kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

সেক্টর-৬

এ দেশই আমার মা

জি এম জুলফিকার, গ্রাম-শাহীপাড়া, উপজেলা-নীলফামারী, জেলা-নীলফামারী। ২৮ দিনের ট্রেনিং করেন ভারতের দার্জিলিং পাহাড়ের উইংটং নামক স্থানে। যুদ্ধ করেছেন মিরপুর, কোটগজ, তেঁতুলিয়া, বাউড়া, বুড়িমারী, বড়খাদা এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এ দেশই

আমার মা

১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাউড়া থেকে আমরা ডিফেন্স গড়ি লালমনিরহাট বড়খাদা রেলস্টেশনের কাছে। সেখানে ছিল পঁচিশ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের শক্তিশালী ঘাঁটি। সূর্যটা তখন হেলে পড়েছে। আমরাও সশস্ত্র অবস্থায় অগ্রসর হই। মেশিনগান, টমিগান, এসএলআর, টু-ইঞ্চি মর্টার প্রভৃতি আমাদের অস্ত্র। কমান্ডে ছিলেন ছয় নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন। আমাদের গ্রুপকে কমান্ড করতেন ক্যাপ্টেন মতি। ইন্ডিয়ান আর্মি আর্টিলারি সাপোর্ট দিলে আমরা সামনে এগোই।

পাকিস্তানি সেনারাও পাল্টা আর্টিলারি ছোড়ে। শুরু হয় তুমুল গোলাগুলি। তা চলে ভোর ৪টা পর্যন্ত। আমার কাছে ছিল একটি এসএলআর। পাশেই ববিন, তুতুল ও সুবেদার ফজলুর রহমান। ক্রলিং করে সবাই সামনে এগোই। থেমে থেমেই গোলাগুলি চলছে। ওদের বাংকারের কাছাকাছি ছিল একটি বাঁশঝাড়। মাত্র ৭০০ গজ সামনে। সেখানটায় যেতে পারলেই ওদের কুপোকাত করা যাবে। এই ভেবে সে দিকটায় আমি পা বাড়াই।

বাঁশঝাড়ের ভেতর পা রাখতেই হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি ছিটকে পড়ি। হালকা ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আবার বাতাসে মিলিয়ে যায়। বুঝে যাই, এম ফোরটিন মাইনের বিস্ফোরণে পড়েছি। ডান পা-টা তখন নাড়াতে পারছিলাম না। পায়ের দিকে চোখ পড়তে আঁতকে উঠি। গোড়ালি উড়ে গেছে। চামড়ার আবরণ নেই। হাড্ডি গুঁড়া হয়ে ঝরছে। রগগুলো ঝুলছে গাছের শিকড়ের মতো। শরীরটা শুধু ঝিমঝিম করছিল। তখনো জ্ঞান হারাইনি। পড়ে আছি আলের ভেতর। গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিই পা-টাকে। আমায় দেখে ক্রলিং করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে কাছে আসে তুতুল ও ববিন। এ সময় কাভারিং ফায়ার দেয় ফজলুর রহমান। তারা কাঁধে তুলে আমায় নিয়ে যায় ক্যাম্পে।

পা ছাড়া শরীর ও মুখে লেগেছিল অসংখ্য স্প্লিন্টার। চিকিত্সার জন্য ক্যাম্প থেকেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতের বাগডোকরা সিএমএইচে। পরে গ্যাংগ্রিন হয়ে পায়ের মাংসে পচন ধরলে চিকিত্সার জন্য বিভিন্ন সময় পাঠানো হয় ব্যারাকপুর, রাঁচি, নামকুম, খিরকি ও পুনে হাসপাতালে। অপারেশন হয় আরো ছয়বার।

দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন আমরা পুনে হাসপাতালে। নার্সরা আমাদের ফুল দিয়ে সম্মান জানায়। উল্লাস করে মুখে আবির মাখিয়ে দেয়। হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলেন মেজর মাথুর। আমার পিঠ চাপড়ে সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘তোমারা দেশ তো স্বাধীন হোগিয়া। আব তুম চালা যাওগে।’ খুব দেশে ফিরতে ইচ্ছা করছিল তখন। কিন্তু কৃত্রিম পা লাগিয়ে তবেই আমাদের ছাড়া হবে।

৫ জানুয়ারি ১৯৭২। পুনে হাসপাতালে আমাদের দেখতে আসেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। আমি বসা ছিলাম মেঝেতে। সেদিন আমাদের উত্সাহ দিয়ে তিনি বললেন, ‘চিন্তা কোরো না, পা লাগিয়ে আবার তোমরা চলতে পারবে। দেশে ফিরলে তোমরা বীরের সম্মান পাবে। তোমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবে তোমাদের মাঝে।’

ইন্দিরার সঙ্গে সেদিনকার একটি ছবি আমার হাতে তুলে দেন সে সময়কার কমান্ড ইনচার্জ ডা. টি ডি দাস। ওই ছবিটির দিকে তাকালে আজও একাত্তরটা মনে পড়ে যায়।’

তাঁর বাবা ডা. জি এম কাদের ছিলেন রংপুর মেডিক্যাল কলেজের লেকচার অব ফরেনসিক মেডিসিনের প্রফেসর। মা সৈয়দা আক্তার মহল সাধারণ গৃহিণী। পাঁচ ভাই দুই বোনের সংসারে তিনি সবার বড়। ৩ এপ্রিল ১৯৭১। তুতুল, শফিকুল, মান্নান, ববিন, মুক্তা, মানিক, ইলিয়াসসহ জুলফিকাররা ৩৫ জন সীমান্ত পার হয়ে চলে যান দেওয়ানগঞ্জ রিক্রুটিং ক্যাম্পে। পরে ধুবগুড়ি রোড হয়ে মেটেলি থানা তাপুরহাট চা বাগান হয়ে দার্জিলিং পাহাড়ের উইংটং নামক স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের। সেখানে সেনাবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পে ২৮ দিন ট্রেনিং হয়। জুলফিকার ছিলেন আলফা কম্পানিতে।

এরপর কী করলেন? মুক্তিযোদ্ধা জুলফিকার বলেন, ‘একটি কম্পানিতে ছিল ৪০-৪৫ জন। দুটি কম্পানি এক হয়ে কোর্টগজ নামক স্থানে আমরা তাঁবু গাড়ি। ওখান থেকে মিরগর এলাকায় ঢুকে হিট করে আবার ফিরে আসতাম। সেপ্টেম্বর থেকে আমরা যুক্ত হই সম্মুখ সমরে।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মিরগড়ের ভেতরের দিকে ক্যাম্প ছিল পাকিস্তানি সেনাদের। তার আশপাশের এলাকা ছিল রাজাকারদের নিয়ন্ত্রণে। একবার রেকি করতে ওই এলাকায় যায় কম্পানি কমান্ডার আইয়ুব ও টুয়াইসি নুরুল। অস্ত্র হিসেবে তাদের সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি গ্রেনেড। গ্রামের ভেতর ঢুকতেই রাজাকাররা ওত পেতে তাঁদের ধরে ফেলে। তাঁদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। পরদিনই আমরা গ্রামটি অ্যাটাক করি। আইয়ুব ও নুরুলের ক্ষতবিক্ষত লাশ মেলে একটি আখক্ষেতের পাশে, আখ জাল দেওয়ার গুড়ের কড়াইয়ে। বেয়নেটের খোঁচায় তাঁদের চেহারা বিকৃত করে ফেলেছিল ওরা।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা