kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে ধ্বংস দেশি শিল্প

বছরে ৫২০০০ কোটি টাকার নিয়ম

রাজস্ব ক্ষতি বছরে ৩০০০০ কোটি টাকার

ফারজানা লাবনী   

২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বছরে ৫২০০০ কোটি টাকার নিয়ম

রপ্তানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে ‘বন্ড সুবিধা’ নামে বর্তমানে বিনা শুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আছে। এ সুবিধা দিতে গিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তহবিলে এক বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কম জমা হয়েছে। একই সময়ে সরকারি এ সুবিধার অপব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীরা ৫২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছে। এ অনিয়ম হয়েছে দুইভাবে। এর একটি হয়েছে পণ্য এনে উৎপাদনে ব্যবহার না করে গোপনে খোলাবাজারে বিক্রি করে। আরেকটি গুরুতর অনিয়ম হয়েছে কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ পাচার করে। বন্ড দুর্নীতিসংক্রান্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসছে।

আশির দশকে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে বন্ড সুবিধা চালু করে সরকার। ২০০৮ সালের ২৬ জুন এনবিআর প্রজ্ঞাপন জারি করে বন্ড সুবিধার পরিধি বাড়ানো হয়। বর্তমানে বন্ড সুবিধায় সুতা, কাপড়, হ্যাঙ্গার, পলিথিন, শার্টের কলার, হাতায় ব্যবহূত শক্ত কাগজ, আর্ট কার্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, মিডিয়াম পেপার, লাইনার পেপার, বৈদুত্যিক তারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, সকেট, পলিপ্রপাইলিন (পি.পি.), বিএপিপি ও অ্যাডহেসিভ টেপ, প্লাষ্টিক দানা, রাসায়নিক দ্রব্য, রডসহ আরো কিছু পণ্য আমদানির সুযোগ আছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, বন্ড সুবিধায় আমদানীকৃত পণ্যের ৯০ শতাংশই কাপড়, সুতা, কাগজ ও প্লাষ্টিকজাতীয় পণ্য। বর্তমানে সারা দেশে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত সাড়ে ৯ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক খাতে। শুধু ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের আওতায় থাকা ছয় হাজার ২৭০টি বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চার হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান পোশাক খাতের।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে দেশে মোট এক হাজার ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠান আছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিও করছে এসব প্রতিষ্ঠান। দেশে আর্ট কার্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, হার্ড টিস্যুসহ বিভিন্ন কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্যের চাহিদা বছরে ১০ লাখ টন। দেশের শতাধিক কাগজ কারখানায় উৎপাদিত হচ্ছে ১২ লাখ টন। বর্তমানে রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রায় ৬০ শতাংশ রাসায়নিক দ্রব্য সরবরাহ করছে স্থানীয় শিল্প।

আশির দশকের বাস্তবতায় বন্ড সুবিধায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে আমদানিনির্ভরতা কমেছে বলে মনে করেন এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি মো. হাতেম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, একটা সময় নিটের কাপড়ের বড় অংশ ভারত এবং ওভেনের কাপড় চীন থেকে আনা হতো। এখন দেশে ফ্যাব্রিকস খাতে ৭০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান আছে। স্পিনিং মিল আছে ৪০০-এরও বেশি। তা ছাড়া দেশে অনেক কম্পোজিট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান শিল্প খাতের সুতা-কাপড় চাহিদার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কাঁচামাল সরবরাহে সক্ষম। সরকার পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা দিলে শিল্পের আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে।

রাজধানীর নয়াবাজার, বংশাল, পুরান ঢাকা, ইসলামপুর, হাতেম টাওয়ার, উর্দু রোড, গাউছিয়া, নিউ মার্কেট, ধোলাইখাল, টঙ্গী, যাত্রবাড়ী, গুলিস্তান, চট্টগ্রামের বকশীবাজারে বন্ড সুবিধায় আনা পণ্যের অবৈধ বেচাকেনা বেশি হয়। এ কারণে আমদানিনির্ভরতা কমলেও বন্ড দুর্নীতি কমছে না।

বিটিএমএর সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আল আমীন কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্ড সুবিধা না নিয়েই একই ধরনের ব্যবসা করে টিকে আছে দেশের টেক্সটাইল খাত। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে এ খাতের ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে কোনো রাজস্ব পরিশোধ করতে না হলেও বন্ড সুবিধার বাইরে থাকা ব্যবসায়ীদের ওভেন, ডেনিম ও নিট ফ্যাব্রিকস আমদানিতে ৯১.৮৮ শতাংশ, জুট ফ্যাব্রিকসে ৬০.৭৩ শতাংশ, প্রস্তুতকৃত কাপড় আমদানিতে ১৩০.৮১ শতাংশ শুল্ক গুনতে হয়।

শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত ও অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, পুরান ঢাকা ও তৈরি পোশাক খাতের কিছু ব্যবসায়ী মিলে বন্ড পণ্য বেচাকেনায় শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। তৈরি পোশাক খাতের অসাধু ব্যবসায়ীরা বন্ড সুবিধায় পণ্য এনে ইসলামপুরের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে দেয়। এ সিন্ডিকেট বিভিন্ন দোকানে এসব পণ্য বিক্রি করে দেয়। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীকে সাধারণত অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করা হয়ে থাকে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজার, হাশেম টাওয়ারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা আর্ট বোর্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, প্রিন্টিং পেপারসহ বিভিন্ন কাগজজাতীয় পণ্যের রমরমা অবৈধ ব্যবসা চলছে। দেশীয় শিল্পে উৎপাদিত ২০০ থেকে ৩৫০ জিএমএমের প্রতি টন আর্ট বোর্ড এক লাখ দুই হাজার থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকায়, ১৬ জিএমএমের হার্ড টিস্যু এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকায়, ডুপ্লেক্স বোর্ড ৬২ থেকে ৬৫ হাজার টাকায়, জিএমএমের সাদা প্রিন্টিং পেপার (কাগজ) ৭৫ থেকে ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ খোলাবাজারে বন্ড সুবিধায় আনা একই পরিমাণের একই ধরনের আর্ট বোর্ড ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, হার্ড টিস্যু ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়, ডুপ্লেক্স বোর্ড ৫২ থেকে ৫৮ হাজার টাকায়, সাদা প্রিন্টিং পেপার (কাগজ) ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সচিব নওশেরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে বন্ড সুবিধায় সবচেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য। লাভ না রেখে শুধু উৎপাদন ব্যয়ে দেশি প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এর চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে বিনা শুল্কে আমদানীকৃত একই ধরনের পণ্য। এভাবে লোকসান গুনে দেশীয় কাগজশিল্প টিকে থাকা সম্ভব নয়। অথচ স্থানীয় কাগজকল আমদানীকৃত কাগজজাতীয় পণ্যের পুরো চাহিদা পূরণে সক্ষম।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শক্তিশালী চেইনের মাধ্যমে দুর্নীতি করা হচ্ছে। বন্ড দুর্নীতি রোধে এনবিআর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা সৎ ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে বন্ড দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করছি। সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা