kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

ভারতের লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

বিকল্পের অভাব!

► মোদির জয় দুর্নীতি, হতাশার বিরুদ্ধে
► সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বড় হাতিয়ার

মেহেদী হাসান   

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিকল্পের অভাব!

একসময়ের চাওয়ালা নরেন্দ্র মোদির বিজেপির কাছে আবারও হারল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পৌত্র ও রাজীব গান্ধীপুত্র রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়ে এবার ভালো করেছে রাহুলের দল। কিন্তু মোদির সাফল্যের কাছে তা ম্লান। ভারতের নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের কৃতিত্ব যতটা না দলের, তার চেয়েও অনেক বেশি নরেন্দ্র মোদির। আর মোদির এই জয় রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসের বিপক্ষে নয়, বরং দুর্নীতি, তরুণদের হতাশা, শ্রেণি-বিদ্বেষ ও বঞ্চনা এবং কিছুটা হলেও পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে। কারো কারো মতে, মোদি তরুণদের টার্গেট করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন আগাগোড়াই। এ ক্ষেত্রে বিরোধীরা ছিল অনেক পিছিয়ে। নয়াদিল্লিতে ভারতীয় নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিরোধী দলগুলোর ব্যর্থতা হলো তারা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প দিতে পারেনি। ভোটাররা যে বিজেপিকে খুব পছন্দ করে ভোট দিয়েছে তা নয়। আসলে তাদের কাছে এর চেয়ে ভালো বিকল্প ছিল না।’ পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। জয়িতা বলেন, ‘বিশেষ শ্রেণি বা বনেদি শ্রেণির বিরুদ্ধে এ রায়। লোকজন বঞ্চনা বোধ করেছে। মোদি কঠোর পরিশ্রমী, সৎ। জনগণ দেখতে পেয়েছে যে মোদি পরিবারতন্ত্রের কেউ নন। তাঁর চিন্তা-চেতনা, কাজ সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষ যা চায় তার অনেকটাই মোদির কাছ থেকে পাওয়ার সুযোগ আছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও ভারতের তরুণরা কিন্তু কেজরিওয়ালকে নিয়ে খুব আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় জনগণ কেজরিওয়ালের ব্যাপারে ভীষণ হতাশ হয়েছে। জনগণ মোদির বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, কারণ তাদের কাছে আর বিকল্প নেই।’  জয়িতা ভট্টাচার্য অভিমত দিয়ে বলেন, ‘ভারতে মোদির নতুন করে উত্থানকে ধর্মীয় উগ্রবাদ বা উগ্রজাতীয়তাবাদের উত্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ তরুণ ভারতীয়রা কিন্তু সেক্যুলার ধারাতেই প্রথম বিকল্প খুঁজেছে। এ কারণে কেজরিওয়ালের ব্যাপক সমর্থন আমরা দেখতে পেয়েছিলাম।’ নরেন্দ্র মোদির যে কারিশমা ম্যাজিক তার ধারেকাছেও ছিলেন না রাহুল গান্ধী। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো ভারতের সংসদ সদস্য হয়েই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। এবার পুরো ভারত জয় করে আরো শক্তিশালী সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে রাহুল গান্ধী ২০১৪ ও ২০১৯ সালের কোনো নির্বাচনেই দলকে জয়ের বন্দরে ভেড়াতে পারেননি। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, কেবল পারিবারিক পরিচয়ে রাজনীতিতে যে খুব সুবিধা করা যায় না তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল বিকেলে বৈরুত থেকে টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো নেতার ট্র্যাজেডি হলে ভোটের রাজনীতিতে তার সুবিধা পায় একটি প্রজন্মই। ইন্দিরা গান্ধী ট্র্যাজেডির সুবিধা পেয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। রাজীব গান্ধী ট্র্যাজেডির সুবিধা পেয়েছেন পরবর্তী সময়ে সোনিয়া গান্ধী। এরপর নতুন আর ট্র্যাজেডি হয়নি। রাহুল এর বিশেষ সুবিধা পাননি। তিনি বলেন, বিজেপি যেভাবে দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা করে তা নেই কংগ্রেসে। এখন কংগ্রেস যদি আবার পরিবারকেই নেতৃত্বে নিয়ে আসে তবে তাও হয়তো ইতিবাচক ফল আনবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পুরো নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ সুনির্দিষ্ট দর্শন বা রূপকল্প দিয়ে ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে পারেনি।

ইমতিয়াজ আহমেদ আরো বলেন, এবার নির্বাচনে ধর্মের বিষয়টিও বড় পরিসরে এসেছে, যেটাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ বা সাম্প্রদায়িকতা বলা হচ্ছে। পাকিস্তানেও অতীতে এমনটি দেখা গেছে। তবে এটি দিয়ে খুব বেশি দূর যাওয়া যায় না। মোদি যদি দেশকে উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারেন তবে তাঁর ওপর ভারতীয়দের আস্থা থাকবে। ভারতের উইঅন টিভি চ্যানেলের বার্তা সম্পাদক অদিতি গৌতম লোকসভা নির্বাচন নিয়ে এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, এই ফলের জন্য কংগ্রেস নিজেদের ছাড়া কাউকে দায়ী করতে পারে না। বিজেপির ‘কঠোর হিন্দুত্ববাদের’ বিপরীতে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও ‘কোমল হিন্দুত্ববাদ’ কৌশল নিয়েছিলেন। তাঁরা ভাই-বোন নির্বাচনের আগে বিভিন্ন মন্দিরে গেছেন। জনগণ হিন্দুত্ববাদের বিজেপিকেই সমর্থন করেছে। ২০১৪ সালে কংগ্রেসের পরাজয়ের পর প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। তিনি ভোটারদের মন জয় করলেও প্রতিপক্ষের ভোট ব্যাংক ভাঙতে পারেননি। লোকসভায় সর্বোচ্চ ৮০ আসনের উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস জোট গড়তেই ব্যর্থ হয়েছে।

আরেকটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাহুল গান্ধী তাঁর ‘খাস তালুক’ আমেথিতেই হেরেছেন। এর চেয়ে বড় ধাক্কা আর কিছু হতে পারে না।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ভাষ্যকার অমিতাভ তিউয়ারির মনে করেন, উন্নয়ন ও ভোট ব্যাংকের ভালো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বিজেপি ভালো ফল পেয়েছে।

সমালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলেও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে মোদি তথা বিজেপির সফল হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে সিপিআই (এম)-এর মুখপত্র নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত পিপলস ডেমোক্রেসির এক সম্পাদকীয়তেও। এতে বলা হয়েছে, বিজেপি তথা মোদির নির্বাচনী প্রচারাভিযানের পুরোটা জুড়ে ব্যবহার করা হয়েছে অভূতপূর্ব অর্থশক্তি। শত শত কোটি ডলার খরচ করা হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারাভিযানে। বার্তা ছিল—মোদি হলেন সেই নেতা, যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছেন, যা ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায়।

কলকাতা থেকে প্রকাশিত গণশক্তির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপি তার প্রচারাভিযানে প্রকৃত সমস্যা আড়াল করতে মোদিকে ‘শক্তিশালী নেতা’ হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি পুলওয়ামা-উত্তর পরিস্থিতি ও বালাকোট অভিযানের ঘটনায় জারিত জাতীয়তাবাদকে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা