kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

বছরে ৭০ কোটি টাকা হারানোর ভয়

এনবিআরের করসীমায় আটকা সাধারণ আয়ের মানুষ

ফারজানা লাবনী   

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এনবিআরের করসীমায় আটকা সাধারণ আয়ের মানুষ

এক করবর্ষে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হবে এমন ভাবনায় মাসিক ২১ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিট আয়ের সাধারণ মানুষকে করসীমায় চেপে ধরে রেখেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এনবিআরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলে এক করবর্ষে  এনবিআরের আদায় কমবে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা। দুই লাখ ৫০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত করযোগ্য আয় আছে এমন করদাতাদের অধিকাংশ সাধারণ  আয়ের মানুষ। বিভিন্ন রেয়াত ও সুবিধা বাদ দিয়ে এদের নিট মাসিক আয় ২১ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা।

করবর্ষে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা এবং এ হিসাব তুলনা করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এটি নির্ধারণ করা হবে তিন লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। বড় অঙ্কের এ লক্ষ্যমাত্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা কম আদায় হলে তা এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে খুব বেশি প্রভাব ফেলার কথা নয়।

এই একই মত দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবছর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। ন্যূনতম করসীমায় থাকা সাধারণ আয়ের মানুষরা পরিবারের খরচ বাঁচিয়ে বছর শেষে কর খাতে চার-পাঁচ হাজার টাকা এনবিআরের কোষাগারে জমা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। লক্ষ্যপূরণে এনবিআরের যে বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত, সেদিকে না গিয়ে তারা অল্প আয়ের মানুষদের ওপর চেপে বসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর জন্য এনবিআরের উচিত রাজস্ব ফাঁকিবাজ সম্পদশালী এবং আদালতে আটকে থাকা রাজস্ব বিষয়ক মামলা নিষ্পত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে করমুক্ত সীমা বাড়ানো হচ্ছে না। ন্যূনতম করসীমায় থাকা করদাতাদের কাছ থেকে খুব বেশি আদায় হয় না। বিপরীতে বেশি আয়ের বড় করদাতাদের কাছ থেকে অনেক বেশি আদায় হয়। বহুদিন ধরে আদালতে পড়ে থাকা রাজস্ব বিষয়ক মামলা নিষ্পতি হলে এনবিআরের অনেক আয় বাড়বে। অল্প আয়ের মানুষদের ছেড়ে দিয়ে এনবিআরের এসব বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।’

এনবিআর সূত্র জানায়, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রাজস্ব মামলার সংখ্যা ২৪ হাজার ৫৭২টি। এসব মামলা নিষ্পত্তি হলে রাজস্ব খাতে এনবিআরের আদায় হবে ৩০ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। বছরের পর বছর এসব মামলা অমীমাংসিত থাকায় সরকারের তহবিলে একটি টাকাও জমা হচ্ছে না।

বর্তমানে ইটিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এসব ব্যক্তির মধ্যে রিটার্ন দাখিল করে মাত্র ২১-২২ লাখ। এদের মধ্যে নিয়মিত কর দিচ্ছে গড়ে ১৫ লাখ। দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে আয় থাকা কর দেওয়া ব্যক্তির সংখ্যা এক লাখ ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ। এসব ব্যক্তির কাছ থেকে এনবিআর আদায় করে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতিবছরই বাড়ছে। বিশেষভাবে ঘরভাড়া, চিকিৎসা, খাবার, যাতায়াত, সন্তানের পড়ালেখার খরচ বেড়েই চলেছে। অথচ এসব খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি টাকাও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি। জাতীয় বাজেটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা দুই লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে।

করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জোরালো দাবি থাকলেও এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন ইটিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। কিন্তু রিটার্ন দিচ্ছে এর চেয়ে কম। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে কিছু মানুষ করসীমার বাইরে চলে যাবে। করদাতার সংখ্যা ৮০ লাখ বা এক কোটি করা সম্ভব হলে করমুক্ত সীমা ২০ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো হলেও রাজস্ব আদায়ে তেমন প্রভাব পড়বে না।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ আয়ের মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ কর হিসাবে বড় অঙ্কের অর্থ চাপিয়ে দিলে অল্প আয়ের মানুষের জন্য বোঝা হয়ে যায়।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা