kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

MAN VS বাড়িওয়ালা

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




MAN VS বাড়িওয়ালা

আমাদের বাড়িওয়ালা চাচা দুইটা কাজ খুব যত্ন নিয়ে করেন। এক. প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বিকট শব্দে গারগল করা, দুই. ঠিক রাত ১১টায় গেটের তালা লাগিয়ে দেওয়া। আমার বাবা-চাচারা আগে রেডিওর খবর দেখে ঘড়ির সময় ঠিক করতেন। আমরা এখন আমাদের বাড়িওয়ালার গেট বন্ধ করার শব্দ শুনে ঘড়ির সময় ঠিক করি।

একবার প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হচ্ছিল। এর মধ্যেই দেখলাম আমাদের বাড়িওয়ালা ছাতা মাথায় দিয়ে ঠিক ১১টায় গেট বন্ধ করতে যাচ্ছেন। এই দৃশ্য আমি আর আমার ছোট ভাই জানালা দিয়ে দেখছিলাম। বাড়িওয়ালা গেট বন্ধ করে চলে যাওয়ার পর আমার ছোট ভাই বলে উঠেছিল, ‘ইস! হলো না!’

‘কি হলো না?’ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

‘বজ্রপাতের সময় হাতে ছাতা থাকলে বজ্রপাত নাকি মাথার ওপর পড়ার আশঙ্কা বেশি। আমি সেই আশা নিয়েই তাকিয়েছিলাম!’ আমার ছোট ভাই হাই তুলতে তুলতে বলল।

আমরা অনেকবারই বাড়িওয়ালার কাছে গিয়েছিলাম, যেন আমাদের সবাইকে একটা করে চাবি দেওয়া হয়। বাড়িওয়ালার এক জবাব, ‘এতে পরিবেশ নষ্ট হবে!’

‘হালা পরিবেশ অধিদপ্তর দেখাচ্ছে!’ এক ভাড়াটিয়া বিড়বিড় করেছিলেন।

এভাবেই সব চলছিল। আমি অনেক কনসার্ট, বন্ধুদের পার্টি, বিয়ের অনুষ্ঠান অর্ধেক রেখে চলে আসি শুধু এই ঝামেলার কারণে। একদিন রাতে ভার্সিটির একটা প্রজেক্ট শেষ করে ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে মেজাজ খারাপ। এর মধ্যেই দেখি ১১টা ১০ হয়ে গেছে। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, আজ এসপার না হয় ওসপার। এসে দেখি গেট বন্ধ। ধুমধাম দুইটা কিল দিতেই আমাদের দারোয়ান তায়েব মিয়া গেটের পাশে ছোট ফোকরটা খুলে খুব অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, যেন আমি চিড়িয়াখানার কোনো মুখপোড়া হনুমান।

‘কী হইছে?’

‘কী হইছে মানে? গেট খোল ভেতরে যাব।’

‘মানে কী? কী কন এসব? গেট তো বন্ধ, চাবি তো খালুর কাছে।’

‘তাড়াতাড়ি গিয়া চাবি নিইয়া আয়। নইলে আমি আজকে তোর প্যান্ট খুলে ছেড়ে দেব!’

রাগে গজগজ করে উঠি আমি। তায়েব মিয়া ভেতরে গিয়ে পাঁচ মিনিটেও যখন এলো না আমি ধামধাম গেটে লাথি দিতে শুরু করলাম। কয়েকটা ফ্ল্যাটের জানালা খুলে আমার কাণ্ড দেখছিল। কিছুক্ষণ পর দেখি আমাদের বাড়িওয়ালা গম্ভীর মুখে হেঁটে আসছে। কিছু না বলে উনি গেট খুলে দিল। আমি ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে’ শিসটা তুলতে চেষ্টা করলাম। শিস দিতে দিতে ঢুকতে চেয়েছিলাম।

বাসায় ঢুকতেই আব্বা বলল, ‘এটা কী করলি? এখন তো বাড়িওয়ালা ঝামেলা করবে।’

আমি চেঁচিয়ে বললাম, ‘এই মিনমিনে স্বভাবে এভাবেই চলতে হবে। মানুষের কাজ থাকতে পারে না?’

আমার ছোট ভাই হাতে কিল দিয়ে বলল, ‘শাব্বাশ বাঘের বাচ্চা!’ শাবাশ!

কিন্তু ঘটনা অনেক দূর গড়াল। পরদিন সকালে বাড়িওয়ালা বাসায় এসে বললেন, উনি আমাদের এক মাসের নোটিশ দিচ্ছেন, আমরা যেন বাসা ছেড়ে দিই। আমার বাবাকে দেখলাম কিছুক্ষণ হু-হাঁ করে অবশেষে মেনে নিলেন।

‘ফাইজলামি নাকি?’ বাড়িওয়ালা গেলে আমি চেঁচালাম।

আব্বা বললেন, ‘শোন, ঝামেলা করিস না। এলাকার কান কাটা মজিদ ওর পোষা। এর আগেও এক ভাড়াটিয়া ঝামেলা করছিল বলে সেই ভাড়াটিকে পরে খুব হেনস্তা করে। বাদ দে, ঝামেলা করে লাভ নাই।’

‘বাদ দে, ঝামেলা করে লাভ নাই’—এই একটা কথার চক্করে পড়ে কে জানে কত বিপ্লব, কত প্রতিবাদ মুকুলেই ঝরে গেছে।

আমরা যখন মোটামুটি বাসাটাসা খুঁজছি এর মধ্যেই ঘটল ঘটনা।

এক দিন রাত সাড়ে ১১টায় দেখি গেট থেকে কে যেন চেঁচিয়ে আমার বাবার নাম ধরে ডাকছে। বের হয়ে দেখি আমাদের দাদা অবসরপ্রাপ্ত উকিল লতিফুর রহমান খাঁ। একটা রাজহাঁস আর ব্যাগ ভর্তি আনারস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি আর বাবা নেমে এলাম।

‘কী ব্যাপার গেট খুলোস না ক্যান?’ দাদা চেঁচিয়ে বললেন।

বাবা আমতা আমতা করছিলেন।

‘আরে কী গাধার মতো ভ্যা ভ্যা করস! গেট খোল।’

‘ইয়ে চাবি তো বাড়িওয়ালার কাছে।’

‘তাইলে চাবি নিয়া আয়।’ 

‘ইয়ে এখন কি চাবি দেবে? রাত ১১টা, ও ও...’

‘এই পুলক, বাসায় হাতুড়ি আছে?’ দাদা আমাকে বললেন। ‘ওইটা আইনা তালা ভাঙ।’

আমি দৌড়ে গিয়ে হাতুড়ি এনে দুই ঘা দিতেই দারোয়ান তায়েব বলল, ‘আরে করেন কী, করেন কী?’

আমার তখন রাগ চেপে গেছে, হিসহিস করে বললাম, ‘সইরা খাড়া। মাথার ওপরে পড়বে নয়তো!’ তায়েব মিয়া লাফ মেরে সরে দাঁড়াল।

এরপর দুই তিন ঘা দিতেই তালা খুলে পড়ল। দাদা বাসায় এসে বললেন, ‘এ কী অবস্থা? তোরা কিছু বলস না?’

‘কী বলব? বাসা পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হচ্ছে কয় দিন পর।’ আমার ছোট ভাই বলল।

দাদা বললেন, ‘সকালে কথা হবে। আমি ক্লান্ত!’

পরদিন সকালে নাটকের শেষ অংশ মঞ্চস্থ হলো। সকাল ৮টায় ঘুম ভাঙল বেলের শব্দে। উঠে দেখি বাড়িওয়ালার সঙ্গে কান কাটা মজিদ।

‘তোমার বাবাকে ডাকো।’

আমি গিয়ে দাদাকে নিয়ে এলাম।

‘কী চাই?’ বজ্রকণ্ঠ দাদার।

বাড়িওয়ালা চমকে বললেন, ‘এটা আমার বাসা। আমি বাড়িওয়ালা।’

‘আপনি বাড়িওয়ালা হতে পারেন, কিন্তু যতক্ষণ বাসা ভাড়া আমরা দিচ্ছি এই বাসা আমার। আপনি জুতা পরে ঢুকছেন কেন? বাইরে দাঁড়ান।’

অবাক হয়ে দেখলাম বাড়িওয়ালা সুরসুর করে বাইরে চলে গেলেন। এর চেয়েও অবাক করা ব্যাপার ঘটল, দেখলাম কান কাটা মজিদ দাদাকে পায়ে ধরে সালাম করে ফেলল।

‘কে তুমি?’ দাদা জিজ্ঞেস করলেন।

‘দাদু, আমি মজিদ, নায়েব আলীর পোলা। আপনি আমার বাবাকে একবার জেল থেকে ছাড়াইয়া আনছিলেন!’

‘তো কী হইছে? এখন কী চাও তোমরা? আর আপনি কি বেআক্কেল নাকি? এই ঢাকা শহরে রাত ১১টা কি কোন রাত? পরে কোনো ঝামেলা হলে কী হবে? ধরেন কেউ অসুস্থ দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এদিকে গেট খুলতে দেরি হয়ে রোগীর কিছু হয়ে গেল? এরপর আপনার নামে কেইস করে দিলে কী হবে, ভাবছেন কিছু?’

‘তা তো অবশ্যই, তা তো অবশ্যই!’ পাশ থেকে কান কাটা মজিদ মাথা নাড়ল।

‘শোনেন, ব্যায়ামট্যায়াম করেন, পার্কে যান, হাঁটেন। সারা দিন বাসায় বসে থাকলে এই হয়, বুদ্ধিসুদ্ধি কমে যায়। গেট এখন থেকে রাত ১২টার পরে লাগাবেন, আর সবাইকে একটা করে চাবি দেবেন।’

‘তা তো অবশ্যই, তা তো অবশ্যই!’ পাশ থেকে কান কাটা মজিদ মাথা নাড়ল।

‘আর আপনি কি জানি বলতে আসছিলেন? এত সকালে মানুষের বাসায় এসে কেউ বেল দেয়? বিকেলে আইসেন।’ এই বলে দাদা ধড়াম করে দরজা লাগিয়ে দেন।

বলাই বাহুল্য, এরপর থেকে আমাদের বাসা তো ছাড়তেই হয়নি রাত ১২টা পর্যন্ত গেট খোলা থাকে। এই তো কয় দিন আগে ‘কনসার্ট’ দেখে রাত সাড়ে ১২টায় গুনগুন করতে করতে বাসায় ফিরছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা