kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

পাকিস্তানি শাসনে চাপানো অর্থবছর আর কতকাল?

আজাদুর রহমান চন্দন   

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পাকিস্তানি শাসনে চাপানো অর্থবছর আর কতকাল?

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) যথাযথ ও পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন যেকোনো দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে আগে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, নানা কারণে এডিপির বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হয়নি এবং বছর শেষে এসে এডিপি কাটছাঁট করতে হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এডিপির মাত্র ২৭ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছিল। প্রথমার্ধের এই ব্যয় আগের অর্থবছরের (২০১২-১৩) একই সময়ের তুলনায় ৩ শতাংশ কম ছিল। প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা বরাবরই এডিপির শতভাগ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ  বিভাগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের নিয়ে এক বৈঠকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে এক নির্দেশনায় তিনি বলেছিলেন, প্রতি বছর বর্ষায় অর্থবছর শুরু হয় বলে ওই সময় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজগুলো করা সম্ভব হয় না। তবে প্রকল্পের নথিপত্রের কাজগুলো ওই সময়ের মধ্যে শেষ করে ফেলার জন্য সচিবদের নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাগজপত্রের কাজ শেষে শুকনো মৌসুমে অবকাঠামোগত কাজগুলো করতে হবে। এতে অর্থের অপচয় বন্ধ এবং জনগণের উপকার হবে।

প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ ও নির্দেশনায় গত কয়েক বছরে অঙ্কের হিসাবে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার অনেকটা বেড়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরের সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার যথাক্রমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৪.০২ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮৯.৭৬ শতাংশ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯৩ শতাংশ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯১ শতাংশ এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৯৩ শতাংশ। যদিও চলতি অর্থবছরের সাত মাস চলে যাওয়ার পরও কিছু মন্ত্রণালয়-বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ বা তারও নিচে। পূর্ববর্তী অর্থবছরের (২০১৭-১৮) প্রথম সাত মাসে কোনো কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপি বাস্তবায়নে আগের রেকর্ড ভাঙলেও সাত মন্ত্রণালয় ও বিভাগ চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়। ওই সময় এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল শিল্প মন্ত্রণালয়, সাত মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৭.৩৯ শতাংশ। একই সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করেছিল মাত্র পৌনে ৮ শতাংশ। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ সচিবালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি), আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের হারও ছিল ১০ শতাংশের নিচে। একই সময়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ বাস্তবায়ন করেছিল ৬৮ শতাংশ।

২০১৮ সালের ৩ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে তখনকার পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছিলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিপি ৯৩.৭১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে এটি মূল এডিপি নয়, সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়ন।

অভিযোগ আছে, প্রকল্প কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, গাফিলতি ও দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে দেশে এডিপি বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হয় না। এসব কারণে প্রতি বছরই এডিপি কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এডিপি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার প্রধান কারণটি যদিও বরাবরই অনালোচিত থেকে যায় অনেকাংশে। সেটি হলো পাকিস্তানি শাসনামলে আরোপিত পরিবেশবিমুখ অর্থবছর গণনা, যেটি এত বছরেও সংশোধন করা হয়নি। বাংলাদেশে অর্থবছর শুরু হয় জুলাই মাসে। তখন বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে যায়। ফলে অর্থবছরের প্রথম দিকে কাজ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশে বাজেট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় প্রতিটি অর্থবছরকে চারটি কোয়ার্টারে ভাগ করে। প্রথম কোয়ার্টারে (জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) বন্যায় বিপর্যস্ত থাকে গোটা দেশ। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে হয় শীতের আগমন। তৃতীয় কোয়ার্টারে বিদায় নেয় শীত। চতুর্থ কোয়ার্টারে (এপ্রিল, মে ও জুন) দেখা দেয় আগাম বন্যার বিপর্যয়। অক্টোবর-নভেম্বর সাইক্লোনের মাস, এপ্রিল-মে কালবৈশাখী ও আগাম বন্যার মাস। অতএব, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কাজের সময় পাওয়া যায় ডিসেম্বর থেকে মার্চ; দেড় কোয়ার্টার মাত্র। জুনের মধ্যেই উন্নয়ন প্রকল্প শেষ করার তাগিদ থাকে। তাই বর্ষার শুরুতে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করতে হয়। এরই সুযোগ নেয় দুষ্টচক্র। তারা সামান্য কিছুতেই খারাপ আবহাওয়ার অজুহাত দিয়ে কাজ খারাপ করে। অর্থবছরের শেষে এসে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প শেষ করে, যাতে কাজের মান খারাপ হয়। কখনো কখনো ওই অজুহাতে তারা প্রকল্পটি ত্রুটিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেয় অথবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলে সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে নেয়। আবার অনেক সময় কাজ না করেও ঠিকাদাররা অর্থ তুলে নেয়। এসব নিয়ে অভিযোগ তোলা হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাস্তি হওয়ার রেওয়াজ তেমন নেই। বড়জোর এক মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু কিছুতেই অর্থবছর পাল্টানোর কথা তাঁরা বলেন না।

