kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

বন্ড দুর্নীতি : হিসাব জব্দ ১১৭ প্রতিষ্ঠানের

প্রকৃত মালিকরা আড়ালেই

ফারজানা লাবনী   

২৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বন্ড দুর্নীতি : হিসাব জব্দ ১১৭ প্রতিষ্ঠানের

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রপ্তানিমুখী ১১৭ প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ করে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসে এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দের পর তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকদের সন্ধান মেলেনি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মিথ্যা তথ্যে বন্ড সুবিধা নিয়ে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কার্যক্রম চালিয়েছে। এনবিআরের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে দুর্নীতির এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বন্ড দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এক হাজার ১৬০টি প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত করে এনবিআর। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে ১১৭টি নতুন নামে আবারও বন্ড সুবিধা গ্রহণ করে এবং একইভাবে দুর্নীতি করতে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেছে। মালিক হিসেবে যাদের নাম দিয়েছে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এত দিন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কর্মচারী পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি কার্যক্রম চালিয়েছে। এভাবে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠান ৮৪৫ কোটি টাকার পণ্য দেশে এনে খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। অন্যদিকে ভুয়া তথ্য দিয়ে ৭০০ কোটি টাকার অর্থ পাচার করেছে। পণ্য আমদানি-রপ্তানিকালে এসব প্রতিষ্ঠানের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়টি নজরে আসে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে বন্ড দুর্নীতি চলছে। এনবিআরের লোকবলের সংকটে সব দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। তবে এ বিষয়ে এনবিআরের কার্যক্রম জোরালো হয়েছে।’

সম্প্রতি এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি আরো তদন্ত করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়।

এনবিআরের টাস্কফোর্স কমিটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসে ওই ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে। উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের পরিমাণ, শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে কী পরিমাণ পণ্য উৎপাদন সম্ভব, প্রকৃতপক্ষে কতটা উৎপাদন হয়েছে, ব্যাংকে এলসি খুলে কী পরিমাণ অর্থ পাঠানো হয়েছে—এসব খতিয়ে দেখা হয়। এনবিআর নিশ্চিত হয়, ১১৭টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে ব্যবহার করবে—এমন শর্তে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে কারখানায় ব্যবহার না করে অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। নয়াবাজার, বংশাল, বকশীবাজার, হাতেম টাওয়ার, ধোলাইখাল ও টঙ্গীতে শুল্কমুক্ত আমদানি করা পণ্য অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে বেশি। আরো প্রমাণিত হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ পাচার করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধা ও ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল এবং আমদানি-রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তদন্তের সময় পর্যায়ক্রমে এই ১৩৮ প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে মোট ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের নাম, কী ধরনের বন্ড সুবিধা পেয়েছে, লিংকেজ নম্বর, কোন সার্কেলের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে তা উল্লেখ আছে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই তৈরি পোশাক শিল্প ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ইলেকট্রিক ও প্লাস্টিক খাতের প্রতিষ্ঠানও আছে এ তালিকায়।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে কাঁচামাল হিসেবে আর্ট কার্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, মিডিয়াম পেপার, লাইনার পেপার, পলিপ্রপাইলিন (পিপি), বিএপিপি ও এডহেসিভ টেপ, প্লাস্টিক দানা আমদানি করে খোলাবাজারে বেশি বিক্রি করা হয়েছে। হ্যাংগার, পলিথিন, সুতা, কাপড়, বৈদ্যুতিক তারসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও শুল্কমুক্ত সুবিধায় এনে বিক্রি করা হয়েছে। ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। তবে মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিং, কক্সবাজার, মোংলা ও কিশোরগঞ্জের ঠিকানা রয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, ১১৭টি প্রতিষ্ঠান বেশির ভাগ সময়ে বন্ডে আনা পণ্য বন্দর থেকে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে না নিয়ে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। তবে কখনো বন্ডেড ওয়্যারহাউসে মজুদ করে পরে সুবিধামতো সময়েও বিক্রি করা হয়েছে।

শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করায় দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক লোকসানে পড়ে। বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সচিব নওশেরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ দেশে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে কাগজ ও কাগজ জাতীয় পণ্য। কারখানায় ব্যবহারের কথা বলে শুল্ক না দিয়ে আনা এসব কাঁচামাল প্রতি টন দেশি কারখানায় উৎপাদিত একই জাতীয় পণ্যের চেয়ে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা কমে খোলাবাজারে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে লোকসানে পড়ছে দেশি শিল্প।’

প্রসঙ্গত, বন্ড সুবিধা পাওয়ার শর্ত থাকে আমদানীকৃত কাঁচামালের সবটুকু কারখানায় ব্যবহার করতে হবে। খোলাবাজারে বিক্রি করা যাবে না। কত দামের, কী পরিমাণ, কোন ধরনের কাঁচামাল কোন দেশ থেকে আমদানি করা হবে—এসব তথ্য ব্যাংক, বন্দর, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়া কাগজপত্রে উল্লেখ করতে হয়। মিথ্যা তথ্য দেওয়া হলে রাজস্ব আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। বন্ড সুবিধা বাতিল করা হবে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই পণ্যের বেশি দাম উল্লেখ করে কম দামের, কম পরিমাণের পণ্য আমদানি করেছে। পণ্যের যে দাম উল্লেখ করেছে তাই এলসি খুলে ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পাঠিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো পণ্য আমদানিই করেনি। অথচ পণ্যের মূল্য হিসেবে এলসি খুলে বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ পাঠিয়েছে। এভাবে তারা অর্থ পাচার করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক বা মালিকরা বেশির ভাগই প্রভাবশালী ও সম্পদশালী। তাদের বেশির ভাগই গোপনে বিদেশে বিভিন্ন নামে নিজস্ব মালিকানাধীন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান খুলে অর্থ পাঠিয়েছে। নিজস্ব মালিকানাধীন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান না হলে সমঝোতায় অর্থ পাচার করেছে। পরে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থপাচারকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশেই নিজস্ব তহবিলে অর্থ নিয়ে নিয়েছে। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে পণ্যের মূল্যের সঙ্গে বাড়তি কিছু অর্থ দেওয়া হয় অর্থপাচারে সহায়তার জন্য। হিসাব জব্দ হওয়া ১১৭টি প্রতিষ্ঠান এই অবৈধ কারবার করতে ব্যাংক, বন্দর ও এনবিআরের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে নিজেদের দলে ভেড়ায়।

এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। বন্ড অপব্যবহারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তাদের অনেকে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা কৌশলে কাজ করে। তারা কারা তা জানা গেলেও অনেক সময় তথ্য-প্রমাণের অভাবে আটকানো যায় না।

হিসাব জব্দ হওয়া ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে লিংকেজ নং-জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্টিজ লি.-সার্কেল ১০-এস বন্ড, ৩৩৭/জেনারেল গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইলস ইন্ডাস্ট্রিজ লি.-গার্মেন্টস বন্ড (জিবি)-সার্কেল-৭, ২১৪/এইচএম ওয়াশিং প্লান্ট লি.-ডিবি-সার্কেল-৪, ১৫৬১/ডাবস্টার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি.-জিবি-সার্কেল-৯, ৭৮/এআইএস সোয়েটার লিমিটেড-জিবি-সার্কেল-৩, ৬৮৬/জায়া নিটিং লিঃ (ওয়াশিং ডায়িং অ্যান্ড ফিনিশিং ইউনিট-ডিবি-সার্কেল-১২, ৮১৭/হেলিক্স গার্মেন্টস লি.-জিবি-সার্কেল-৬, ৮৯৯/লিমো ইলেট্রনিকস লি.-এসবি-সার্কেল-৮৯, ৭১/ইম্পেরিয়াল ম্যানুফ্যাকচারিং কো.-ডিবি-সার্কেল-৮, ২০০/কামরান সোয়েটারস লি.-জিবি-সার্কেল-৬, ৫২৮/ম্যানিলা পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লি.-ডিবি-সার্কেল-১০, ৩৩৫/এএমসি গার্মেন্টস লিমিটেড-জিবি-সার্কেল-৮, ১৬২/নিপ্পন প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লি.-ডিবি-সার্কেল-৮, ৫২/ডেল্টা ডায়িং অ্যান্ড ফেব্রিকস লি.-জিবি-সার্কেল-৫, ৫৯৪/এসিভ অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড-ডিবি-সার্কেল-৬, ৪৫/ডায়মন্ড গার্মেন্টস লি.-জিবি-সার্কেল-৯, ০৬৮/একিল ডিজাইন লিমিটেড-জিবি-সার্কেল-২, ৯০৮/ফ্রেন্ডস ওয়ার্ল্ড কম্পোজিট ইন্ডাস্ট্রিজ লি.-জিবি-সার্কেল-৭, ৫৯৪/আরএস নিট কম্পোজিট লি.-জিবি-সার্কেল-৩, ৭৭০/প্যারাগন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লি.-ডিবি-সার্কেল-৬, ২৩/এভারেস্ট অ্যাপারেলস লি.-জিবি-সার্কেল-৫, ৯৪/ওয়্যারম্যাচ বিডি (প্রাইভেট) লি.-ইজেড, ২৪৯/ট্রেসকো ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লি.-জিবি-সার্কেল-৪, ৪৮৩/এফএস প্যাকেজিং ইন্ডাস্টিজ লি.-ডিবি-সার্কেল-৯, ১১/আলী অ্যান্ড সন্স লি.-জিবি-সার্কেল-১, ৫০/শ্যামলী প্যাকেজিং লি.-ডিবি-সার্কেল-৫, ৪০৪/টঙ্গী গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লি.-জিবি-সার্কেল-৪, ৪১৯/আমদাদিয়া পলি প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং লি.-ডিবি-সার্কেল-৭, ৪৯৫/সান ব্রাইড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ (প্রাই.) লি.-জিবি-সার্কেল-৮, ৩৩৭/এরনোভ সোয়েটারস লি.-জিবি-সার্কেল-৯, ৭৬/শামিল কো. লি.-জিবি-সার্কেল-৩, ১০৩/আর্টিফিশিয়াল প্লান্ট অ্যান্ড রেডিয়ান্ট নিটিং ডায়িং লি.-ডিবি-সার্কেল-৩, ২১/এসকেএস গার্মেন্টস লি.-জিবি-সার্কেল-৫।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা