kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

নয়াবাজারে অভিযানকারীদের ওপর হামলা

পুলিশের অবহেলায় পার পাচ্ছে চোরাকারবারিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুলিশের অবহেলায় পার পাচ্ছে চোরাকারবারিরা

বন্ডের সুবিধায় আমদানি করা কাগজ পুরনো ঢাকার নয়াবাজারে বিক্রির সঙ্গে জড়িত চোরকারবারিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয় না পুলিশ প্রশাসন। ভয়ংকর এই চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা।

ওই হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামিরাও পুলিশের তদন্তে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। মাহফুজুর রহমানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এরই মধ্যে তারা সবাই জামিনে মুক্ত। চোরাকারবারি জামালসহ অন্য আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোরাকারবারি এই চক্রের সঙ্গে কোতোয়ালি থানা পুলিশের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকারি কাজে চোরাকারবারিদের বাধা এবং হত্যাচেষ্টা মামলার আসামিদের জামিন পাওয়ার বিষয়টি তাঁরা পরে জানতে পেরেছেন। তদন্তের ব্যাপারেও পুলিশ তাদের কিছু জানায়নি।

বৈধ কাগজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোতোয়ালি ও বংশাল থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেই কারবার করে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীরা। ইসলামপুরের চোরাই কাপড় এবং নয়াবাজারের চোরাই কাগজ বিক্রেতারা পুলিশকে নিয়মিত মাসোয়ারা দেয়। এ কারণে এই কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেও ব্যবস্থা নেয় না পুলিশ।

তবে কোতোয়ালি থানার ওসি এ বি এম মশিউর রহমান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা আসামি গ্রেপ্তারে সচেষ্ট আছি। তাদের (বন্ড কমিশনারেট) সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। একজনকে ধরতে ঢাকার বাইরেও অভিযান হয়েছে।’

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের উপকমিশনার রেজভী আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কিছু ব্যক্তি শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যার হাউস সুবিধায় আমদানি করা কাগজজাতীয় পণ্য বিক্রি করছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে আমরা আক্রান্ত হয়েছি। বেপরোয়া এই চোরাকারবারিরা আমাদের ওপর হত্যাচেষ্টা চালায়। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত চলছে। তবে পুলিশের কাছে যে মামলা করা হয়েছে, তার কী অবস্থা তা আমরা বুঝতে পারছি না। এই আসামিরা যদি পার পেয়ে যায় তা হবে দুঃখজনক।’

নয়াবাজার ও আশপাশে শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যার হাউস সুবিধায় আমদানি হওয়া কাগজ-পণ্য চোরাইভাবে বিক্রির ব্যাপারে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কাছে তথ্য আছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৭ এপ্রিল রাতে প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা অভিযানে নামেন। উপকমিশনার রেজভী আহম্মেদ ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ ফয়সালের নেতৃত্বে দুটি প্রিভেন্টিভ দল নয়াবাজারের জিন্দাবাজার পার্কের পাশে এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছে অভিযান চালায়। ওই অভিযানে প্রচুর পরিমাণে বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া কাগজ চোরাইপথে বিক্রির জন্য মজুদ পাওয়া যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পাশের একটি গুদামে প্রচুর পরিমাণে কাগজ-পণ্য পান অভিযানকারীরা। এরপর নয়াবাজার মোড় এলাকায় ডুপ্লেক্স বোর্ডভর্তি তিনটি কাভার্ড ভ্যান আটক করেন তাঁরা। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা এসব কাগজ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত ‘ভি টেক প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে বন্ডেড প্রতিষ্ঠান চোরাই পথে বিক্রির জন্য নয়াবাজারে খালাস করছিল। চালানটি জব্দ করে অভিযান শেষ করার আগ মুহূর্তে চোরাকারবারিরা অভিযান চালনাকারীদের ওপর হামলা চালায়। ইটপাটকেল, লাঠিসোঁটা নিয়ে তারা আঘাত করলে ছয়জন কাস্টমস কর্মকর্তা আহত হন। কাস্টমসের একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে মাহফুজুর রহমান নামে একজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা। ওই সময় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে গড়িমসি শুরু করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। শেষে মামলা নিলেও আসামির রিমান্ড আবেদন করেননি তদন্ত কর্মকর্তা।

সূত্র জানায়, ওই হামলার নেতৃত্বদানকারী মাহফুজ কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মওদুদ হাওলাদারের ঘনিষ্ঠ। মাহফুজ ছাড়াও জামাল নামে আরেকজন হামলায় নেতৃত্ব দেয়। এরা দুজনই চোরাকারবারি ও গুদামের মালিক। পুলিশ জামালকে গ্রেপ্তার না করে কজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। এদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তাদের হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আদালতে সঠিকভাবে উপস্থাপন না করায় কয়েক দিনের মধ্যেই তারা জামিন পেয়ে যায়।

মামলার বাদী, ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তা (এআরও) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কয়েক দিন আগে শুনলাম পাঁচ আসামির জামিন হয়ে গেছে। কি তদন্ত হয়েছে তার কিছুই জানি না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, কোতোয়ালি থানার এসআই বিনয় কুমার বলেন, ‘আমরা জামালকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। পরে আরো চারজনকে ধরেছি। তারা লেবার। আদালত থেকে জামিন পেলে আমাদের কী করার আছে!’

কয়েকজন কাগজ ব্যবসায়ী বলেন, নয়াবাজারের চোরাকারবারিরা স্থানীয় থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে চলে। রাতে যেসব পুলিশ ডিউটি করে তাদের টাকা দেওয়া হয়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করে পুলিশ। গত ১৩ মে নয়াবাজারের শাহজাদী মসজিদের পাশে বাগডাসা লেনের সরু গলিতে ডিবি পুলিশের সহায়তায় তল্লাশি করে একটি নকল কাগজের গুদামের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে ডাবলু নামের এক কারবারি বসুন্ধরার নকল কাগজ তৈরি করছিল। ১০২ রিম নকল বসুন্ধরা এ ফোর কাগজসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেলেও বংশাল থানা পুলিশ প্রথমে তা জব্দ করতে চায়নি। পরে কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করে। নকল কারবারি ডাবলুকে এখনো গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা