kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

সেক্টর-৭

এক পা হারিয়ে এখনো বেঁচে আছি

মো. বাকি মোল্লা, গ্রাম-হামিদকুড়া, উপজেলা-বাঘা (চারঘাট), জেলা-রাজশাহী। ভারতের পাহাড়পুর ক্যাম্পে এক মাসের রাইফেল ট্রেনিং নেন। যুদ্ধ করেছেন রাজশাহীর বাসুদেবপুর এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক পা হারিয়ে এখনো বেঁচে আছি

বাকি মোল্লা। বয়স সত্তরের মতো। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের গুলির আঘাতে কেটে ফেলতে হয় তাঁর ডান পা। শরীরের ভারে বাঁ পা-ও এখন বেঁকে গেছে। ফলে হাঁটতে পারেন না, শরীরে ভর দিয়ে শুধু দাঁড়াতে পারেন। স্বাধীনতার জন্য শুধু অঙ্গ নয়, এই যোদ্ধা হারিয়েছেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকুও।

আবদুুল কুদ্দুস মোল্লা ও রমিজান বেওয়ার বড় ছেলে বাকি মোল্লা। তাঁর বয়স যখন ১০, তখন অসুখে মারা যান তাঁর বাবা। ফলে যে বয়সে শিশুরা স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে, সে বয়সেই পরিবারের হাল ধরতে হয় তাঁকে। বাকির ভাষায়—‘তহন আমি তো ছোট মানুষ, লাঙল তো ধরতে পারি না। চিনি হাজি নামে এক লোক আছিলেন গ্রামে। আমার কষ্ট দেইখা উনিই আমারে সাহায্য করতেন। বীজ ছিটায়ে দিতেন। জমিতে মই দিয়ে দিতেন। এভাবে আমি হাল দেওয়া শিখলাম। হাল দিয়া, মাইনসের জমিতে কামলা দিয়া আর ঘাস বাছি চাইলের টাকা জোগাড় করি আর পরিবার চালাই। আস্তে আস্তে বিস্কুট বিক্রির ব্যবসাও শুরু করি। এভাবে একসময় বিয়া করে সংসার গড়ি।’

মার্চের শেষে ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সৈন্যরা স্থানীয় যুবকদের নিয়ে চারঘাট থানা আক্রমণ করে। অস্ত্র লুট করে তারা ওখানেই অবস্থান নেয়। পরিবারসহ বাকি মোল্লা তখন আশ্রয় নেন ভিতরবাগ গ্রামে। সে সময় মজিবর চেয়ারম্যানের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রুটি বানিয়ে বস্তায় করে তিনি দিয়ে আসতেন চারঘাট দিয়ার বাজারে।

দেশে যুদ্ধ চলছে। বাকির সংসারে তখন তিন ছেলে। বউ আবারও অন্তঃসত্ত্বা। পুলিশ, আর্মি আর ইপিআরের বাঙালি সৈন্যরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে যুবকদের যুদ্ধে যাওয়ার তাগাদা দিয়ে বলে, ‘তোমরা আমাদের সঙ্গে না এলে দেশ স্বাধীন করা যাবে না। আমাদের দেশ আমাদেরই স্বাধীন করতে হবে, তোমরা আসো। ট্রেনিং করো। যখন অস্ত্র হাতে পাইবা, তখন শক্তি বাড়ব।’

তাদের কথায় পরিবারের মায়া ছেড়েই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বাকি মোল্লা। সময়টা এপ্রিলের মাঝামাঝি। চারঘাট দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের সাগরপাড়া ক্যাম্পে ওঠেন তাঁরা। সেখান থেকে পাঠানো হয় পাহাড়পুর ক্যাম্পে। ওখানেই এক মাস রাইফেল ট্রেনিং নেন। কমান্ডার ছিলেন ইপিআরের নায়েক সুবেদার কাশেম। ট্রেনিং শেষে মাটি ছুঁয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার শপথ নিয়েছিলেন বাকি মোল্লারা।

প্রথম অপারেশনেই মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হন মুক্তিযোদ্ধা বাকি মোল্লা। রক্তাক্ত ওই দিনটির আদ্যোপান্ত শুনি তাঁর জবানিতে—

“১৯৭১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহ। রাজশাহীর বাসুদেবপুরের ঘটনা। খবর ছিল—ভিতরবাগ, মইরবাগ থেকে পাকিস্তানি সেনারা যাবে নন্দনগাছির দিকে। আমরা মাত্র ২৫-৩০ জন। কমান্ডে নায়েক সুবেদার কাশেম। অস্ত্র ছিল মার্কও রাইফেল। রাতে পজিশন নিই আড়ানি ব্রিজের পাশে। ভোর হয় হয়। পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে আসছিল। আতঙ্ক তৈরি করে ওরা এভাবেই পথ চলত।

ব্রিজের কাছাকাছি আসতেই দুই পাশ থেকে আক্রমণ করি। শুরু হয় গোলাগুলি। গুলি ছুড়ে আমি দৌড়ে সামনে যাব, অমনি একটা গুলি আইসা লাগে ডান পায়ের হাঁটুতে। আমি দুই লাফ গিয়ে ছিটকে পড়ি। প্রথম বুঝতে পারিনি। দেখি পিনপিন করে রক্ত বেরোচ্ছে। পাশেই ছিল সহযোদ্ধা মিল্লাত। তার বুকেও এসে লাগে গুলি। অতঃপর তাঁর শীররটা ঝাঁকি দিয়েই নিথর হয়ে যায়। ‘মা গো’ চিত্কার শুনে তাকিয়ে দেখি অন্য পাশে সুধাংশু বাবু। তাঁর মাথার পেছনে গুলি লেগে চোখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সব ঘটছিল চোখের সামনে!

অসহায়ের মতো পড়ে ছিলাম। সহযোদ্ধারা আমাকে টেনে এক গ্রামের ভেতর নিয়ে যায়। পরে একটা দরজার পাল্লায় শুইয়ে নেওয়া হয় আড়আলীর বাজারে। ওইখানে প্রাথমিক চিকিত্সার পর সন্ধ্যায় সাগরপাড়া ক্যাম্পে এবং পরে নেওয়া হয় মুর্শিদাবাদ বহরমপুর হাসপাতালে। ওখানেই অপারেশন করে আমার ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়।”

এক পা হারালেও মুক্তিযোদ্ধা বাকি বেঁচে আছেন, এটাই ছিল তাঁর সান্ত্বনা। স্বাধীন দেশে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সুখের সংসার করবেন। বাড়িতে রেখে আসা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর কোলে দেখবেন ফুটফুটে নবজাতক। স্বাধীনতা লাভের পর এমন স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরে তিনি দ্বিতীয়বার রক্তাক্ত হন, মানসিকভাবে।

তাঁর ভাষায় : “স্টেশনে নামি বাড়ির দিকে যাচ্ছি। হাজির পোলা মধু আমারে দূর থেকে দেখে ছুটে আসে। জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আহা রে, তোর পরিবারডা মারা গেল। পেটের সন্তানডাও মরিছে। তুই দেখতে পারস নাই।’ শুনেই আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আমার স্ত্রী কুলসুম বড় ভালো মানুষ ছিল। স্বাধীনতার জন্য তারেও হারালাম!

 

মন্তব্য