kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

চিরায়ত ডিম

অদ্বিতীয়া

বনফুল   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অদ্বিতীয়া

বেশ ছিলাম।

আপিসে সাহেব এবং গৃহে মা ষষ্ঠী আমার প্রতি সদয় ছিলেন। সাহেব আমার মাহিনা এবং মা ষষ্ঠী আমার সংসার বাড়াইতেছিলেন। আমার পিতৃ-মাতৃকুলে আর কেহ ছিল না। উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু টাকাও জুটিয়া গিয়াছিল। খাসা ছিলাম।

প্রভাবতী—অর্থাৎ আমার গৃহিণী গড়ে বছরে দেড়টি করিয়া সন্তান প্রসব করিয়া চারি বৎসরেই আমাকে ছয়টি পুত্রকন্যার মালিক করিয়া তুলিয়াছিলেন—মাঝে দুইবার যমজ হয়।

এবংবিধ প্রজাবৃদ্ধি সত্ত্বেও কোনো অভাব ছিল না। হঠাৎ কিন্তু বেকুব বনিয়া গেলাম।

পঞ্চম বর্ষেও গৃহিণী তাঁহার স্বাভাবিক গর্ভভার বহন করিতেছিলেন। এবার কিন্তু ব্যাপারটা স্বাভাবিক হইলেও সহজ ছিল না বোঝা গেল। কারণ তিনি মারাই গেলেন। তিনি তাঁহার পিত্রালয় শান্তিপুরে ছিলেন। যদিও আমার শ্বশুর ও শাশুড়ি উভয়েই অনেককাল স্বর্গীয় হইয়াছেন, কিন্তু আমার শ্যালক বিনোদ ডাক্তার বলিয়া প্রভা প্রতিবারই সেখানে যাইত। বিনোদ লিখিতেছে—

‘হঠাৎ একলাম্পসিয়া’ হইয়া দিদি তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে মারা গেলেন। আপনাকে খবর দেওয়ার সময় ছিল না। ‘কিডনি’ খারাপ ছিল। সেজোদি ছেলেদের লইয়া সম্বলপুরে চলিয়া গিয়াছেন। তাঁহার চিঠি বোধ হয় পাইয়াছেন।

পাইলাম তো। তিনি লিখিতেছেন—‘কী করিবে বলো ভাই। সবই অদৃষ্ট। তোমার ছেলে-মেয়েরা এখন আমার কাছে কিছুদিন থাকুক। আমি তো বাঁঝা মানুষ। আমার কোনো অসুবিধা হইবে না। ছেলেরা ভালোই আছে। কোনো ভাবনা করিও না। ইতি...’

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া ছুটির দরখাস্ত করিলাম। কপালগুণে আমার সাহেবও বদলি হইয়া গিয়াছিলেন। ছুটি সুতরাং মঞ্জুর হইলো না।

দুই মাস পরে।

সম্বলপুরবাসিনী শ্যালিকার আর একখানি পত্র পাইলাম। তিনি অন্যান্য নানা কথার পর লিখিতেছেন :

‘প্রভা সতীলক্ষ্মী ভাগ্যবতী ছিল। সে গেছে, বেশ গেছে। জাজ্বল্যমান স্বামী-ছেলেপুলে সব রেখে গেছে। কিন্তু তোমার তো তা বলে সংসারটা ছারখার করা তো ভালো দেখায় না। উচিতও নয়। আমার কথা শোনো। আবার বিয়ে করো তুমি। ....এখানে একটি বেশ ডাগরডোগর মেয়ে আছে। যদি তোমার ইচ্ছা হয় বলো, সম্বন্ধ করি। আমার তো মেয়েটিকে বেশ পছন্দ। তোমার নিশ্চয়ই পছন্দ হবে।’- ইত্যাকার নানারূপ কথা।

সাত দিন ভাবিয়া—অর্থাৎ এক টিন চা ও পাঁচ টিন সিগারেট নিঃশেষ করিয়া আমি এই চিরন্তন সমস্যার যে মীমাংসা করিলাম তাহা মোটেই অসাধারণ নয়। সেজোদিকে যে পত্র দিলাম তাহা অংশত এইরূপ—

‘বিয়ে করতে আর ইচ্ছা হয় না। প্রভার কথা সর্বদাই মনে পড়ে। কিন্তু দেখো সেজোদি, আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে তো সংসার বসে নেই। সে আপনার চালে ঠিক চলছে ও চলবে। সুতরাং ভাবপ্রবণ হওয়াটা শোভন হলেও সুযুক্তির নয়—এটা ঠিকই। তা ছাড়া দেখো আমরা ‘মা ফলেষু কদাচ’ দেশের লোক। আর তোমরাও যখন বলছ তখন আরেকবার সংসারটা বজায় রাখার চেষ্টা করাই উচিত বোধ হয়। দ্বিতীয় পক্ষের বিয়েতে আবার পছন্দ-অপছন্দ! তোমার পছন্দ হয়েছে তো?....

