kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

পাটপণ্য ব্যবহারে আগ্রহ নেই সরকারি দপ্তরেই

জেডিপিসি ক্রেতাশূন্য

আরিফুর রহমান   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাটপণ্য ব্যবহারে আগ্রহ নেই সরকারি দপ্তরেই

‘পাট বাঁচলে বাঁচবে দেশ’, ‘দেশীয় পাটপণ্য কিনে হও ধন্য’, ‘পাটপণ্য ব্যবহার করুন, বিশ্বকে বাঁচান’—পাটশিল্প টিকিয়ে রাখার এমন অসংখ্য স্লোগান শোভা পাচ্ছে রাজধানীর ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণি যাওয়ার পথে মনিপুরীপাড়ায় জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জেডিপিসি) সামনে। গত বুধবার সেন্টারের দোতলায় প্রদর্শনী কেন্দ্রে গিয়ে তা ক্রেতাশূন্য দেখা যায়। মাত্র দুজন দর্শনার্থী চোখে পড়ে।

বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা থাকলেও তাতে কোনো কাজে আসছে না। সরকারের ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন সভা-সেমিনার, অনুষ্ঠানে পাটপণ্যের ব্যবহারও চোখে পড়ছে না। জেডিপিসি থেকে পাওয়া তথ্য মতে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাসে তাদের পাটপণ্যের বিক্রি গড়ে চার লাখ টাকার মতো, যদিও তাদের প্রত্যাশা আরো কয়েক গুণ। হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি দপ্তর বহুমুখী পাটপণ্য কিনছে। বহুমুখী পাটপণ্য বিপণনের চিত্রে কর্মকর্তারা হতাশ। কারণ সরকারি দপ্তর থেকে পাটপণ্য নেওয়ার অর্ডার তেমন মিলছে না। এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগতভাবে কাউকে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে পাটপণ্য কেনার বিষয়ে তেমন আগ্রহী হন না। সরকারি কর্মকর্তার বাইরে অনেকে দেখতে এবং কিনতে যায় প্রদর্শনীতে।

জেডিপিসির পরিচালক মাইনুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তো কাউকে বহুমুখী পাটপণ্য ব্যবহার করতে চাপ প্রয়োগ করতে পারি না। আমরা অনুরোধ করতে পারি। এরই মধ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হয়েছে জেডিপিসি থেকে পাটপণ্য কেনার জন্য। অবশ্য ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়ছে। আশা করছি, কর্মকর্তাদের মধ্যে এই আগ্রহ দিনে দিনে বাড়বে।’

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহুমুখী পাটপণ্য ব্যবহার করতে একদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, উৎপাদিত পাটপণ্যের সহজলভ্য করতে জেডিপিসিতে একটি প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। জেডিপিসি সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বহুমুখী পাটপণ্য কেনা যাবে। কেনা পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতিও আছে। চিঠিতে পরিবেশবান্ধব বহুমুখী পাটপণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে জেডিপিসির উদ্যোক্তাদের তৈরি পাটের বহুমুখী পণ্য ক্রয় ও ব্যবহার করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ব্যক্তিগত কাজে পাটজাত পণ্য কেনার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক দফা মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি পাঠানো হলেও তা তেমন কাজে আসছে না। এ জন্য দেশপ্রেম ও সচেতনতার ওপর জোর দিল অনেকে। গত বুধবার জেডিপিসি ঘুরে প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্রে ২৮২ ধরনের পাটপণ্য দেখা গেছে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তাদের সভা-সেমিনার ও অনুষ্ঠানে যে ধরনের পুরস্কার কিংবা উপহার দিয়ে থাকে, তার সবই জেডিপিসিতে আছে এবং তা সুলভ মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।

জেডিপিসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফাইল ফোল্ডার। প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্রে তা মানভেদে ১৫০ থেকে শুরু করে এক হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। একটি টিস্যু বক্সের দাম ৩০০ থেকে শুরু করে ৫৫০ টাকা। পেন হোল্ডারের দাম ৯০ থেকে ১৫০ টাকা। ডেস্ক ফাইল ৫০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বহুমুখী পাটপণ্য হিসেবে ব্যাগের মানও বেশ ভালো। একটি ব্যাগের দাম ৩০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত। সরকারি দপ্তরে যেকোনো অনুষ্ঠানে ব্যাগ দেওয়া হয়। কিন্তু পাটের তৈরি ব্যাগের প্রতি কর্মকর্তাদের আগ্রহ নেই।

অবশ্য এর উল্টো চিত্রও আছে খুবই নগণ্য ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ব্যক্তিগতভাবে ৬০টি শপিং ব্যাগ কেনার অর্ডার দিয়েছেন। সেগুলো তৈরি করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া এবারের স্বাধীনতা দিবসের জন্য ২০০ ব্যাগ নেওয়া হয়েছে সিঙ্গাপুর দূতাবাসে। কর্মকর্তারা জানান, প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্রে যত সরকারি কর্মকর্তারা আসেন, তাঁরা তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা করেন। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ হয় না, বরং ঢাকাসহ ঢাকার বাইরে থেকে বেশি দর্শনার্থী আসে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব নূরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আমাদের মন্ত্রণালয়ের সবাইকে জানিয়েছি জেডিপিসি থেকে পাটপণ্য কেনার জন্য। এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও কেউ যদি কাউকে কোনো গিফট দিতে চায়, সে যেন পাটপণ্য দেয়, সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যবহার—এটা অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। তবে কিছুটা সময় তো লাগবেই।’

একই কথা বললেন জেডিপিসির পরিচালক মাইনুল হকও। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিক্রির প্রবৃদ্ধি উঠছে। তবে ধীরে ধীরে। আশা করি, এর উন্নতি ঘটবে। পাটপণ্য তৈরির জন্য আমাদের নিবন্ধিত ছয় শর বেশি প্রতিষ্ঠান আছে। মূলত তারাই এসব পণ্য অর্ডার পাওয়ার পর তৈরি করে।’

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বহুমুখী পাটপণ্য সরকারি দপ্তরে তেমন ব্যবহার না হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার কারণে কর্মকর্তারা নতুন কোনো পণ্য নিতে চান না। তা ছাড়া জেডিপিসিতে যে বহুমুখী পাটপণ্য পাওয়া যায়, এটি এখনো ততটা জানাজানি হয়ে ওঠেনি। পাশাপাশি এখান থেকে পণ্য কিনলে কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এসব কারণে এক সরকারি সংস্থা আরেক সরকারি সংস্থা থেকে বহুমুখী পাটপণ্য কিনতে অনীহা প্রকাশ করে।

শহীদুল ইসলাম নামের এক দর্শনার্থী বলেন, এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনে তিনি প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্রে এসেছেন। এখানে অনেক সুন্দর  ও অসাধারণ পাটপণ্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেল, পাট দিয়ে তৈরি বহুমুখী পণ্যের মধ্যে আছে টিস্যু বক্স, কলমদানি, চাবির রিং, ব্যাগ, ফোল্ডার, গৃহসজ্জার জিনিস, লেডিস ব্যাগ, পার্টস, মানিব্যাগসহ ২৮২ ধরনের পাটপণ্য। এসব পণ্য সরকারি দপ্তরে অনুষ্ঠিত যেকোনো সভা-সেমিনার কিংবা অনুষ্ঠানে দেওয়া যেতে পারে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা