kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

সেক্টর-৩

মুক্তিযোদ্ধারা আমায় ঘুমাতে দেয় না

মোহন মিয়া, গ্রাম-চিনাইর, উপজেলা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জেলা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তখন সেনাবাহিনীর সিপাহি ছিলেন। আর্মি নম্বর ৩৯৪০৫০১। যুদ্ধ করেছেন আখাউড়া ইপিআর হেডকোয়ার্টার্স, আজমপুর রেল কলোনি, সিংগাইর বিল এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুক্তিযোদ্ধারা আমায় ঘুমাতে দেয় না

১৯৬৪ সালের প্রথম দিকের কথা। রেডিওতে তখন ফৌজি অনুষ্ঠান হতো। সেখানে ঘোষণা দেওয়া হয় আর্মিতে লোক নেওয়ার। পঞ্চম শ্রেণি পাস হলেই চলে। মোহন মিয়াও তখন কুমিল্লা রেস্ট হাউসে গিয়ে দাঁড়ান। আগেই তাঁর মোজাহিদ ট্রেনিং ছিল। ওই সার্টিফিকেট দেখাতেই সিপাহি হিসেবে টিকে যান। প্রথম ট্রেনিং চলে চট্টগ্রাম ইবিআরসিতে। পরে তাঁর পোস্টিং হয়। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন সেকেন্ড বেঙ্গলে।

২৫ মার্চের আগেই জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে সংঘর্ষ হয়। মোহন মিয়ারা তখন জয়দেবপুর থেকে তেইল্লাপাড়া দিয়ে ৩ নম্বর সেক্টরের হেজামারা হেডকোয়ার্টার্সে চলে যান। ওই সেক্টরের আলফা কম্পানির কলাগাইচ্ছা ক্যাম্পের ওয়ান প্লাটুনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর কমান্ডে ছিল ৪০ জন যোদ্ধা। প্রথমে তাঁরা গেরিলা অপারেশন করেন। রাতের দিকে ভবন, ব্রিজ, পাওয়ার স্টেশনগুলো উড়িয়ে দিয়ে ফিরে আসতেন হেজামারায়। এরপর তাঁকে এক মাসের জন্য পাঠানো হয় ভারতের লোহারবন ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানে ট্রেনিং ইন্সট্রাক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

অকুতোভয় এই বীরযোদ্ধা এক অপারেশনে মারাত্মকভাবে আহত হন। বর্তমানে তাঁর হাতের বাহুতে কৃত্রিম রগ লাগানো। শরীরের ভেতর ‘পয়জন’ এখনো রয়ে গেছে। তাই দিনে ২০ থেকে ২৫ বার বমি হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই শরীরের কষ্ট সহ্য করে বেঁচে থাকতে হবে এই মুক্তিযোদ্ধাকে।

কী ঘটেছিল রক্তাক্ত ওই দিনটিতে? মোহন মিয়া বলেন, ‘আমরা ছিলাম ৩ নম্বর সেক্টরের আজমপুর রণাঙ্গনে। ডিফেন্স নিয়ে মুভ করছি। উদ্দেশ্য ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া। পেছনে থাকে ইন্ডিয়ান আর্মি। মুখোমুখি তুমুল যুদ্ধ চলছে। পাকিস্তানি সেনাদের ডিফেন্স ছিল উজানিশা, কোড্ডায়, সুলতানপুর আর ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়। আখাউড়া টু মোকন্দুপুর, ওরা একটা খাল কেটে রাখে, যাতে আমরা ট্যাংকসহ ইন্ডিয়া থেকে আসতে না পারি। আজিমপুর গ্রামে ওই খালের পূর্ব পাশে ছিলাম আমরা। পশ্চিমে পাঞ্জাবিরা। দুই পক্ষের গুলি আর আর্টিলারিতে আখাউড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম তখন পুকুর হয়ে গেছে।

৭ ডিসেম্বর ১৯৭১। সকালে পাকিস্তানি সেনারা চারটি বিমান নিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে তিনটি বিমানই ধ্বংস হয় কুমিল্লা ও নবীনগরে। পেয়ারা-কাঁঠাল বাগান এলাকায় ছিল আমাদের পজিশন। ওরা আর্টিলারি ছুড়ছে। গোলাগুলিও চলছে। আমরা বাংকারে। থেমে থেমে গুলি চালিয়ে জবাব দিচ্ছি। পাশের বাংকারে ছিল সহযোদ্ধা শফিক। ধুম করে একটা আর্টিলারি এসে পড়ে ওর শরীরে। দেখলাম ওর পা দুটি বাংকারের ভেতর আর শরীরটা ঝুলে আছে গাছে। কয়েক মিনিট পরে একইভাবে মারা যায় সহযোদ্ধা মাহবুবও। ওদের দিকে কয়েক পলক শুধু তাকিয়ে ছিলাম। বিকেল তখন ৪টা। এলএমজিটা তুলে গুলি করছি। হঠাৎ মনে হলো বডি ঠিক কাজ করছে না। তখনো বুঝিনি গুলি লাগছে আমার বুক, ডান হাতের বাহু, পেটের ডানদিক, পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে। খানিক পরেই উল্টে পড়ে গেলাম মাটিতে। এরপর কিছুই মনে নেই।’

‘প্রথমে আগরতলায় ও পরে চিকিত্সার জন্য পাঠানো হয় গোহাটি হাসপাতালে। চারটি গুলি লেগে আমার ডান হাতের মেইন রগটা ছিঁড়ে যায়। ডাক্তাররা হাত কেটে ফেলতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারিভাবে আমাকে পাঠানো হয় জার্মানিতে। সেখান থেকে লাগানো কৃত্রিম রগ দিয়েই চলছে ডান হাতটি; কিন্তু কষ্ট তো কমেনি। মুক্তিযুদ্ধ শেষ। কিন্তু কই, আমি তো এখনো ঘুমাতে পারি না। চোখ বুজলেই সহযোদ্ধা শফিক আর মাহবুবের রক্তাক্ত লাশ দেখি, রাতে জেগে উঠি শহীদদের গোঙানি আর কান্নার শব্দে, আর্টিলারি বিস্ফোরণের বিকট শব্দে প্রায় রাতেই লাফিয়ে উঠি। শরীরটাও ঘামতে থাকে তখন। শহীদদের মুখগুলো মধ্য রাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একাত্তরের শহীদ যোদ্ধারা আমায় ঘুমাতে দেয় না, ভাই।’

একাত্তরে প্রত্যেক জেলায় রাজাকার ছিল। তাদের কার্যক্রম নিয়ে মোহন মিয়া বলেন, ‘রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী না থাকলে একাত্তরে এত মানুষ মরত না। আখাউড়ায় মোশাররফ ছিল নামকরা রাজাকার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামসিদ। কসি মোল্লার বাবা ছিলেন মুসলিম লীগের প্রধান। আওয়ামী লীগে যোগ দিছিল রাজাকার মোবারক হাজি। রক্ষা পায়নি। এহন জেলে। জামায়াতে রাজাকার আছে। বিএনপিতেও আছে। ওই রাজাকার আওয়ামী লীগে এলেই ভালো মানুষ হইয়া যাইব—এটা ভাবলে চলব না। মনে রাখতে হবে, রাজাকার রাজাকারই থাকে।’

স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা অকপটে তুলে ধরেন নিজের মতামত। তাঁর ভাষায়, ‘স্কুলের হেড মাস্টারের নির্দেশে ঘণ্টা বাজাইছে দপ্তরি। তাই বইলা কি দপ্তরি নির্দেশের মালিক হইব? অনেকের মতো জিয়াও দপ্তরির কাজটাই করেছেন। আমি লেইখা দিছি। ঘোষণা দিছেন আপনি। তাই বলে তো ঘোষণার মালিক আপনি না।’

 

মন্তব্য