ক্রমশ বিবাহের দিন স্থির হইল। সম্বলপুরেই বিবাহ। সেজোদি বুদ্ধিমতি। লিখিয়াছেন—‘ছেলেদের লাহোরে বড়দির কাছে পাঠিয়ে দিলাম। বাপের বিয়ে দেখতে নেই।’ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলাম।

যথাকালে সাহেবের হাতে-পায়ে ধরিয়া হপ্তাখানেকের ছুটি লইয়া সোজা রওনা হইয়া পড়িলাম। একাই। এ বিবাহর কথা কাউকে বলিতে আছে? কী ভাবিয়া গোঁফটা কামাইয়া ফেলিলাম। একে এই কালো মোটা চেহারা—তাহার উপর কাঁচাপাকা এক ঝুড়ি গোঁফ লইয়া বিবাহ করিতে যাইতে নিজেরই কেমন বাধ-বাধ ঠেকিতে লাগিল।

বিবাহ-বাসর।

ওই অবগুণ্ঠিতা চেলিপরা মেয়েটিই আবার আমার সঙ্গিনী হইতে চলিয়াছে। প্রভাকেও একদিন এইভাবেই পাইয়াছিলাম—সে কোথায় চলিয়া গেল। আজ আবার আরেকজন আসিয়াছে। ইহার ‘কিডনি’ কেমন, কে জানে! নানারূপ এলোমেলো কথা মনে আসিতে লাগিল। প্রভার মুখ বারবার মনে পড়ে। ছেলেগুলি না জানি এখন কী করিতেছে? ...মৃত্যুর পরও কি আত্মা সত্যি থাকে?... এ মেয়েটি বেশ বড়সড় দেখিতেছি—কিন্তু ভারি জড়সড় হইয়া বসিয়া আছে একেবারে মাথা নিচু করিয়া। আচ্ছা, প্রভার আত্মার যদি... গৃহ্নামি...

যন্ত্রচালিত বিবাহ অনুষ্ঠান চলিতে লাগিল। শুভদৃষ্টির সময় মেয়েটি কিছুতেই ঘোমটা খুলিল না। সেজোদি বলিলেন, ভারি লাজুক। বাসরঘরেও শুনিলাম—ভারি লাজুক। আপাদমস্তক মুড়িয়া পাশ ফিরিয়া শুইল। আমিও ঘুমাইলাম। সেজোদি লোক জমিতে দেন নাই। তা ছাড়া দ্বিতীয় পক্ষের বিবাহ, কে আমোদ-প্রমোদ করিতে চায়। মেয়েটির আপন বলিতে কেহ ছিল না। পরের বাড়িতে মানুষ। সেজোদির বাড়িতেই বিবাহ—বলিতে গেলে সেজোদিই কন্যাকর্তা। সুতরাং বিবাহ-উৎসব জমে নাই।

জমিল ফুলশয্যার রাতে।

বক্ষে অনেক আশা ও আশঙ্কা লইয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখি আমার ছয়টি সন্তান ও আরো এক নবজাত শিশু লইয়া স্বয়ং প্রভা খাটে বসিয়া। স্বপ্ন দেখিতেছি নাকি?

প্রভা কহিল—‘ছি, ছি, সেজোদিরই জিত হলো?’

তার মানে?

‘মানে আবার কী? এবার ছেলে হওয়ার সময় ভারি কষ্ট হয়েছিল। অপরাধের মধ্যে সেজোদিকে বলেছিলাম যে আমি মরলে ওর ভারি কষ্ট হবে। সেজোদি বললেন, ‘হাতি হবে। তিন মাস যেতে না যেতে ফের বিয়ে করবে।’ আমি বললাম—কখনো নয়! তারপর বাজি রেখে সেজোদি আর বিনোদ মিলে এই ষড়যন্ত্র!

আমি শান্তিপুরেই ছিলাম। আজ এই সন্ধ্যাবেলা এসেছি। এসে দেখি সেজোদিরই জিত। পাড়ার ছোড়াকে কনে সাজিয়ে সেজোদি বাজি জিতেছে। ১০০টি টাকা দাও এখন। ছি ছি, কী তোমরা! অমন গোঁফটা কী বলে কামালে?’

আমার অবস্থা অবর্ণনীয়। পরদিন প্রভাতে সেজোদির পাওনা চুকাইয়া দিয়াছি। এখন গোঁফটা উঠিলে যে বাঁচি!

 

(লেখকের আসল নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যিক ছদ্মনাম বনফুল। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন চিকিৎসক। ‘শনিবারের চিঠি’তে ব্যঙ্গ কবিতা ও প্যারোডি লিখে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন।)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা