kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

সেক্টর-২

মনের চোখ দিয়ে দেশটাকে দেখি

আব্দুস সাত্তার, বাড়ি-ঢাকার মহাখালীতে। আউয়াল কমান্ডারের অধীনে দুই সপ্তাহের ট্রেনিং করেন রূপগঞ্জে। যুদ্ধ করেছেন ডেমরা ও রামপুরা টিভি স্টেশন এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মনের চোখ দিয়ে দেশটাকে দেখি

শরীরের সঙ্গে এখনো যুদ্ধ করছেন এক মুক্তিযোদ্ধা। বেঁচে থাকার যুদ্ধ। একাত্তরে তাঁর ডান হাতটি কনুইয়ের নিচ থেকে উড়ে গেছে। হাতের মাংস বিশেষভাবে আঙুলের মতো কেটে ধরার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ডাক্তাররা। মাইনের গ্যাস ঢুকে দুটি চোখই তাঁর অকেজো। তাই নিজ চোখে দেখতে পাননি স্বাধীনতার লাল সূর্যটা। তবু আফসোস নেই। ওই চোখে তিনি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন, শুনেছেন তাঁর বজ্রকণ্ঠের ৭ই মার্চের ভাষণটি।

স্বাধীন দেশে জীবনের হিসাব মেলে না এ যোদ্ধার। দেশের স্বাধীনতার জন্য দুই চোখ হারালেও মানুষ এখন বিদ্রূপ করে তাঁকে ‘কানা’ ডাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ‘বীর’ সম্বোধন করে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন দুই হাজার টাকা। তাঁর চোখের আলো ফিরিয়ে আনায় চিকিত্সার জন্য পাঠিয়েছিলেন বিদেশেও। কিন্তু তবু চোখ ফিরে পাননি। এখন তাঁর সারাটা দিন কাটে অন্যের সাহায্যে। দেশের স্বাধীনতার জন্য মেনেও নিয়েছেন এমন পরাধীনতার জীবন।

ঢাকায়ই জন্ম ও বেড়ে ওঠা আব্দুস সাত্তারের। আব্দুর রশিদ ও হালিমা খাতুনের দ্বিতীয় সন্তান তিনি। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের ক্লাস টেইনের ছাত্র।

২৫ মার্চ ১৯৭১। রাতে বাড়ি থেকেই গোলাগুলির শব্দ পান সাত্তাররা। ভয়ে সবাই থাকেন তটস্থ। এরপর কী ঘটল? সে ইতিহাস জানান আব্দুস সাত্তার। তাঁর ভাষায়—

‘‘আমগো বাড়িতে মাঝেমধ্যে আর্মি আসত। ফুটবল খেলতাম। পায়ে-হাঁটুতে দাগ ছিল। ওরা মনে করত ট্রেনিং নিছি। বলত—‘তুম মুক্তি হ্যাঁ’। অনেককে ধরে মারছে তারা। বাড্ডায় পরিচিত অনেক বিহারি ছিল। ২৫ মার্চের পর ওরা আমগো দিকে চোখ বড় করে তাকাত। গালাগালি করত। সহ্য করতে পারতাম না। তখনই সিদ্ধান্ত নিই যুদ্ধে যাওয়ার।

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। আব্বা বেতন পেয়েছেন মাত্র। পকেট থেকে চুরি করে ৫০ টাকা নিয়েই ঘর ছাড়ি। আজিজ নামে এক বন্ধু ইন্ডিয়া থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসেছে। এ খবর পেয়েই প্ল্যান করি। এক দিন খুব সকালে বের হই নৌকায়। রাজাকারদের পাহারা ছিল সাতারকুলে। তাদের চোখ এড়িয়ে প্রথমে কাঁঠালদিয়া ও বেরাইদ হয়ে চলে আসি আজিজদের ক্যাম্পে। ওখানে আউয়াল কমান্ডার আমাদের কয়েকজনকে দুই সপ্তাহ ট্রেনিং করান। স্টেনগান, থ্রি নট থ্রি আর গ্রেনেড মারা শিখি। পরে আউয়াল কমান্ডারের আন্ডারেই বিভিন্ন অপারেশন করি।’’

‘মধ্য বাড্ডার পূর্বদিকে পাকিস্তানি সেনাদের একটা ক্যাম্প ছিল। সেখান থেকে সাতারকুলের রাস্তায় নিয়মিত টহল দিত পাকিস্তান আর্মি ও রাজাকাররা। ওই রাস্তায় রাতের অন্ধকারে মাইন ফিট করতে হবে। ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। আমরা কায়েতপাড়া ক্যাম্পে। সন্ধ্যা হয় হয়। ওই অপারেশনে বের হব। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কমান্ডার আউয়াল পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আমি মাইন নিতে গেলেই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। মাইনে ডেটোনেটর থাকে। সেটা সরিয়ে চাপ দিলেই বিস্ফোরণ ঘটে। মাইন তুলতে গিয়ে কিভাবে যেন সেটি ধুম করে বিস্ফোরিত হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি ছিটকে পড়ি দূরে। দেখলাম ডান হাতটা কনুইয়ের নিচ থেকে উড়ে গেছে। চোখে গ্যাস ঢুকতেই সব আলো নিভে যায়। ওই সময় থেকেই অন্ধ আর জ্ঞানশূন্য হয়ে যাই। দেশে ও বিদেশে চিকিত্সা হয়েছে অনেক। কিন্তু চোখের আলো আর ফিরে আসেনি।  আব্বা আর বড় ভাইয়ের সাহায্য না পেলে বেঁচে থাকতেই পারতাম না। এখন সব সময় পাশে থাকে স্ত্রী রুবিনা। একজন অন্ধ মুক্তিযোদ্ধাকে বিয়ে করে সে-ও আরেক মুক্তিযুদ্ধ করছে।’

স্বাধীন দেশ নিয়ে এই বীর বলেন, ‘দেশ তো স্বাধীন। পতাকা পেয়েছি। রাষ্ট্র পেয়েছি। স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি। সব জায়গায়ই আমার দেশের মানুষ; কিন্তু সোনার বাংলা এখনো হয়নি।’

স্বাধীন দেশে কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই মুক্তিযোদ্ধা। অতঃপর বলেন, ‘আফসোস নেই কোনো। সুখ হলো, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। তাঁর ডাকে যুদ্ধে গিয়েছি। কষ্ট হলো দেশের স্বাধীনতা নিজ চোখে দেখতে পারিনি। তার চেয়েও বড় কষ্ট, স্বাধীন দেশে মানুষ এখন দেখলে ‘কানা’ বলে। এখন তো সরকার অনেক ভাতা দিচ্ছে। তাই ভালোভাবে খেয়ে বেঁচে আছি; কিন্তু চোখ ও হাত তো ফিরে পাব না। সেটা চাইও না। মনের চোখ দিয়ে এখন দেশটাকে দেখি।’

রাজনীতির কথা উঠতেই এই বীরযোদ্ধা অকপটে বলেন, ‘গোখরা সাপের পেটে কিন্তু ব্যাঙের জন্ম হয় না। সাপের পেটে সাপই হয়। তাই রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধী ও দালালের বংশধরদের স্থান দিলে তা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের মৃত্যু ডেকে আনবে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। নেতা হলেই কোটিপতি বনে যায় কিভাবে? দলীয় লোকদের দুর্নীতি ও অপরাধের কঠোর সাজা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দেখবেন রাজনীতিতে ভালোদের অংশগ্রহণ বাড়বে।’ 

সব বাধাকে পেছনে ফেলে পরবর্তী প্রজন্ম একদিন এ দেশকে অনেক এগিয়ে নেবে—এমনটাই বিশ্বাস যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারের। তিনি স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে নিয়ে। স্বপ্ন দেখেন ইতিহাস গড়ার তরুণ প্রজন্মকে নিয়েও। তাদের উদ্দেশে তিনি শুধু বললেন, ‘তোমরাই আমার চোখের আলো, যা আমি হারিয়েছি একাত্তরে। সে চোখ দিয়ে তোমরা উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখো। দেশকে পেছনে ফেলে তোমরা এগোতে পারবে না। তাই এ দেশটাকে ভালোবেসে তোমরাই সোনার বাংলা গড়ো।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা