kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

অপ্রচলিত বাজারের হিস্যা বাড়ছে পোশাক রপ্তানিতে

ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি ৩৩,০০০ কোটি টাকা

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

৩১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অপ্রচলিত বাজারের হিস্যা বাড়ছে পোশাক রপ্তানিতে

ইউরোপ কিংবা আমেরিকার মতো বড় বাজার না হলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে হিস্যা বাড়ছে নন-ট্র্যাডিশনাল বা অপ্রচলিত বাজারের। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধিতে অপ্রচলিত বাজারই ছাড়িয়ে গেছে প্রচলিত বাজারের রপ্তানিকে। নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো প্রচলিত বাজারে পোশাকের দাম না বাড়া এবং কম প্রতিযোগিতার কারণেই ব্যবসায়ীরা নতুন বাজার খুঁজে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাকসংশ্লিষ্টরা।

রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে তিন হাজার ৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হয়েছে ৪৬৭ কোটি ডলার, যা মোট পোশাক রপ্তানির ১৫.২৬ শতাংশ। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৯.৯২ শতাংশ। তবে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের আট মাসেই অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৯২ কোটি ৬১ লাখ ডলারের, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা (ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে)। গত অর্থবছরে একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার ২৯.৭ শতাংশ। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের হিস্যা ১৬.৯৮ শতাংশ।

জানা গেছে, অপ্রচলিত বাজারের এই প্রবৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা পালন করছে জাপানের বাজার। গত অর্থবছরে জাপানে ৮৪ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। এ বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাপানে রপ্তানি হয়েছে ৭৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে এ বছর প্রথমবারের মতো জাপানে তৈরি পোশাক রপ্তানি বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। জাপানে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের বড় ক্রেতা সে দেশের সবচেয়ে বড় চেইন শপ ‘ইউনিক্লো’। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১০টি কারখানার সঙ্গে তারা তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য চুক্তিবদ্ধ।

অথচ গত ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের ভয়াবহ হামলায় একাধিক জাপানি নাগরিক নিহত  হওয়ার ঘটনায় বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে। সে সময় জাপানি নাগরিকদের বাংলাদেশ সফরের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সে দেশের সরকার। বর্তমানে সেই দুঃসময় কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিতই মিলছে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে।

রপ্তানির পরিমাণে এর পরেই আছে অস্ট্রেলিয়া। অর্থবছরের আট মাসে এই দেশে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৫০ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধির হার গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।

তবে প্রবৃদ্ধির হিসাবে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ভারতের বাজার থেকে। গত অর্থবছরে প্রতিবেশী দেশে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ২৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের। অথচ চলতি অর্থবছরের আট মাসেই সেই রপ্তানি ছাপিয়ে ৩৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩০ শতাংশ বেশি।

রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও চীন তৈরি পোশাক শিল্পে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে অন্যদের সঙ্গে বিশাল ব্যবধান রেখেই। সেই চীনেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের আট মাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের। প্রবৃদ্ধির হার ৪৮ শতাংশ। এ ছাড়া অপ্রচলিত বাজারের তালিকায় থাকা রাশিয়ায় ৩১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, তুরস্কে ১৩ কোটি ২৪ লাখ ডলার, মেক্সিকোতে ১৩ কোটি ডলার, ব্রাজিলে ১২ কোটি ২৫ লাখ ডলার, দক্ষিণ আফ্রিকায় সাত কোটি ২৫ লাখ ডলার এবং চিলিতে সাত কোটি ২০ লাখ ডলার সমপরিমাণের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে গত আট মাসে।

এ ছাড়া অপ্রচলিত বাজারের তালিকায় থাকা অন্যান্য দেশে পোশাক রপ্তানি হয়েছে আরো ৯১২ কোটি ২৯ লাখ ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.১৯ শতাংশ বেশি।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাছির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন বেড়েছে। কিন্তু সেই হিসাবে প্রডাক্টের দাম বাড়ছে না। কিন্তু নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেটে দাম বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া নতুন বাজারে সরকার ঘোষিত ৪ শতাংশ প্রণোদনাও আছে।’

তিনি বলেন, ‘ভারতের তৈরি পোশাকের বাজার ৫০ বিলিয়ন ডলারের। যদিও তারা আমদানি করে খুবই কম। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের সেখানে বড় সুযোগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী দেশ বলে সড়কপথে এবং কম সময়েই সেখানে তৈরি পোশাক রপ্তানি সম্ভব। চলতি সপ্তাহে ভারতের বেঙ্গালোরে অ্যাপারেল সোর্সিং উইকে গিয়ে দেখেছি, সেখানকার মানুষের আমাদের তৈরি পোশাক নিয়ে অনেক আগ্রহ।’

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এস এম নূরুল হকও অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর তাগিদ দেন। এ জন্য তাঁদের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘জাপানে হয়তো সাম্প্রতিক বছরে আমাদের পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। কিন্তু সেটা জাপানের মোট চাহিদার একেবারে ক্ষুদ্র অংশ। সেখানে রপ্তানি বাড়ানোর আরো অনেক সুযোগ রয়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে কেউই কষ্ট করে নতুন বাজারে যেতে চায় না। সবাই রেডিমেড বাজার খোঁজে। এর পরও যারা যায় তারা নিজেদের তাগিদেই গিয়েছে এবং সাফল্য পেয়েছে।’

 

মন্তব্য