একজন নামকরা মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক সম্প্রতি একান্ত আলাপচারিতায় আক্ষেপ করে বলেন, ‘যেকোনো বিষয়ে পাকিস্তানি গন্ধ পেলেই আমরা খেপে উঠি। অথচ পাকিস্তানি শাসকদের আরোপ করা অর্থবছরটি এত বছরেও বদলাইনি। মুহিত ভাইকে একবার বুঝিয়ে রাজি করিয়ে ফেলেছিলাম পরের বছর জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত একটি ইন্টেরিম বাজেট দিয়ে তারপর থেকে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু করার বিষয়ে, কিন্তু প্রকল্পে দুর্নীতির সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।’

অনেকের ধারণা, পাশ্চাত্যের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়েই বুঝি জুলাই-জুন অর্থবছর রাখা হয়েছে! বাস্তবে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। যুক্তরাজ্যে অর্থবছর শুরু হয় ৬ এপ্রিল। যুক্তরাষ্ট্রে ১ অক্টোবর শুরু হয় অর্থবছর। মার্কিন মুলুকের অন্যান্য দেশেও অক্টোবর-সেপ্টেম্বর অর্থবছর। আর পাকিস্তান ছাড়া এ অঞ্চলের খুব কম দেশেই জুলাই থেকে অর্থবছর গণনা করা হয়। আমাদের প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারে অর্থবছর শুরু হয় ১ এপ্রিল। হংকং, জাপান ও সিঙ্গাপুরেও তাই। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, চীন ও তাইওয়ানে অর্থবছর শুরু হয় ১ জানুয়ারি। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতা লাভের চার দশক পরও অর্থবছর গণনার ক্ষেত্রে আমরা পাকিস্তানি ধারায়ই রয়ে গেলাম। অথচ এপ্রিল কিংবা বৈশাখ থেকে অর্থবছর শুরু করাটা আমাদের দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই হবে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

মোগল সম্রাট আকবর ভারতবর্ষের সেরা সুবা বাংলায় পহেলা বৈশাখ থেকে অর্থবর্ষ গণনার প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন মূলত রাজস্ব আহরণ তথা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে নতুন সনের প্রবর্তন করেছিলেন দিল্লিতে। তখনই আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলা সন গণনা শুরু হয়েছিল। ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে পরিচালিত ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম বাজেট আইন সভায় পেশ করা হয়েছিল ৭ এপ্রিল, ১৮৬০। অর্থবছরের ধারণাটা তখনো বাংলা সনের অনুগামী রাখার পক্ষপাতী ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম অর্থমন্ত্রী ও বিচক্ষণ অর্থনীতিবিদ জেমস উইলসন। এপ্রিল থেকেই তাঁর বাজেটটির বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গিয়েছিল, যার সাযুজ্য ছিল প্রচলিত বাংলা সনের সঙ্গে। এর মাত্র তিন মাসের মাথায় ডিসেন্ট্রিতে ভুগে মারা যান জেমস উইলসন। পরবর্তী চার বছর বাজেট এপ্রিল-মে এমনকি জুন মাসে উপস্থাপিত হলেও ১৮৬৫ সাল থেকে স্থায়ীভাবে ১ এপ্রিল থেকে অর্থবছর শুরু করার বিধান কার্যকর হয়। ব্রিটিশ শাসন বাংলা-বিহার-ওড়িষা থেকে গোটা ভারতবর্ষে বিস্তৃত হতে থাকলে বিশেষ করে রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলে ব্রিটিশ ভাবধারায় অর্থবছর আলাদাভাবে গণনার রেওয়াজ চালু হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর নতুন ভারত প্রজাতন্ত্র ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ অর্থবছর অনুসরণে ফিরে গেলেও পাকিস্তান জুলাই-জুন অর্থবছর চালু রাখে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি বা উৎপাদন মৌসুম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—সব কিছুই ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিন্ন। সে কারণে জুলাই-জুন অর্থবছর সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত।

দুঃখজনকভাবে পাকিস্তান আমলে প্রবর্তিত জুলাই-জুন এখনো বাংলাদেশের অর্থবছর হয়ে আছে। পাকিস্তানে বর্ষা শুরু হয় জুলাইয়ের মাঝামাঝি। শ্রাবণ ও ভাদ্র তাদের বর্ষাকাল। তাই জুলাই-জুন অর্থবছর হওয়া তাদের জন্য বরং সুবিধাজনক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও অর্থবছরকে বাংলার প্রকৃতি-পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রতিফলক বাংলা সনের অনুগামী করার বিষয়টি বিবেচনায় আসেনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা