহযোদ্ধা লালচান আর শহীদুল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা আমায় বর্ডার পার করে আনেন। চিকিত্সা হয় করিমপুর ফিল্ড হাসপাতালে।’

 

মন্তব্য