kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ঢাকার ১৮১৮ বহুতল ভবনের অধিকাংশেই ত্রুটি

নকশা দেখাতেই পারেনি ৪৭৫টি ভবনের মালিক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নকশা দেখাতেই পারেনি ৪৭৫টি ভবনের মালিক

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন অঞ্চলগুলোতে ১০ তলার বেশি এক হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবনের বেশির ভাগেই ত্রুটি পাওয়া গেছে। ভবনগুলোতে মোট পাঁচ ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে। এগুলো হলো নকশা ছাড়া নির্মাণ, নকশায় ব্যত্যয়, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা না থাকা, জরুরি সিঁড়ির অপ্রতুলতা ও আবাসিক অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহার। এর মধ্যে জরুরি সিঁড়ির অপ্রতুলতা রয়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ ভবনে। যথাযথ ও প্রয়োজনীয় জরুরি সিঁড়ি নেই এক হাজার ২৮৭টি ভবনে।

এ ছাড়া নকশা না নিয়ে বা লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবনের সংখ্যা ৪৭৮। রাজউককে নকশা দেখাতে পারেননি ৪৭৫টি ভবনের মালিক। এর মধ্যে ৪৪টি ভবন রয়েছে সরকারি মালিকানায়। নকশার অনুমোদন না নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণকারীদের মধ্যে সিটি করপোরেশন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও পৌরসভার নামও রয়েছে।

গতকাল বুধবার প্রকাশ করা রাজউকের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রাজউকের মোট আটটি অঞ্চলের এই এক হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবনের নকশা ও অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে গত ১ এপ্রিল মাঠে নামে সংস্থার ২৪টি দল। তাদের পরিদর্শনের ভিত্তিতেই এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। পরিদর্শন কার্যক্রম ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও পরে সময় বাড়ানো হয়। রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক তানজিলা খানম এ কাজ সমন্বয় করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে রাজউক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সংবাদ সম্মেলনে গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমও উপস্থিত ছিলেন। অনিয়ম করে গড়ে তোলা এসব বহুতল ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৪৩১টি ভবনের মালিক কোনো ধরনের নকশাই দেখাতে পারেননি। আর ৪৪টি সরকারি ভবনের নকশা নেই। অর্থাৎ মোট ভবনের ২৬.১২ শতাংশ ভবনের নকশা পাওয়া যায়নি। কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়ে ভবন নির্মাণ করায় বা নকশায় বিচ্যুতি ঘটানোর কারণে ভবন মালিকরা নকশা প্রদর্শন করেননি বলে ধারণা রাজউক কর্মকর্তাদের। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও গাজীপুরের বেশ কয়েকটি পৌরসভাসহ অন্যান্য সংস্থা থেকে অনুমতি নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২০৭টি বহুতল ভবন। এসব ভবনেরও নকশা ব্যত্যয়ের অভিযোগ পেয়েছে রাজউক।

রাজউক আওতাধীন বহুতল ভবনগুলোর মধ্যে নকশায় কম তলার অনুমোদন নিয়ে বেশি তলা করেছে ২৭৭টি ভবন। একই সঙ্গে ইমারত নির্মাণ বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাস্তা ও পার্শ্ববর্তী ভবনের মাঝের ফাঁকা জায়গা দখল করে বানানো হয়েছে ৬৭৪টি ভবন। একই সঙ্গে রাজউক ব্যতীত বিভিন্ন সংস্থা থেকে নকশার অনুমোদন নিয়ে নির্মিত ভবনের মধ্যে ৩২টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ হয়েছে অবৈধভাবে। ৬৪টি ভবন মালিক রাস্তা ও পার্শ্ববর্তী ভবনের মধ্যে সর্বনিম্ন ফাঁকা জায়গা রাখেননি।

রাজউকের ভবন পরিদর্শন প্রতিবেদনে নাজুক অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বহুতল এসব ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও এক্সটিংগুইশার, অ্যালার্ম, হোস পাইপ বা ফায়ার হাইড্রেন্টের মতো প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জামাদি রাখা হয়নি। রাজধানীর এক হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে এক হাজার ১৫৫টিতেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা হয়নি। ভবনে অগ্নিকাণ্ড বা অন্যান্য দুর্যোগে জরুরি অবস্থায় নামার জন্য বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ৭২১টি ভবনে যথাযথভাবে জরুরি সিঁড়ি রাখেননি ভবন মালিকরা। এ ছাড়া ৫৬৬টি ভবনে কোনো ধরনের জরুরি সিঁড়িই রাখা হয়নি। জরুরি সিঁড়ির স্থানে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা রেখে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আবার স্থায়ী স্থাপনা করে কোনো কোনো ভবনের সিঁড়ি ব্যবহার অনুপযোগী করে রাখা হয়েছে।

আবাসিক অনুমোদন নিলেও ১২৪টি ভবন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার প্রমাণ পেয়েছে রাজউক। এ ছাড়া অনাবাসিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ৪৯টি ভবন। একই সঙ্গে পার্কিংয়ের জায়গা অন্য কাজে ব্যবহার করেন ৩০৯টি বহুতল ভবনের মালিক।    

রাজউকের আটটি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৭৯টি বহুতল ভবন রয়েছে বনানী, গুলশান, বারিধারা, ভাটারা, আফতাবনগর এবং কারওয়ান বাজার এলাকা নিয়ে গঠিত চার নম্বর অঞ্চলে। ওই এলাকায় ৩৪৭টি ভবনে নানা ধরনের ত্রুটি পেয়েছে রাজউক। এ অঞ্চলের চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠানও তাদের বহুতল ভবনের নকশা দেখাতে পারেনি। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সাভার ও উত্তরা এলাকা নিয়ে গঠিত তিন নম্বর অঞ্চলে ৪১১টি ভবনের মধ্যে ২২টি বেসরকারি এবং ২৮টি সরকারি বহুতল ভবনের নকশা পাওয়া যায়নি। তিন নম্বর অঞ্চলের ২৫১টি ভবনে ত্রুটি পাওয়া গেছে।

মতিঝিল, আরামবাগ, পল্টন, খিলগাঁও, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল ও গাউছিয়া নিয়ে গঠিত রাজউকের ছয় নম্বর অঞ্চলে ৩৮৬টি ভবনের মধ্যে ১৭৯টি ভবন নকশা দেখাতে পারেনি। এ ছাড়া ধানমণ্ডি, লালবাগ, হাজারীবাগ, কেরানীগঞ্জ ও বসিলা নিয়ে গঠিত পাঁচ নম্বর অঞ্চলে ৩১০টি বহুতল ভবনের মধ্যে ৯২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নকশা দেখাতে পারেনি। অঞ্চলটির ১০টি প্রতিষ্ঠানের নকশায় বিচ্যুতি পেয়েছে রাজউক। এক নম্বর অঞ্চলে ১০টি বহুতল ভবনের মধ্যে দুটির, দুই নম্বর অঞ্চলের ৮৩টি ভবনের মধ্যে সাতটির, সাত নম্বর অঞ্চলের ৯১টি ভবনের মধ্যে ৪২টির এবং আট নম্বর অঞ্চলের ৪৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে সাতটির ভবন মালিক নকশা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘পরিদর্শন শেষে ভবন মালিকদের নানা ধরনের অনিয়ম ও নকশা ব্যত্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। অনিয়ম করে বানানো এসব ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা