kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

পাটের সোনালি ব্যাগ

বদলে দেওয়া উদ্ভাবনে ভাগ্যবদলের হাতছানি

শওকত আলী   

১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বদলে দেওয়া উদ্ভাবনে ভাগ্যবদলের হাতছানি

পাট খাতে নতুন স্বপ্ন, নতুন যুগের সূচনার আশা করা হয়েছিল বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোবারক আহমদ খানের এক নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে। পাট থেকে তৈরি তাঁর পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগের উদ্ভাবন দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। আশা করা হয়েছিল, পলিব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে শুধু দেশে নয়, বিশ্বেও মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। তবে উদ্ভাবনের পর পণ্যটি উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক দুই বছর পার হলেও বাণিজ্যিকীকরণের পথে বিজেএমসির দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। লোকসান গুনতে গুনতে ক্লান্ত বিজেএমসি বর্তমানে পাট কেনার দেনা শোধ আর পাটকল শ্রমিকদের মজুরি দিতে সরকারের কাছে হাত পাতছে।

সোনালি ব্যাগ উদ্ভাবনের পর ২০১৭ সালের ১২ মে লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পণ্যটির পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। পাটের সেলুলোজ থেকে পরিবেশবান্ধব দুই হাজার পিস পলিব্যাগ উৎপাদন শুরু করে কারখানাটি। এই পলিব্যাগগুলো মূলত ব্যবহৃত হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে। এর মধ্যে দুই বছর পার হলেও উৎপাদনের পরিমাণ বাড়েনি। বাণিজ্যিক উৎপাদনেও যেতে পারেনি। ফলে বাজারজাত করাও সম্ভব হয়নি।

বিজেএমসি সূত্র জানায়, সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রায় ১৭০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছিল বিজেএমসি। তবে সে প্রস্তাবনা অনুযায়ী কাজ হয়নি।

সোনালি ব্যাগের উদ্ভাবক মোবারক আহমদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, “উদ্ভাবনের পর থেকে চিন্তা শুরু হয়েছিল কত দ্রুত আমাদের এই উদ্ভাবনটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া যায়। সে সময় পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তখনকার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেছিলেন, ‘বিজেএমসি প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা লোকসান করছে। এই প্রকল্পটিতে ৩০০ কোটি টাকা দিলে আমাদের কী হবে?’ এত বড় আশার বাণী শুনেই আমি এই প্রকল্পে যুক্ত হই। কাজ শুরু করি।”

তিনি আরো বলেন, “কাজ শুরুর সময় আমরা রিসার্চের একটা ধাপে ছিলাম। তখন আমরা ‘ম্যাচিউরড’ ছিলাম না। আমরা পরীক্ষাগার মাত্র বানিয়েছি। গত দুই বছর বিজেএমসিতে কাজ করার পর আমাদের অনেক ধারণা তৈরি হয়েছে। আমরা এখন একটা পর্যায়ে আসতে পেরেছি। আমরা এখন ‘ম্যাচিউরড’। পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হলে আমাদের কী কী করতে হবে তার একটা ধারণা তৈরি হয়েছে।”

তিনি বলেন, ‘জায়গা, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে অন্যান্য সুবিধা সবই বিজেএমসির রয়েছে। তবে এই কাজটি এত দিন এগোয়নি ফান্ডের অভাবে। সরকার ফান্ড দেবে না এমন বলেনি। ফান্ড পেতে যে প্রক্রিয়াগুলো শেষ করার দরকার, সেখানে আমাদের কিছুটা ঘাটতি ছিল। তবে এখন মেশিন কেনার জন্য টেন্ডার হয়ে গেছে। আমরা ওয়ার্ক অর্ডার দেব দৈনিক এক টন উৎপাদনের জন্য। আমাদের লক্ষ্য জুলাইতে উৎপাদনে যাওয়ার।’

জানা গেছে, বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার জন্য যে প্রস্তাবনা বিজেএমসি তৈরি করেছিল তা থেকে তারা সরে গিয়ে বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে দৈনিক এক লাখ পিস সোনালি ব্যাগ উৎপাদনের চিন্তাভাবনা করছে বিজেএমসি। আগামী জুলাই মাসে এই উৎপাদন শুরু হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর জন্য বিজেএমসি নিজস্ব ফান্ড থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। আর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে সোনালি ব্যাগের মানোন্নয়নে উচ্চতর গবেষণার জন্য।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে প্রতিদিন এক লাখ পিস ব্যাগ তৈরি করে স্থানীয় বাজারে ছাড়া হবে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের মতামত নিয়ে পরে এটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে বেসরকারিভাবে উৎপাদনের জন্য উদ্ভাবনটি উন্মুক্ত করা হবে বলে জানা গেছে।

বিজেএমসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) শাহ্ মোহাম্মদ নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একসময় বড় পরিসরে উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত পাল্টানো হয়েছে। লতিফ বাওয়ানী জুট মিলেই আমরা দ্বিতীয় ধাপে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাচ্ছি। সেখানে এক লাখ পিস প্রতিদিন উৎপাদন হবে এবং তা বাজারজাত করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটা সফল হলে আমরা সোনালি ব্যাগ উৎপাদনের জন্য বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেব। তবে এটি হবে পিপিপির আওতায়।’

উদ্ভাবনের পর অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও কেন বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া যায়নি? এমন প্রশ্ন করলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘একটা পণ্য উৎপাদনের পর মানোন্নয়নে আরো গবেষণার দরকার হয়। কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হুট করে একটা বড় প্রক্রিয়ায় যাওয়া যায় না। এর জন্য কিছু সময় লাগে।’

জানা যায়, প্রাথমিক অবস্থায় সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন হবে সরকারিভাবে। বর্তমানে বিজেএমসির আওতায় ২৬টি (তিনটি নন-জুটমিল) মিল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব কারখানায় নতুন মেশিনারিজ স্থাপন করে সোনালি ব্যাগের উৎপাদনে যেতে পারলে বিজেএমসিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। নিজের উৎপাদন দিয়েই দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে পারবে। টাকার জন্যও আর কারো দ্বারস্থ হতে হবে না। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের তৈরি পলিব্যাগের কতটা গুরুত্ব রয়েছে তা বোঝা যায় বিশ্বজুড়ে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পলিথিন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত থেকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭২টি দেশ পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। সব দেশই পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে শাস্তির বিধান করলেও ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। কেনিয়া সরকার কারো হাতে পলিথিন দেখলেই গ্রেপ্তার করার বিধান জারি করেছিল। উগান্ডার বিমানবন্দরে পলিথিনসহ কাউকে পেলে তাকে গ্রেপ্তার করার বিধান রাখা হয়েছিল, কিন্তু পলিথিনের বিকল্প না থাকায় তা বেশি দিন বাস্তবায়ন করা যায়নি।

আয়ারল্যান্ড সরকার পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার কমাতে বাড়তি কর আরোপ করেছে। পর্তুগাল, স্পেনও এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। পানিতে বর্জ্যের ৭০ শতাংশ পলিথিন ব্যাগ। এ কারণে ২০২০ সাল থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করার আইন করছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। ইউরোপেই বছরে ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। এতগুলো দেশ পলিথিন ব্যাগ বন্ধে আইন করলেও বিকল্প না থাকায় এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারছে না।

বাংলাদেশেও ২০০২ সালে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও সর্বত্র এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতি মাসে চার কোটি ১০ লাখ পিস পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ পলিথিনের বিকল্প তৈরি করে সাড়া ফেলার পর এখন বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারলে সোনালি ব্যাগ দিয়েই বিশ্ববাজার দখল করতে পারবে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই পণ্যটার একটা চাহিদা ও সম্ভাবনা রয়েছে, সেটা আমরা সবাই জানি। তার পরও শুরুতে বড় পরিসরে উৎপাদন করে বিপদে পড়তে চাই না। বাজার যাচাই করে ধীরে ধীরে আমরা উৎপাদন বাড়াব। এখন আমরা দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎপাদনে যাওয়ার জন্য কাজ করছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা